উত্তরবঙ্গে প্রথম গ্যাসক্ষেত্র পাওয়ার সম্ভাবনা পাবনায়

উত্তরবঙ্গে প্রথম গ্যাসক্ষেত্র পাওয়ার সম্ভাবনা পাবনায়

উত্তরাঞ্চলে নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাবনা ঘিরে দীর্ঘদিনের অপেক্ষা অবসানের পথে। পাবনার মোবারকপুরে নতুন করে গভীর অনুসন্ধান কূপ খননের কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)। ‘মোবারকপুর ডিপ-১’ নামে এই প্রকল্প সফল হলে তা শুধু জাতীয় গ্রিডেই গ্যাস সরবরাহ বাড়াবে না, বদলে দেবে পুরো উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক দৃশ্যপট।

বর্তমানে সুজানগর উপজেলার আহমেদপুর ইউনিয়নের কুড়িপাড়া গ্রামে ছয় একর জমিতে প্রকল্পের উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। এটি হবে উত্তরবঙ্গের প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্যাস কূপ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালে রিগ ফাউন্ডেশন নির্মাণ এবং ২০২৮ সালে মূল খননকাজ শুরু হবে।

বিজ্ঞাপন

পাবনার সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলার সীমান্তবর্তী মোবারকপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাসের সম্ভাবনা নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। এর আগে ২০১৪ সালে প্রায় ৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪.৫ কিলোমিটার গভীরতায় একটি কূপ খননের উদ্যোগ নেয় বাপেক্স। তবে ভূগর্ভে অতিরিক্ত গ্যাসচাপ এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির অভাবে নির্ধারিত গভীরতায় পৌঁছানোর আগেই কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেই প্রকল্প পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

দেশে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত ও সফলভাবে খনন করা গ্যাসকূপগুলোর অধিকাংশ চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে। মোবারকপুর ডিপ-১ প্রকল্পে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় এবার উত্তরাঞ্চলেও গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছে সরকার।

প্রকল্প সূত্র জানায়, সারা দেশে তিনটি এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ১ হাজার ১৩৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনটি গভীর অনুসন্ধান কূপ খননের একটি মেগা প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। এর অধীনে পাবনার মোবারকপুর ডিপ-১ ছাড়াও কুমিল্লা শ্রীকাইল ডিপ-১ ও সিলেট ফেঞ্চুগঞ্জ সাউথ-১ খনন করা হবে। এ প্রকল্পে সরকার ঋণ হিসেবে ৯০৯ কোটি টাকা দিচ্ছে এবং বাপেক্স নিজস্ব অর্থায়ন থেকে জোগান দিচ্ছে ২২৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

ভূগর্ভের উচ্চ চাপ মোকাবিলা এবং ৬ কিলোমিটারের বেশি গভীরে খননের কারিগরি দক্ষতার জন্য আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সিএনপিসি চুয়ানচিং ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড’ (সিসিডিসি)-এর সঙ্গে চুক্তি করেছে বাপেক্স। চীনা এই প্রতিষ্ঠানটি রিগ ফাউন্ডেশন নির্মাণ ও মূল ড্রিলিংয়ের কাজ করবে। সিসিডিসি বর্তমানে কুমিল্লায় কাজ চালাচ্ছে, সেখান থেকেই রিগ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাবনায় স্থানান্তর করা হবে।

বাপেক্স কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাবনার সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলার সীমান্তবর্তী মোবারকপুর এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাবনার কথা জানা যায় কয়েক দশক আগেই। ১৯৮০-৮১ সালে পেট্রোবাংলা প্রথম জরিপ চালায়। পরে ১৯৮৩-৮৪ সালে একটি জার্মান প্রতিষ্ঠান এবং ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে বাপেক্স আরো কয়েক দফা ভূতাত্ত্বিক জরিপ করে সম্ভাবনার তথ্য নিশ্চিত হয়।

এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. শোয়েব জানান, ২০১৪ সালে নির্দিষ্ট গভীরতায় পৌঁছানোর পর তীব্র চাপের কারণে কাজ বন্ধ রাখতে হয়। সেই চাপ মোকাবিলা করে আরো গভীরে যাওয়ার প্রযুক্তি তখন দেশে ছিল না। তবে প্রথম দফায় সফলতা না এলেও এবার উন্নত আন্তর্জাতিক কারিগরি প্রযুক্তি ব্যবহার করে আশানুরূপ ফল পাওয়া এবং গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হবে।

অন্যদিকে বাপেক্স জানিয়েছে, আগের অনুসন্ধানস্থল ও পরিত্যক্ত কূপ থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে এবার নতুন মোবারকপুর ডিপ-১ কূপে কাজ করা হচ্ছে। এই কূপে সফলতা এলে পুরো অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ জ্বালানি ব্যবহারে আশপাশের এলাকায় পর্যায়ক্রমে আরো একাধিক কূপ খননের সুযোগ তৈরি হবে।

জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম জানান, গত মার্চে আহমেদপুর মৌজার ছয় একর জমি বাপেক্সের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ চলছে। জেলা প্রশাসন এক্ষেত্রে সার্বিক সহযোগিতা করছে।

বাপেক্সের উপসহকারী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম জানান, গত ২৭ জুলাই ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে পাইলিং ও নিরাপত্তা দেয়াল নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে, যা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে। এরপর চীনা প্রতিষ্ঠান রিগ খননের কাজ শুরু করবে।

মোবারকপুর ডিপ-১-এর প্রকল্প পরিচালক ও বাপেক্সের উপমহাব্যবস্থপাক (অপারেশনস) এসএএম মেরাজুল আলম জানিয়েছেন, ২০২৮ সালের জুনের মাঝামাঝি সময়ে কূপে মূল ড্রিলিং শুরু হবে। আর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৮ সালের শেষ দিকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু করা সম্ভব হতে পারে।

বাপেক্সের প্রাক্কলন অনুযায়ী, মোবারকপুর ডিপ-১ কূপটি সফল হলে এখান থেকে টানা ২০ বছর ধরে প্রতিদিন অন্তত ২০ মিলিয়ন (২ কোটি) ঘনফুট গ্যাস পাওয়া সম্ভব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন