রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-ঝঞ্ঝা আর চরম দারিদ্র্য মোকাবিলা করে সাফল্যের চূড়ায় আরোহণ করেছেন চা-কন্যা শান্তা যাদব। তার শৈশব কেটেছে সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই। সেই দারিদ্র্য ও সীমাবদ্ধতা তার স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তার বিস্তৃত স্বপ্ন সফল করেছেন। চা-বাগানের কুঁড়েঘর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাচীনতম হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেয়ে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার লংলা চা-বাগানের শান্তা যাদব।
তিনি প্রায় ২ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৃত্তিসহ বিশ্বের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার অব মেডিকেল সায়েন্স ইন গ্লোবাল হেলথ ডেলিভারি প্রোগ্রামে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিষয়ে এই উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তবে নিজের স্বপ্ন ও লক্ষ্য সামনে রেখে শান্তা বেছে নিয়েছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়। স্নাতকোত্তর গবেষণার জন্য ইতোমধ্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করেছেন।
শান্তা যাদব বেড়ে উঠেছেন মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার টিলাগাঁও ইউনিয়নের লংলা চা-বাগানে। তার বাবা লক্ষ্মীনারায়ণ যাদব একজন চা-শ্রমিক। মা রীনা যাদব। চা-কন্যা শান্তা লংলা চা-বাগানের একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে ওই বাগানের ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি পাস করেন। চরম দারিদ্র্য ছিল তার নিত্যসঙ্গী। মা-বাবার সঙ্গে গরু পালন থেকে শুরু করে গৃহস্থালির সব কাজকর্মে সহযোগিতা করে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। পরে তিনি ভর্তি হন শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজে। সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করে চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে পাবলিক হেলথ বিষয়ে অনার্স কোর্সে ভর্তি হন। সেখান থেকে সাফল্যের সঙ্গে অনার্স সম্পন্ন করে বিশ্বের অন্যতম বিদ্যাপীঠ আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে মাস্টার অব মেডিকেল সায়েন্স ইন গ্লোবাল হেলথ ডেলিভারি প্রোগ্রামে মাস্টার্স সম্পন্ন করতে ২০ আগস্ট আমেরিকায় গিয়ে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হয়েছেন।

শান্তা যাদবের বাবা লক্ষ্মীনারায়ণ আমার দেশকে বলেন, ‘আমি একজন চা-শ্রমিক। বাগানের ডিসপেনসারিতে কাজ করি। প্রতিদিন মজুরি পাই মাত্র ১৮৭ টাকা। গরু পালন ও সামান্য খেতখামার করে সংসার চলে। আমার দুই ছেলে, এক মেয়ে। দুই ছেলেও অনার্সে পড়ছে। এক ছেলে শ্রমিকের কাজ করছে। বড় ছেলে পড়াশোনা চালিয়ে শ্রমিকের কাজ করে। আমি আনন্দিত, আবেগাপ্লুত। ঈশ্বরের কৃপায় আমার মেয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করার সুযোগ পেয়েছে। অভাব-অনটন, দারিদ্র্য মোকাবিলা করে আমি এগিয়ে যাচ্ছি।’
এদিকে, শান্তার সাফল্যে কুলাউড়ার ২৬টি চা-বাগানজুড়ে আনন্দের উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। কুলাউড়ার চা-বাগানের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো চা-কন্যা বিশ্বের অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ পেলেন। আনন্দে আত্মহারা হয়ে এই কথাগুলো জানালেন বিশিষ্ট চা-শ্রমিক নেতা ও লংলা বাগানের সঞ্জু গোস্বামী।
শান্তার বাবা-মা রীনা জানান, তাদের মেয়ে হার্ভার্ডে উচ্চশিক্ষা শেষে বিশেষ করে চা-বাগানের শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করতে চায়। নিজের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তার জীবনের লক্ষ্য।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

