যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র তিন দিন বাকি। এর মধ্যে আগাম ভোট দিয়েছেন লাখো মার্কিন নাগরিক। জাতীয় পর্যায়ের জনমত জরিপে এখনো এগিয়ে রয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। এদিকে মঙ্গলবারের ভোট সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের প্রচারণা জোরদার করেছে দুই দলই। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, কানসাস ও আইওয়ায় তার নির্বাচনি সমাবেশও অনুষ্ঠিত হবে।
জনমত জরিপে যা দেখা যাচ্ছে
রিয়েল ক্লিয়ার পোলিংয়ের সর্বশেষ জাতীয় কংগ্রেস নির্বাচনসংক্রান্ত জনমত জরিপের গড় হিসাবে, রিপাবলিকানদের চেয়ে ৮ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ, রিপাবলিকানদের ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ইকোনমিস্ট ও ইউগভের আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, নিবন্ধিত ভোটারদের ৪৪ শতাংশ মনে করেন, নির্বাচনের পর প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পাবে ডেমোক্র্যাটরা। অন্যদিকে, ৩১ শতাংশ মনে করেন, নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে রিপাবলিকানরা।
সিনেটের ক্ষেত্রে ভোটারদের প্রত্যাশা অনেকটা কাছাকাছি। জরিপে ৩৯ শতাংশ মনে করেন, সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে ডেমোক্র্যাটরা। আর ৩৬ শতাংশের প্রত্যাশা, সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখবে রিপাবলিকানরা।
ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পলিটিকসের সাবাতো’স ক্রিস্টাল বলের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক কাইল কোন্ডিক আলজাজিরাকে বলেন, জাতীয় পর্যায়ের জরিপে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার চিত্র প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের ক্ষেত্রে ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কোন্ডিক বলেন, ‘প্রতিনিধি পরিষদের সাধারণ আসন নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের জরিপে ডেমোক্র্যাটদের বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকা দেখে মনে হচ্ছে, পরিষদটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।’
তবে তিনি বলেন, ‘এর অর্থ এই নয় যে সিনেটও ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে যাবে। এমনটা হতে পারে, তবে সিনেটের ফল এখনো অনেক বেশি অনিশ্চিত।’
আগাম ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষ
শুক্রবার প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্বাচনের পাঁচ দিন আগে পর্যন্ত ৪ কোটি ৩০ লাখের বেশি মার্কিন নাগরিক সরাসরি আগাম ভোট দিয়েছেন অথবা ডাকযোগে ব্যালট পাঠিয়েছেন।
২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ১ কোটি বেশি। সিনেটের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন রয়েছে, এমন কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে আগাম ভোটের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।
টেক্সাসে বুধবার পর্যন্ত ৬৩ লাখের বেশি মানুষ আগাম ভোট দিয়েছেন। ২০২২ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৪২ লাখ। অর্থাৎ আগাম ভোট বেড়েছে ৫০ শতাংশ।
শুক্রবার হিউস্টন থেকে আলজাজিরার প্রতিবেদক ফিল ল্যাভেল জানান, অঙ্গরাজ্যটিতে আগাম ভোটের সময় শেষ হওয়ার দিকে থাকলেও ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি অব্যাহত ছিল।
জর্জিয়ায় শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ২৫ লাখের বেশি ভোট পড়েছে। আলজাজিরার প্রতিবেদক ম্যাথিউ টরেস জানান, ২০২২ সালের আগাম ভোটের সময় মোট ২৩ লাখ ভোট পড়েছিল। এবার সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে।
আটলান্টার একটি ভোটকেন্দ্রে দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণও বেড়েছে।
এক তরুণ ভোটার আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমরা সবাই সবার জন্য আরো ভালো ভবিষ্যৎ চাই। বিশেষ করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।’
আরেক তরুণ ভোটার নির্বাচনে আগ্রহ বাড়ার কারণ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চিতভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যম ভোটকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।’
ডেমোক্রেটিক পার্টির রাজনৈতিক কৌশলবিদ সেলিন্ডা লেক বলেন, অনেক ভোটার পরিবর্তন চাইছেন।
তিনি বলেন, ‘অনেক ভোটার বলছেন, পরিবর্তনের আশায় আমি শেষ চেষ্টা করছি। তবে আশা করি, আপনারা কিছু একটা করবেন।’
এপি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২২ সালের একই সময়ের তুলনায় মেইন, মিশিগান, নর্থ ক্যারোলাইনা ও কানসাসে আগাম ভোটের হার ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
তবে আগাম ভোটের সংখ্যা থেকে ভোটাররা কোন প্রার্থীকে বেছে নিয়েছেন বা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফল কী হবে, তা বোঝা যায় না।
