মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইল ও ইরানের যুদ্ধের কারণে 'মেঘ চুরি' কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে, এমন ভুয়া দাবি মধ্যপ্রাচ্যের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
এক সপ্তাহ আগে আল-রাশিদ টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরাকের সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল-খাইকানি দাবি করেন, প্রতিবেশী তুরস্ক ও ইরান নাকি অভিযোগ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র বিমান ব্যবহার করে মেঘ 'ভেঙে ফেলা' এবং 'চুরি' করার চেষ্টা করছে।
কোনো প্রমাণ না দিয়েই তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক দিন ও মাসগুলোতে ইরাকে আবার বৃষ্টি ফিরেছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ইরানের যুদ্ধ নিয়ে 'ব্যস্ত' থাকায় তারা আর এসব করতে পারছে না।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের হাতে এখনও এমন কোনো প্রযুক্তি নেই যার মাধ্যমে 'মেঘ চুরি' করা সম্ভব।
ইরাকের আবহাওয়া অধিদপ্তরের মুখপাত্র আমের আল-জাবিরি এই দাবিকে 'বৈজ্ঞানিক বা যুক্তিসঙ্গত নয়' বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরেই যুদ্ধ শুরুর (২৮শে ফেব্রুয়ারি) অনেক আগে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল যে ২০২৬ সাল ইরাকে বৃষ্টিপূর্ণ হবে।
বিবিসির সঙ্গে কথা বলার সময় আল-খাইকানি আবারও দাবি করেন যে 'বায়ুমণ্ডল পরিবর্তনের অস্ত্র' ব্যবহার করে ইচ্ছাকৃতভাবে ইরাকে খরা তৈরি করা হয়েছে। তবে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি।
তার এই বক্তব্য সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা দাবির সঙ্গেও মিল রয়েছে।
তুরস্কে কিছু ব্যবহারকারী ইরান যুদ্ধের সঙ্গে সেখানে হওয়া অতিবৃষ্টির সম্পর্ক খুঁজছেন। তুরস্কের পরিবেশ, নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬৬ বছরের মধ্যে ফেব্রুয়ারি মাসে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছিল।
১০ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে এমন একটি পোস্টে একজন দাবি করেন, যুদ্ধের কারণে আকাশপথ বন্ধ থাকায় যুক্তরাষ্ট্র আর 'মেঘ চুরি' করতে পারছে না, তাই তুরস্কে 'অবিরাম' বৃষ্টি হচ্ছে।
অন্য কিছু মানুষ ভুলভাবে দাবি করেছেন, ইরানে চলমান খরা, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল, তা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুতে ইরানের হামলার পর 'মাত্র পাঁচ দিনে শেষ হয়ে গেছে'।
জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক কাবে মাদানি বলেন, "এর পেছনে অনেকটা দায় মানুষের অবিশ্বাস, জলচক্র ও জলবায়ু ব্যবস্থার সম্পর্কে অজ্ঞতা।"
এই ভিত্তিহীন দাবিগুলো ছড়ানো অনেকেই বলছেন, সমস্যার মূল হলো 'ক্লাউড সিডিং' নামের একটি প্রক্রিয়া, যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ক্লাউড সিডিং হলো একটি আবহাওয়া পরিবর্তন পদ্ধতি, যেখানে বিদ্যমান মেঘকে প্রভাবিত করে বৃষ্টি বা তুষারপাত বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।

এটি সাধারণত বিমান ব্যবহার করে মেঘের মধ্যে ছোট ছোট কণা, যেমন সিলভার আয়োডাইড ছড়িয়ে দিয়ে করা হয়, যাতে পানির ফোঁটা তৈরি হয়ে বৃষ্টি নামতে সাহায্য করে।
গত বছর, ইরানে যখন বৃষ্টিপাত রেকর্ড পরিমাণ কমে যায় এবং জলাধারগুলো প্রায় শুকিয়ে যায়, তখন কর্তৃপক্ষ উর্মিয়া হ্রদ এলাকায় ক্লাউড সিডিং করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই পদ্ধতি যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অনেক দেশে ব্যবহৃত হলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর প্রভাব খুবই সীমিত। এটি বিদ্যমান মেঘ থেকে সর্বোচ্চ ১৫% পর্যন্ত বৃষ্টিপাত বাড়াতে পারে।
আবুধাবির খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডায়ানা ফ্রান্সিস বলেন, "এটিকে এমনভাবে ভাবুন যে এটি কেবল আগে থেকেই থাকা একটি মেঘকে একটু 'ধাক্কা' দেয়, পুরো আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে না।"
"মেঘ চুরি" তত্ত্বে যারা বিশ্বাস করেন, তারা দাবি করেন, এক জায়গায় ক্লাউড সিডিং করলে পাশের এলাকায় বৃষ্টির ঘাটতি তৈরি হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গবেষণায় এর তেমন কোনো প্রমাণ নেই।
ওয়াইওমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞানী ড. জেফ ফ্রেঞ্চ বলেন, "এ ধরনের প্রভাব থাকলেও তা খুবই ক্ষুদ্র এবং স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ওঠানামার মধ্যেই হারিয়ে যায়।"
বিজ্ঞানীরা আরও বলছেন, আবহাওয়ার গতিপথ বা তীব্রতা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করার মতো কোনো প্রযুক্তি আসলে নেই।
বরং তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে চরম আবহাওয়া আরও বেশি ও তীব্র হচ্ছে।
মানুষের কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে কয়লা, গ্যাস ও তেল পোড়ানোর মত ঘটনা পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মতে, মধ্যপ্রাচ্যে তাপমাত্রা সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণ হারে বাড়ছে।
জাতিসংঘের জলবায়ু প্যানেল (IPCC) বলছে, মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র তাপপ্রবাহ বাড়ছে, যা সীমিত পানি সম্পদের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করছে।
একই সঙ্গে বৃষ্টিপাতও অনিয়মিত হয়ে যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে কম হলেও, মাঝে মাঝে হঠাৎ করে প্রবল বৃষ্টিতে বন্যা তৈরি হচ্ছে।
জর্ডানের মুতাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. এসরা তারাওনেহ বলেন, "এই পরিস্থিতি মানুষের মধ্যে পানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।"
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের জটিল ও চাপপূর্ণ পরিস্থিতিতে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ বা পানি সম্পদ নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. সারা স্মিথ বলেন, "জটিলতা ও অনিশ্চয়তা মানুষকে ষড়যন্ত্রমূলক চিন্তার দিকে টেনে নেয়। মানুষ তখন সহজ ও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা খুঁজে নেয়, কিন্তু এতে করে আসল বিষয়টি তারা বুঝতে পারে না।"
এসআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

