রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগের মধ্যেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। নতুন ঋণ বিতরণ কমিয়ে আনার পরও পুরোনো ঋণ দফায় দফায় খেলাপি হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নানা ধরনের নীতি-সুবিধা দেওয়ার পরও এসব ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমাতে পারছে না। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসেই পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬,০০০ কোটি টাকার বেশি বেড়েছে। শুধু খেলাপি ঋণই নয়, ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতি এবং মূলধন ঘাটতিও বড় আকার ধারণ করেছে।
ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেসব বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছিল, তাদের অনেকেই এখন ঋণ পরিশোধে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আবার পুরোনো খেলাপি ঋণের সঙ্গে নতুন করে আরো ঋণখেলাপি হচ্ছে। ফলে একদিকে নীতি-সুবিধা দিয়ে কিছু ঋণ সাময়িকভাবে নিয়মিত দেখানো হলেও অন্যদিকে নতুন খেলাপি ঋণ ও পুরোনো বকেয়া বাড়তে থাকায় সামগ্রিকভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমছে না।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংক হলো—সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংক। গত জুন শেষে এই পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫১ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬,৩০৪ কোটি টাকা। এ সময় সোনালী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কিছুটা কমলেও বাকি তিন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে।
সোনালী ব্যাংকের ঋণ কমলেও খেলাপির চাপ
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কিছুটা কমলেও তা এখনো মোট ঋণের প্রায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। গত জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৭১০ কোটি টাকা, যা গত ডিসেম্বরে ছিল প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা।
সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে দেওয়া ঋণের একটি অংশ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খেলাপি হয়ে পড়ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধ বন্ধ করে দেয়। এতে প্রতিষ্ঠান দুটির প্রায় ১,৫৪৪ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে পড়ে। এ কারণেও ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার এখনো তুলনামূলক বেশি।
হল-মার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় আলোচিত সোনালী ব্যাংক কয়েক বছর ধরেই নতুন ঋণ বিতরণে সংযত রয়েছে। ব্যাংকটি গ্রাহকের আমানতের বড় অংশ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে মুনাফা করছে। ফলে নতুন ঋণ বিতরণে ব্যাংকটি অনেকটাই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে নতুন ঋণ বাড়ার পরিবর্তে উল্টো প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা কমেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, টানা পাঁচ বছর ধরে সোনালী ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানে গভর্নর ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
অগ্রণীতে বেড়েছে সাড়ে ৩,০০০ কোটি টাকা
সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমলেও অগ্রণীতে বেড়েছে। গত ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে এ ব্যাংকে। গত ডিসেম্বরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ২৮ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। ছয় মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩,৫১৮ কোটি টাকা। এ সময় ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা।
অগ্রণী ব্যাংকের এমডি আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৫০ শতাংশই শীর্ষ ২০ জন বড় ঋণগ্রহীতার কাছে আটকে আছে। এই বড় গ্রাহকরা ঋণ পরিশোধে এগিয়ে আসছেন না, যা খেলাপি ঋণ কমাতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির। খেলাপিরা আইনকে খুব একটা ভয় পাচ্ছে না। কারণ, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরকার পরিবর্তনের পরও বড় ঋণখেলাপিরা তাদের পুরোনো প্রভাব ও শক্তি ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।
জনতার খেলাপি ৭৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াল
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ এখন জনতা ব্যাংকের। গত ছয় মাসে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩,০২০ কোটি টাকা। জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭৫ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা, যা গত ডিসেম্বরে ছিল ৭২ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। জুন শেষে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ২২৬ কোটি টাকা।
ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যবসায়ীর অনেকে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, আবার কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ আদায় কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে ধীর হয়ে গেছে। আদায় কমে যাওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণও বাড়ছে।
ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে শীর্ষ ২০টি গ্রুপের কাছেই আটকে আছে ৫২ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৭২ শতাংশ। সবচেয়ে বড় খেলাপি গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ ও এস আলম গ্রুপ।
রূপালীতে কিছুটা বেড়েছে, বেসিকে কমেছে
গত ডিসেম্বরে রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ১৯ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৫৯ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ছিল ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা।
অন্যদিকে বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ১৫২ কোটি টাকা, যা গত ডিসেম্বরে ছিল ৮,২৫৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে খেলাপি ঋণ কমেছে ১০২ কোটি টাকা। তবে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার এখনো প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে।
ছয় মাসেও দৃশ্যমান সংস্কার নেই
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কার কার্যক্রমে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এরই মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে।
এই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ঋণ আদায় জোরদারে সরকারের পক্ষ থেকে বড় কোনো কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংকের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসতে পারে—এমন শঙ্কা থাকায় ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের মধ্যেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ‘চেইন অব কমান্ড’ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আবার সরকারের পক্ষ থেকে মেয়াদ পূর্ণ করার বিষয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা না থাকায় বর্তমান চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকরাও অনেক ক্ষেত্রে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম অনেকটাই দায়সারাভাবে চলছে। এর প্রভাব পড়ছে ঋণ আদায়, নতুন ঋণ বিতরণ এবং খেলাপি ঋণ কমানোর কার্যক্রমে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