গত ২৪ ঘণ্টায় প্রচারণায় কী ঘটেছে
কানসাস ও আইওয়ায় সপ্তাহান্তের দুটি নির্বাচনি সমাবেশ বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, রোববার দুটি সমাবেশই অনুষ্ঠিত হবে।
বৃহস্পতিবার সমাবেশ দুটি বাতিল করা হয়েছিল। তখন হোয়াইট হাউস জানায়, ট্রাম্প এর পরিবর্তে প্রায় ২০টি টেলিফোনে নির্বাচনী প্রচারণামূলক অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। কিন্তু এক দিনেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি আবার সমাবেশ দুটি নিজের কর্মসূচিতে যুক্ত করেন।
আলজাজিরার প্রতিবেদক তানিয়া নুরি জানান, ট্রাম্পের নির্বাচনি দল মনে করছে, সরাসরি সমাবেশে তার উপস্থিতি রিপাবলিকান ভোটারদের সক্রিয় করতে সহায়তা করে।
নুরির ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারণাসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো তাকে জানিয়েছে, ‘রোববার সরাসরি সমাবেশে ফিরতে তিনি (ট্রাম্প) উদ্দীপ্ত।’
তিনি আরো জানান, ট্রাম্পের দল মনে করে, তার উপস্থিতি রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে উদ্দীপনা তৈরি করে। বিশেষ করে যেসব অঙ্গরাজ্যে সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হচ্ছে, সেখানে এ প্রভাব বেশি।
শুক্রবার ফ্লোরিডাতেও প্রচারণা চালান ট্রাম্প। অঙ্গরাজ্যটিতে সিনেট ও গভর্নর পদ ধরে রাখার লড়াই করছে রিপাবলিকানরা।
সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনাদের ভোট দিতে হবে। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়লে খারাপ ঘটনা ঘটে, তাই না? তাহলে ধরে নিই, তারা এক পয়েন্টে পিছিয়ে আছে।’
এদিকে টেক্সাসে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী কেন প্যাক্সটন ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকো শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় হিউস্টনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে জানান আলজাজিরার প্রতিবেদক ল্যাভেল।
আগাম ভোটের সময় শেষ হওয়ার দিকে থাকায় টেক্সাসের সবচেয়ে জনবহুল কাউন্টি হ্যারিস কাউন্টিতে প্রচারণা চালাতে এল পাসোর একটি কর্মসূচি বাতিল করেন প্যাক্সটন।
শুক্রবার মিসিসিপিতে ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষে নির্বাচনি প্রচারণা চালান সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ভোট দেওয়ার জন্যও জনগণের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ক্লিনটন বলেন, ‘মিসিসিপিতে যেসব মানুষ ভোট দেননি, তাদের কারণে আমার অনেক প্রিয় মানুষ নির্বাচনে হেরে গেছেন।’
সপ্তাহান্তে কোথায় প্রচারণা চালাবেন ট্রাম্প ও ডেমোক্র্যাটরা
রোববার আইওয়া ও কানসাসে পরপর দুটি নির্বাচনি সমাবেশ করবেন ট্রাম্প। আইওয়ায় তিনি রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী অ্যাশলি হিনসনের পক্ষে প্রচারণা চালাবেন। পরে কানসাসে গিয়ে সিনেটর রজার মার্শালের সঙ্গে সমাবেশে অংশ নেবেন।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী হিসেবে পরিচিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে সিনেট নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কানসাসে মার্শাল তার ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী ও মেগাচার্চের যাজক অ্যাডাম হ্যামিলটনের বিরুদ্ধে কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়েছেন।
এমারসন কলেজের একটি জরিপে দেখা গেছে, হ্যামিলটনের সমর্থন ৪৯ শতাংশ, মার্শালের ৪৫ শতাংশ।
এদিকে ভোটারদের কাছে শেষ মুহূর্তের আবেদন জানাচ্ছেন ডেমোক্র্যাটরাও। কেনটাকির গভর্নর অ্যান্ডি বেশিয়ার ও ওহাইওর গভর্নর পদপ্রার্থী অ্যামি অ্যাকটন একটি নির্বাচনি অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।
আলাস্কার ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী মেরি পেলটোলাও অঙ্গরাজ্যটির বেথেল শহরে একটি সমাবেশে যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
আলাস্কার সিনেট নির্বাচনকে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব নির্বাচনের ফলের ওপর নির্ভর করতে পারে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে কি না।
তবে ড্যান সুলিভান নামের দুই প্রার্থীকে ঘিরে বিরোধের কারণে আলাস্কার নির্বাচন জটিল হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, রিপাবলিকান সিনেটরকে বিভ্রান্ত করতে এবং তার সমর্থন কমিয়ে দিতে ডেমোক্র্যাটরা একই নামের একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে নির্বাচনে দাঁড় করিয়েছে।
এ ঘটনায় বিচার বিভাগ আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এ ধরনের প্রার্থী নিয়োগের অভিযোগে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন পেলটোলা।
এদিকে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সও সপ্তাহ শেষে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসনের সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

