এমপি সরওয়ারের ভাইদের দাপটে অচল বরিশালের বাস-টেম্পো স্ট্যান্ড

নিকুঞ্জ বালা পলাশ, বরিশাল

এমপি সরওয়ারের ভাইদের দাপটে অচল বরিশালের বাস-টেম্পো স্ট্যান্ড

বরিশাল-৫ (সদর) আসনের এমপি মজিবর রহমান সরওয়ারের দুই ভাইয়ের ক্ষমতার দাপটে চরম দুর্ভোগ আর ভোগান্তির শিকার বরিশালসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের হাজারো যাত্রী। তাদের প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে জেলার নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ড ও টেম্পুস্ট্যান্ডে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যাত্রী ওঠানোকে কেন্দ্র করে পরপর দুদিন সংঘর্ষে জড়ান বাস ও থ্রি-হুইলারের শ্রমিকরা। এর জেরে দফায় দফায় বাস চলাচল বন্ধ হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। পরে আলোচনার মাধ্যমে যানবহন চলাচল স্বাভাবিক হয়। তবে বারবার এমন ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বাস মালিক সমিতি ও আলফা-থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির নেতৃত্বে থাকা দুই ভাইয়ের প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করেই বারবার এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট দুই সংগঠনের নেতারা এটিকে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নয়; বরং সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব বলে দাবি করেছেন।

সূত্র জানায়, ২০২৪-এর ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর তার দোসররা বরিশাল ছেড়ে পালিয়ে যায়। ওই দিনই নগরীর কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ড দখলে নেন বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ারের মেজো ভাই মোশারেফ হোসেন। একই দিন বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন টেম্পুস্ট্যান্ডটিও দখলে নেন তার ছোট ভাই মিজানুর রহমান অহিদ। তারা বিএনপির কোনো পদধারী নেতা না হলেও সংসদ সদস্য ভাইয়ের দাপটে প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এ কারণে নির্বাচন ছাড়াই দুই ভাই নিজেদের বাস মালিক ও আলফা-থ্রি-হুইলার মালিক সমিতর স্বঘোষিত সভাপতি দাবি করে দুটি স্ট্যান্ডই দখল করে নিয়েছেন।

সংসদ সদস্যের ভাই হওয়ার সুবাদে বিএনপির কোনো নেতাকর্মীও তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করছেন না। ফলে ইচ্ছামতো ভাড়া বৃদ্ধি করে তা আদায় করছেন তারা। বিশেষ করে বরিশাল নগরীতে চলাচলকারী আলফা, টেম্পু, অটো ও সিএনজির অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলেই চালকদের হাতে লাঞ্ছিত হতে হয় যাত্রীদের।

সূত্র জানায়, বরিশাল নগরীর বাইরে রহমতপুর-বানারীপাড়া-উজিরপুর-সানুহার গৌরনদীসহ বিভিন্ন রুটে মহাসড়কেই অবাধে চলছে আলফা ও সিএনজি। এ বিষয়ে বাসশ্রমিকদের পক্ষ থেকে আপত্তি তোলা হলেও কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। বাসশ্রমিকদের দাবি, বাসের সামনেই মাহিন্দ্রা ও সিএনজি থামিয়ে যাত্রী বহন করা হচ্ছে। আলফা-থ্রি-হুইলার মালিক সমিতর সভাপতির দাপটেই তারা এমনটি করছেন। এর প্রতিবাদ করা হলে হামলার শিকার হতে হচ্ছে বাসশ্রমিকদের। এমনকি এ নিয়ে সাধারণ শ্রমিকরা প্রতিবাদ করার সাহসও পাচ্ছেন না। দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা থাকলেও প্রতিকারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।

বাসশ্রমিকরা জানান, গত সোমবার বানারীপাড়া এলাকায় বাসের সামনে থ্রি-হুইলার থামিয়ে যাত্রী ওঠানোকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এর জেরে বরিশাল থেকে দূরপাল্লা ও অভ্যন্তরীণ সব রুটে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা বাস চলাচল বন্ধ থাকে। পরে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বৈঠকের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

এর একদিন পর গতকাল মঙ্গলবার সকালে রহমতপুর এলাকায় থ্রি-হুইলার শ্রমিকদের বিরুদ্ধে দুটি বাসের চালককে মারধরের অভিযোগ ওঠে। আহত দুই চালককে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে বাসশ্রমিকরা ফের ধর্মঘটের ডাক দেন। তাদের দাবি, চালকদের ওপর হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কসহ অন্যান্য মহাসড়কে মাহিন্দ্রা ও থ্রি-হুইলার চলাচল বন্ধ করতে হবে।

এ ঘটনার জেরে দুপুর ১টার দিকে নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে দূরপাল্লাসহ বিভিন্ন রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে নথুল্লাবাদ এলাকায় মহাসড়কের দুপাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। আটকা পড়ে দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহন। বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষমাণ যাত্রীরাও পড়েন চরম দুর্ভোগে। জরুরি প্রয়োজনে অনেককে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে বিকল্প যানবাহনে গন্তব্যে যেতে হয়। পরে বিকাল ৫টার পর বাস চলাচল স্বাভাবিক হয়।

এ ব্যাপারে বরিশাল মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাছরিন আমার দেশকে বলেন, নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড ও টেম্পুস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যক্তিরা বিএনপির কেউ নন। সংসদ সদস্যের ভাই হওয়ার প্রভাব দেখিয়ে তারা স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ড বিএনপি মেনে নেবে না।

নথুল্লাবাদ বাসশ্রমিক আরজু মৃধা বলেন, সংসদ সদস্যের দুই ভাইয়ের একজন বাস মালিক সমিতি এবং অন্যজন আলফা-থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির সভাপতি। একই পরিবারের দুই ভাই দুটি সংগঠনের নেতৃত্বে থাকার পরও বিরোধের সমাধান হচ্ছে না। ফলে হাজার হাজার যাত্রীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

অপর বাসশ্রমিক মো. রাশেদ বলেন, দুপক্ষের বিরোধ দিনদিন বাড়ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে যাত্রী হয়রানি আরো বাড়বে।

তবে আলফা-থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমান অহিদ আমার দেশকে বলেন, ‘ভাই ভাইয়ের ঝামেলা হলে তা ঘরে হবে, রাস্তায় নয়। এটা সংগঠনের বিষয়।’ পুরোনো একটি বিরোধের কারণে বাবুগঞ্জ-মীরগঞ্জ রুটে বাস চলাচল বন্ধ থাকার বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেন।

বাস মালিক সমিতির সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, প্রশাসনের সঙ্গে বাস মালিক ও আলফা-থ্রি-হুইলার মালিক-শ্রমিকদের বৈঠকে বিষয়টির সমাধান হয়েছে। বিকাল ৫টার পর সব রুটে বাস চলাচলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দুই ভাই একই পরিবারের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও কেন বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছেÑএ প্রশ্নের জবাবে তিনিও বিষয়টি সংগঠনগত বলে মন্তব্য করেন।

বরিশাল জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার আমার দেশকে বলেন, সোমবারের বিরোধের পর দুপক্ষকে নিয়ে বৈঠক করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়েছিল। মঙ্গলবার ফের বিরোধের জেরে বাস চলাচল বন্ধ হলে দুপুর আড়াইটায় দুপক্ষকে নিয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করা হয়। বৈঠকে বিরোধ মীমাংসা করে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনায় না জড়ানোর অঙ্গীকার নেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসক বলেন, ভবিষ্যতে যাত্রীদের কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হতে হলে সংশ্লিষ্ট দুপক্ষের বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বৈঠকের পর বিকাল ৫টা থেকে বাস চলাচল স্বাভাবিক হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন