জনপ্রশাসন খাতে চাই কার্যকর সংস্কার

জনপ্রশাসন খাতে চাই কার্যকর সংস্কার

স্বৈরাচারের পতন হয়েছে দুই বছরের বেশি হলো। তার পর থেকে চারদিকে শুধু একটাই কথা—‘সংস্কার চাই, সংস্কার।’ এখন প্রশ্ন—আমরা আসলে কেমন সংস্কার চাই? বিগত সময়ে বাংলাদেশে অনেক সংস্কার হয়েছে, অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু যাদের জন্য সংস্কারের কথা বলা হয়, তাদের কি সত্যিই কোনো উপকার হয়েছে? ভোগান্তি কমেছে? খুব স্বাভাবিকভাবেই উত্তর হবে, ‘না।’

আমাদের দেশে সরকার বদলায়, ক্ষমতার চেয়ার বদলায়, রাজপথের স্লোগান বদলায়; কিন্তু একটা জিনিস কখনো বদলায় না—তা হলো সাধারণ মানুষের কপাল আর সরকারি অফিসগুলোর সেই চিরচেনা ভোগান্তি। নতুন নতুন কমিশন গঠিত হয়, নামিদামি বিশেষজ্ঞরা গোলটেবিল বৈঠক করেন, আর মোটা মোটা বইয়ের মতো সুপারিশের রিপোর্ট জমা পড়ে। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ফলাফল শূন্য। আমরা যারা সাধারণ মানুষ, প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধে বেঁচে থাকার তাগিদে আমাদের কোনো না কোনো সরকারি অফিসে গিয়ে মাথা ঠুকতেই হয়। আর ঠিক তখনই হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়, আমাদের দেশের জনপ্রশাসন ভেতর থেকে কতটা ধসে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরো সহজে বোঝার জন্য নিজের বা চারপাশের সাধারণ কোনো মানুষের অভিজ্ঞতার কথা ভেবে দেখুন। কষ্টার্জিত টাকায় কেনা সামান্য কয়েক শতক জমির খতিয়ান সংশোধন করতে বা একটা নামজারি করাতে গেলে আপনাকে কত-শতবার ভূমি অফিসে দৌড়াতে হয়? অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে বড় বাবু—টেবিলের নিচ দিয়ে হাজার টাকার নোট না গুঁজে দিলে আপনার ফাইলের ওপর থেকে ধুলোর পাহাড় সরবে না। আবার সরকারি হাসপাতালে গেলে ভালো একটু চিকিৎসার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, অথচ নোটের আদান-প্রদানে মুহূর্তেই মিলছে বেড আর ডাক্তারের দেখা। সামান্য একটা চারিত্রিক বা জন্ম সনদ তুলতে গেলে পরিচিত দালাল ধরতে হয়, আর থানায় কোনো সমস্যা নিয়ে গেলে সমাধান পাওয়া তো দূরের কথা—উল্টো নিজেকেই অপরাধী মনে হয়।

এসবের মূলে রয়েছে ব্যবস্থানির্ভর মানসিকতা। ব্রিটিশরা এ দেশ ছেড়েছে প্রায় ৮০ বছর হতে চলল, কিন্তু তাদের তৈরি করে যাওয়া ‘প্রভু’ সাজার মানসিকতা আমাদের দেশের আমলাদের রগে রগে আজও বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। আমরা যে সরকারি কর্মকর্তাদের মাইনে দিই, তা যে এই দেশের খেটে খাওয়া দিনমজুর থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের করের টাকা—এই সহজ সত্যটা তারা সুবিধাজনকভাবে ভুলে যান এবং তা ইচ্ছা করেই। কথা ছিল তারা জনগণের সেবক হবেন, কিন্তু সেটা না হয়ে তারা নিজেদের রাষ্ট্রের একেকজন প্রতাপশালী অধিপতি মনে করেন। এমনটা হওয়ার সুযোগ কমে যেত যদি রাজনৈতিক আনুগত্য আর ঘুস দেওয়া-নেওয়ার পরিবর্তে মেধা, সততা আর যোগ্যতার বিচারে পদোন্নতির ব্যবস্থা বাস্তবায়ন হতো।

সঠিক ইচ্ছা ও শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র কীভাবে নিজের নাগরিকদের জীবন সহজ করে দিতে পারে, তার উদাহরণ হিসেবে সিঙ্গাপুরের কথা বলা যায়। সেখানে যোগ্যতা ছাড়া কারো চাকরি বা পদোন্নতি হয় না। আরেকটি ছোট দেশ এস্তোনিয়ার কথা ধরা যাক। তাদের দেশের জমিজমা-সংক্রান্ত কাজ, ব্যবসার লাইসেন্স নেওয়া বা ট্যাক্স দেওয়ার মতো ৯৯ শতাংশ সেবা অনলাইনে চলে গেছে। ওই দেশের কোনো নাগরিককে এখন আর কোনো কাজের জন্য সরকারি অফিসে গিয়ে কোনো অফিসারের সামনে হাতজোড় করে দাঁড়াতেই হয় না। সব কাজ কম্পিউটার বা মোবাইলে কয়েকটা ক্লিকেই হয়ে যায়। ফলে সেখানে কোনো ফাইল টেবিলে আটকে রাখার সুযোগ নেই, কোনো অফিসারকে ঘুস দেওয়ারও প্রয়োজন নেই।

আমরা যদি সত্যিই এই অমানবিক ব্যবস্থা থেকে বাংলাদেশকে বের করে আনতে চাই, তাহলে আমাদের এই পচা পুরোনো নিয়মগুলোকে ভেঙে ফেলতে হবে। বছরের পর বছর ধরে মুখে মুখে শুধু ‘সংস্কার’ জপলে কোনো কাজ হবে না, হাত দিতে হবে সমস্যার একদম মূল জায়গায়। প্রথমত, আমলাদের ক্ষমতা দেখানোর সুযোগ বন্ধ করতে হবে। ভূমি অফিস, পাসপোর্ট অফিস ও এনবিআরের মতো সেবাগুলোকে শতভাগ অনলাইনে এমনভাবে নিয়ে আসতে হবে যেন মানুষকে কোনো কর্মকর্তা বা পিয়নের মুখই দেখতে না হয়। দ্বিতীয়ত, ‘ফাইল ট্র্যাকিং সিস্টেম’ চালু করতে হবে। কোনো একটি ফাইল কার টেবিলে কত ঘণ্টা বা কত দিন ধরে আটকে আছে, তা যেন ওপরের মহল থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকও এক ক্লিকে স্পষ্ট দেখতে পান। আর নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না হলে সিস্টেম থেকেই যেন ওই কর্মকর্তার ওপর নির্ধারিত আদেশ চলে যায়। সর্বোপরি রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ও দলবাজি বন্ধ করে যেসব কর্মকর্তা সততা ও দক্ষতার সাথে কাজ করবেন, কেবল তাদেরই মূল্যায়ন করতে হবে। অপরাধ করলে শাস্তির বদলে ক্ষমা পাওয়ার যে সংস্কৃতি আমাদের দেশে গড়ে উঠেছে, তা পুরোপুরি উচ্ছেদ করতে হবে।

যে সংস্কারের গল্প আমরা পত্রিকায় বা রাজনৈতিক নথিপত্রে পড়ি, তা যদি বাস্তবে সাধারণ কাজে না আসে, তবে সেই সংস্কারের মূল্য নেই।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন