হিমালয়ের বিতর্কিত একটি অঞ্চলে পাকিস্তান ও চীন নিজেদের সীমান্ত নির্ধারণে আনুষ্ঠানিকভাবে এগিয়েছে। গত সপ্তাহে দুই দেশ পাকিস্তান-চীন সীমান্ত যৌথ কমিশন গঠনসংক্রান্ত একটি চুক্তিতে সই করেছে। এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত।
বহু দশক ধরে ভারত ওই অঞ্চলে পাকিস্তান-চীন সীমান্তকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। দিল্লির দাবি, এই ভূখণ্ড ভারতের অংশ। তাই পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো সীমান্তকেই ভারত স্বীকৃতি দেয় না।
পাকিস্তান চুক্তিটিকে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। দেশটির মতে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে পাকিস্তান ও চীনের সহযোগিতা আরো গভীর হবে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই। আমরা তথাকথিত যৌথ কমিশন প্রত্যাখ্যান করছি, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।’
বিশেষ সংবেদনশীল এক সময়ে এই ঘোষণা এসেছে। হিমালয় সীমান্তের বড় অংশজুড়ে ভারত ও চীনের সেনাদের পৃথক করা বিতর্কিত রেখা লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) ঘিরে কয়েক বছর ধরে সামরিক উত্তেজনা চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশ সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। এর মধ্যেই বেইজিং ও ইসলামাবাদ এমন একটি সীমান্ত এলাকায় সহযোগিতা বাড়াচ্ছে, যার ওপর ভারতেরও দাবি রয়েছে।
এই যৌথ কমিশনের আওতায় রয়েছে শাকসগাম উপত্যকা। প্রায় ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অঞ্চল ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান চীনের কাছে হস্তান্তর করে। ভারত এটিকে লাদাখে অবস্থিত নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে।
দিল্লির দাবি, শাকসগাম উপত্যকা জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক দেশীয় রাজ্যের অংশ ছিল। পাকিস্তান ওই অঞ্চল অবৈধভাবে দখল করার পর চীনের কাছে হস্তান্তর করে। ভারত সরকার ১৯৬৩ সালের ওই চুক্তিকে কখনো স্বীকৃতি দেয়নি। দিল্লির মতে, চুক্তিটি অবৈধ ও অকার্যকর।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘ভারতের ভূখণ্ড, যা অবৈধ ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাদের দখলে রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার পাকিস্তানের নেই।’
পাকিস্তানের অবস্থান ভিন্ন। দেশটি বলে, জম্মু ও কাশ্মীর এখনো একটি বিতর্কিত অঞ্চল। তাই ১৯৬৩ সালের চীন-সংক্রান্ত সীমান্ত চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবস্থানে ভারত নেই। পাকিস্তান ওই চুক্তিকে বৈধ বলে মনে করে।
দিল্লির শিব নাডার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও গভর্ন্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক জাবিন টি জেকব বলেন, সর্বশেষ ঘটনাটি দুই পক্ষের বহু পুরোনো বৈরিতার আরেকটি প্রকাশ। একেবারে নতুন কিছু নয়।
তিনি বলেন, ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান চুক্তিতেই একটি যৌথ সীমান্ত কমিশনের কথা বলা হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো, কেন এই ব্যবস্থা এই সময়ে কার্যকর করা হলো।
জেকবের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে চীনের বৃহত্তর সীমান্ত নির্ধারণের প্রচেষ্টা। পাকিস্তানের অন্যান্য সীমান্তে সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার মধ্যেও এই সীমান্তে যোগাযোগ ও চলাচলকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার আগ্রহ থাকতে পারে।
জেকব বলেন, এই উন্নয়নে ভারতের ‘উদ্বিগ্ন’ হওয়া উচিত।
তার মতে, আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পদক্ষেপটি ১৯৬৩ সালের চুক্তির একটি ধারাকে উপেক্ষা করছে বলে মনে হয়।
চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কাশ্মীর বিরোধের নিষ্পত্তির পর যে দেশ শেষ পর্যন্ত ওই ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ পাবে, তার সঙ্গে চুক্তিটি পুনরায় আলোচনার কথা ছিল বলে জানান তিনি।
জেকবের মতে, ভারতের জন্য বিষয়টি আন্তর্জাতিক তথ্য পরিবেশনের দিক থেকেও জটিল।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও তথ্য পরিবেশনে চীনের তুলনামূলক প্রাধান্য রয়েছে। সিজিটিএন, সিআরআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চীনের উপস্থিতি তাদের বৈশ্বিক পরিসরে নিজেদের বয়ান ও মানচিত্র তুলে ধরার সুযোগ দেয়। অন্যদিকে ভারত প্রায়ই এমন প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, যা বিশ্বের অন্যান্য রাজধানী উপেক্ষা করতে পারে।
তবে সীমান্তে বাস্তবে যে কার্যক্রম চলছে, তার তুলনায় এই উদ্বেগের মাত্রা কিছুটা ভিন্ন। পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে এই অঞ্চলে ইতোমধ্যেই বিস্তৃত অবকাঠামো ও যোগাযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) ও কারাকোরাম মহাসড়ক।
যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বর্তমানে আনোয়ার গারগাশ ডিপ্লোম্যাটিক অ্যাকাডেমি ও হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো হুসেইন হাক্কানি বলেন, নতুন কমিশনটি একই সঙ্গে বাস্তবধর্মী ও রাজনৈতিক।
হাক্কানি বলেন, সীমান্ত ও সীমানা সহযোগিতা জোরদার করা, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো এবং সিপিইসি-সংশ্লিষ্ট কৌশলগত অবকাঠামো রক্ষার জন্য এটি একটি প্রক্রিয়া।
তার মতে, এই পদক্ষেপ ভারতের প্রতি একটি বার্তাও দেয়। তা হলো, বেইজিং এখনো কাশ্মীর প্রশ্নকে পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে দেখে।
হাক্কানি বলেন, চীন কখনো কাশ্মীর বিষয়ে ভারতের অবস্থান মেনে নেয়নি। গিলগিট-বালতিস্তানকেও তারা পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, ভারতের নয়। পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের এই অঞ্চলটি চীনের সঙ্গে সীমান্ত ভাগাভাগি করে। ভারত এটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে।
হাক্কানির মতে, ভারত-শাসিত কাশ্মীরে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের পর পাকিস্তানের অবস্থানও বদলেছে।
তিনি বলেন, পাকিস্তান এখনো মনে করে জম্মু ও কাশ্মীরের চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণ বাকি। কিন্তু ভারত যখন তাদের নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর অংশে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মতো অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন করেছে, তখন ১৯৬৩ সাল থেকে চীনের সঙ্গে যে বিষয়টি অঘোষিত অবস্থায় রয়েছে, সেটিকে এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পাকিস্তান কোনো সমস্যা দেখছে না।
বেইজিংয়ের জন্যও এই ব্যবস্থা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে ভারতের প্রতি নিজেদের অবস্থান জানানোর বৃহত্তর কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন হাক্কানি।
তার মতে, কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানকে আশ্বস্ত করা চীনের জন্য কৌশলগত ও ভূকৌশলগত—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। এতে পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। একই সঙ্গে ভারতকে চীন ও পাকিস্তানের দ্বিমুখী হুমকির ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দেওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘোষণার সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ।
হাক্কানি বলেন, চীন সাধারণত তাদের সিদ্ধান্ত কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর আগেই পরিকল্পনা করে। তাই যৌথ সীমান্ত কমিশন কার্যকর করার সিদ্ধান্তও অনেক আগেই নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
তার মতে, রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক ব্রিকস সম্মেলন সফরের পর এই তথ্য প্রকাশের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হতে পারে পাকিস্তানকে কৌশলগত অংশীদারত্বের বিষয়ে আশ্বস্ত করা এবং ভারতকে মনে করিয়ে দেওয়া যে বহুপক্ষীয় সম্পৃক্ততা দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কে চীনের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আনেনি।
তবে জাবিন টি জেকব সতর্ক করে বলেন, এই বিষয়টির প্রতিটি দিককে ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তার মতে, এই মুহূর্তে এলএসি-তে এর কোনো তাৎক্ষণিক বা দৃশ্যমান প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই।
এ থেকে বোঝা যায়, গত সপ্তাহের ঘোষণার গুরুত্ব হয়তো বিতর্কিত হিমালয় সীমান্তে তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তনের মধ্যে নয়। বরং ভারত যে ব্যবস্থাগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে, সেগুলোকে ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার মধ্যেই এর গুরুত্ব থাকতে পারে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারতের অবস্থান ‘স্পষ্ট এবং ধারাবাহিক’।
দিল্লির মতে, পাকিস্তানের অবৈধভাবে দখল করে রাখা ভারতীয় ভূখণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা অগ্রহণযোগ্য। এতে ভারতের সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না।
হাক্কানি মনে করেন, বিরোধটি শুধু সীমান্তের আইনি প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়।
তার মতে, সীমান্ত ও সীমানা নিয়ে ভারত ও চীনের মূল মতভেদ ভূকৌশলগত, শুধু মানচিত্রগত নয়। তাই সীমান্ত নিয়ে আলোচনা এবং বাস্তবে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কী অর্জন করা সম্ভব, তারও কিছু সীমা রয়েছে।
হাক্কানি আরো বলেন, পাকিস্তান এখনো ভারতের বিরুদ্ধে চীনের ‘দ্বিতীয় স্তরের প্রতিরোধক’। ইসলামাবাদের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পৃক্ততা দিল্লির প্রতি সেই বার্তাই প্রকাশ করতে থাকবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


