মিডলইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ

আমেরিকান জনগণের সমর্থন হারিয়েছে ইসরাইল, এরপর কি রাজনীতিবিদদের পালা

আমেরিকান জনগণের সমর্থন হারিয়েছে ইসরাইল, এরপর কি রাজনীতিবিদদের পালা

ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিতর্ক সাম্প্রতিক সময়ে আরো তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ, ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা এবং মার্কিন অর্থ ও অস্ত্র সহায়তার প্রশ্নে ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যেই মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

সমালোচকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ইসরাইলের প্রভাব নিয়ে যে প্রশ্নগুলো দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হলেও মূলধারার রাজনীতিতে সীমিত ছিল, সেগুলো এখন নির্বাচনি রাজনীতি ও কংগ্রেসের বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সামরিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে ২০১৬ সালে স্বাক্ষরিত ১০ বছর মেয়াদি একটি সমঝোতা স্মারকের কথা উল্লেখ করা হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী ২০১৯ থেকে ২০২৮ অর্থবছর পর্যন্ত ইসরাইলের বছরে ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এর বাইরে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতার জন্য বছরে আরো ৫০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বরাদ্দের কাঠামো রয়েছে।

তবে গাজা যুদ্ধের পর এই সহায়তা নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে সমালোচনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর একটি বড় উদাহরণ ২০২৬ সালের জুলাইয়ে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ভোট। রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান থমাস ম্যাসি ইসরাইলের জন্য প্রস্তাবিত ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধের লক্ষ্যে একটি সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। প্রস্তাবটি ১০৪-৩১৪ ভোটে প্রত্যাখ্যাত হলেও এর পক্ষে ১০৩ জন ডেমোক্র্যাট সদস্য এবং ম্যাসি ভোট দেন।

এই ভোটকে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইল নীতিতে পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রায় অর্ধেক সদস্যের সমর্থন দেখিয়েছে যে দলটির ভেতরে ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রশ্নে আগের তুলনায় বড় ধরনের মতভেদ তৈরি হয়েছে।

দলীয় রাজনীতিতেও বাড়ছে বিভাজন

ইসরাইল ইস্যুতে ডেমোক্রেটিক পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যেও ভিন্ন অবস্থান দেখা যাচ্ছে। প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিস ম্যাসির সংশোধনীর বিপক্ষে ভোট দিলেও মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

অন্যদিকে, প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা সীমিত বা বন্ধ করার পক্ষে আরো জোরালো অবস্থান নিয়েছে। ফলে গাজা যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা এখন শুধু পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়, ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

মিশিগানে আবদুল এল-সায়েদের উত্থান

এই পরিবর্তনের আরেকটি দৃষ্টান্ত মিশিগানের রাজনীতি। ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রাইমারিতে আবদুল এল-সায়েদের বিজয় ইসরাইল ইস্যু ও প্রচার অর্থায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। প্রাইমারি নির্বাচনের আগে ইসরাইলপন্থী লবিং সংগঠন আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি—এআইপ্যাক—এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো এল-সায়েদের প্রতিদ্বন্দ্বী হ্যালি স্টিভেন্সকে সমর্থন দিতে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিল বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস বা বর্তা সংস্থা এপি জানিয়েছিল।

কিন্তু ৪ আগস্টের প্রাইমারিতে এল-সায়েদই ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিসেবে জয় পান। এরপর তিনি নভেম্বরে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে মিশিগানের নির্বাচন এখন ইসরাইল নীতি, দলীয় বিভাজন এবং নির্বাচনি অর্থের প্রভাব নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

বদলে যাচ্ছে জনমত ও রাজনৈতিক ভাষ্য

ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে মার্কিন সমাজের মনোভাব পরিবর্তনের দাবি নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পীসমাজ, তরুণ ভোটার এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে ইসরাইলের সামরিক অভিযান ও মার্কিন সহায়তা নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনা বেড়েছে।

এই পরিবর্তন রাজনৈতিক পরিসরেও প্রতিফলিত হচ্ছে। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি থেকে শুরু করে বার্নি স্যান্ডার্স ও আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজের মতো প্রগতিশীল রাজনীতিকরা ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে মার্কিন নীতির পরিবর্ত ভিন্নমত আরো দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রতিনিধি পরিষদের ভোটটি সেই বিভাজনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো বিষয়গুলো যখন মার্কিন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন বিদেশি সামরিকনের পক্ষে বিভিন্ন সময়ে অবস্থান নিয়েছেন।

একই সময়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যেই ইসরাইল নীতি নিয়ে ভিন্নমত আরো দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রতিনিধি পরিষদের ভোটটি সেই বিভাজনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।

সামরিক ব্যয়ের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সংকটের প্রশ্ন

ইসরাইলকে সামরিক সহায়তার বিতর্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো বিষয়গুলো যখন মার্কিন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন বিদেশি সামরিক সহায়তার পরিমাণ ও অগ্রাধিকার নিয়ে বিতর্কও বাড়ছে।

সমালোচকদের যুক্তি, বিদেশি সামরিক সহায়তার পাশাপাশি মার্কিন সরকারের নিজস্ব জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার দিকে নির্ধারকদের বক্তব্য হলো, ইসরাইলের নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সামরিক সহযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নিরাপত্তমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই। তবে সাম্প্রতিক কংগ্রেস ভোট, ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য এবং মিশিগানের মতো কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, সেটিও রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হওয়া উচিত।

অন্যদিকে, ইসরাইলকে সমর্থনকারী মার্কিন রাজনীতিক ও নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য হলো, ইসরাইলের নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সামরিক সহযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নিরাপত্তা ও মিত্রতার কাঠামোর অংশ।

সামনে কী?

ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের মৌলিক কাঠামো এখনই বদলে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই। তবে সাম্প্রতিক কংগ্রেস ভোট, ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য এবং মিশিগানের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনি লড়াইয়ে ইসরাইল নীতির ভূমিকা দেখাচ্ছে যে বিষয়টি আগের তুলনায় অনেক বেশি রাজনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশেষ করে ১০৩ জন ডেমোক্র্যাটের ইসরাইলি সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে ভোট দেওয়া মার্কিন কংগ্রেসে দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় ঐকমত্যের ওপর নতুন চাপের ইঙ্গিত দিয়েছে।

ফলে আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইল নীতি শুধু ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতির আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি দেশটির দলীয় রাজনীতি, নির্বাচনি অর্থায়ন, তরুণ ভোটারদের অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ভূমিকা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের কেন্দ্রে থাকতে পারে।

সূত্র: মিডলইস্ট আই

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন