সিরিজে সমতা, আনন্দের গল্প নিয়েই ফিরছে বাংলাদেশ

স্টার্ক ঝড়ে দুদিনেই টেস্ট শেষ

স্টার্ক ঝড়ে দুদিনেই টেস্ট শেষ

টেস্ট ক্রিকেট কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তারই দেখা মিলল ম্যাকাইয়ে। ৬৪ অলআউটের পর ৯৫-তে গুঁড়িয়ে গেল বাংলাদেশের ইনিংস। প্রথম দফায় ৩৪ ওভার। দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৮ ওভারে শেষ বাংলাদেশের ব্যাটিং। পাঁচ দিনের ম্যাচ গুটিয়ে গেল মাত্র দুদিনে। ম্যাচটা হারল বাংলাদেশ ইনিংস ও ৫১ রানের বড় ব্যবধানে। টেস্ট ম্যাচে এই প্রথম উভয় ইনিংসে বাংলাদেশ একশর নিচে গুটিয়ে গেল।

মাত্র দুদিনেই শেষ হওয়া এই ম্যাচে ধ্বংসযজ্ঞের নায়ক মিচেল স্টার্ক, দুই ইনিংস মিলিয়ে নিলেন ১০ উইকেট। ডারউইনে ঐতিহাসিক জয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই মাটিতে নেমে এলো বাংলাদেশ। তবে সান্ত্বনা একটাই, সিরিজ শেষ হলো ১-১ সমতায়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবার টেস্ট জেতার কীর্তির পাশে এই ইনিংস হারও লেখা রইল বাংলাদেশের এই সফরের গল্পে। তবে অস্ট্রেলিয়ার মাটি থেকে টেস্ট সিরিজে সমতা নিয়ে ফেরার আজীবন আনন্দের গল্পগাথাও তৈরি করেছে বাংলাদেশ এই সফরে। সেটাও কম গর্বের নয়।

বিজ্ঞাপন

ম্যাকাইয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন মুগ্ধ করার মতোই। তবে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ এরেনার স্টেডিয়ামে যে ব্যাটিং করল বাংলাদেশ সেটা খুব দ্রুতই ভুলে যেতে চাইবে। ৬৪ ও ৯৫ অলআউটের দুঃস্মৃতি কে মনে রাখতে চায়?

ম্যাকাই টেস্টে সকালের সেশনে অস্ট্রেলিয়া ক্যামেরুন গ্রিন ও নাথান লায়নের ব্যাটে যোগ করে আরো ৪৫ রান, থামে ২১০ রানে। ১৪৬ রানে পিছিয়ে পড়ে ব্যাটিংয়ে নেমেই প্রথম ইনিংসের বিপদই আরেকবার দেখল বাংলাদেশ। লাঞ্চের পর ব্যাটিংয়ে নেমে প্রথম আট ওভারেই দুই ওপেনারকে হারিয়ে ২৪ রানে ৩ উইকেট খুইয়ে বসে বাংলাদেশ। এরপর একে একে ভেঙে পড়ে পুরো লাইনআপ। চা বিরতির আগেই ৮ উইকেট হারিয়ে বসে তারা, ইনিংস হার তখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। চা বিরতির পর মাত্র তিন বলের মধ্যে শেষ দুই উইকেট তুলে নেন লায়ন, বাংলাদেশ গুটিয়ে যায় ৯৫ রানে। পাঁচ সেশনেই শেষ টেস্ট ম্যাচ!

ম্যাকাইয়ের উইকেট ছিল দ্রুতগতির, বাড়তি বাউন্সে ভরপুর, অনেকটা ব্রিসবেনের গ্যাবার মতো। এমন উইকেটে টিকে থাকতে দরকার হয় শরীরের কাছাকাছি খেলা, বলের লাইন বিচার করে দেরিতে খেলা এবং বল ছাড়ার সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা এই তিন জায়গাতেই ব্যর্থ হয়েছেন। সাদমান ইসলাম আউট হন পয়েন্টে ক্যাচ দিয়ে, বলের লাইনে না গিয়ে হাত দিয়ে খেলার প্রবণতাই যার কারণ। মুমিনুল হক বোল্ড হন পরের বলেই, অফ স্টাম্পের বাইরের একটি বল ভেতরে ঢোকার আশঙ্কা মাথায় না রেখে ব্যাট সরিয়ে নেওয়ার খেসারত দিয়ে। তানজিদ হাসান শর্ট বলে হুক করতে গিয়ে ফাইন লেগে ক্যাচ তুলে দেন, ডারউইনে সেঞ্চুরি করা এই ওপেনারের শট নির্বাচনেই ছিল তাড়াহুড়ো। অধিনায়ক শান্ত শুরুতে দারুণ কয়েকটি শট খেলে চাপ সরানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু লায়নকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে লং অফে ধরা পড়েন, আক্রমণাত্মক মানসিকতা ঠিক ছিল, তবে শট নির্বাচনে ভুল হয়েছে। হাসান মাহমুদ শর্ট লেগে গ্লাভড হন বাউন্সারে, মেহেদী হাসান মিরাজ খোঁচা দেন কামিন্সের একটি সাদামাটা বলে। প্রতিটি আউটেই মিল একটাই, বাড়তি গতি আর বাউন্সের সামনে ব্যাটসম্যানদের শরীরী অবস্থান ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়টা ছিল ভুল। লিটন দাস স্টার্কের বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে সিরিজে টানা তৃতীয়বার শূন্য রানে ফেরেন, পুরো সফরে তিন ইনিংসে ২৭ বল খেলে একটি রানও করতে পারেননি এই কিপার-ব্যাটসম্যান। অস্ট্রেলিয়া সিরিজের কথা মনে হলেই লিটনের নামের পাশে ভেসে উঠবে তিন শূন্য!

এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ব্যতিক্রম শুধু মুশফিকুর রহিম। ৮০ বল খেলে অপরাজিত থাকেন ২৯ রানে। শট খেলার আগে বল দেরিতে বিচার করা, শরীরের কাছে রেখে খেলা আর ঝুঁকি এড়ানোর যে কৌশল দরকার ছিল ম্যাকাইয়ে, সেটাই দেখিয়েছেন ৩৯ বছর বয়সি এই ব্যাটসম্যান। দুই দশক আগে কিশোর বয়সে অভিষিক্ত হওয়া মুশফিক প্রমাণ করেছেন, ধৈর্য আর টেকনিক ঠিক থাকলে এই উইকেটেও টিকে থাকা সম্ভব। কিন্তু তার সঙ্গীরা কেউই তাকে যথেষ্ট সঙ্গ দিতে পারেননি।

ম্যাচসেরা ও সিরিজসেরা, দুটি পুরস্কারই উঠেছে মিচেল স্টার্কের হাতে। প্রথম ইনিংসে ১২ রানে ৬ উইকেটের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৯ রানে নেন আরো ৪ উইকেট, ম্যাচে মোট ১০ উইকেট। ক্যারিয়ারে চতুর্থবারের মতো এক ম্যাচে ১০ উইকেট নিলেন ৩৬ বছর বয়সি এই বাঁহাতি পেসার, ১০৭ টেস্টের ক্যারিয়ারে। টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারিদের তালিকায় এখন দশম স্থানে স্টার্ক, ৪৪৫ উইকেট নিয়ে। ম্যাচ শেষে স্টার্ক বলেন, ডারউইনে যা ভুল হয়েছিল তা শুধরে নেওয়াই ছিল লক্ষ্য, বল হাতে সেটাই করে দেখিয়েছেন তারা এই সপ্তাহে। অধিনায়ক প্যাট কামিন্স বলেন, গত সপ্তাহের হারের পর ফিরে আসার তাগিদ থেকেই এমন পারফরম্যান্স এসেছে তাদের কাছ থেকে।

এই টেস্টের দ্বিতীয় দিনের সকালটা শুরু হয় বাংলাদেশের বোলিং আনন্দে। সেই পর্বে আগের দিনের মতো তারকা হয়ে রইলেন শরিফুল ইসলাম। এই সেশনে ২১০ রানে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া। ক্যামেরুন গ্রিন খেলেন সর্বোচ্চ ৬৭ রানের ইনিংস। নাথান লায়ন অপরাজিত থাকেন ৩২ রানে। শরিফুল ইসলাম ম্যাচে ৪৮ রানে ৭ উইকেট নিয়ে গড়েন ক্যারিয়ার সেরা বোলিং ফিগার, যা বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশি বোলারের সেরা পারফরম্যান্স। এক ইনিংসে সাত উইকেট নেওয়া প্রথম বাংলাদেশি পেসারও হলেন তিনি। তবে তার এই কীর্তি ম্লান হয়ে যায় ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায়।

এই হারে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এক টেস্টের দুই ইনিংসেই একশর নিচে অলআউট হওয়ার তেতো অভিজ্ঞতা পেল। তবে সবকিছু হারিয়ে যায়নি। ডারউইনে হাসান মাহমুদের ৯ উইকেট, তানজিদের সেঞ্চুরি আর মিরাজের পাঁচ উইকেটের সৌজন্যে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের ইতিহাস গড়েছিল বাংলাদেশ। সেই স্মৃতি এখনো তরতাজা। ম্যাকাইয়ের এই হারের পরও তাই সিরিজ শেষ হলো ১-১ সমতায়, সব মিলিয়ে যা বাংলাদেশের জন্য এই সফরের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। অস্ট্রেলিয়ার পরের অ্যাসাইনমেন্ট অক্টোবরে, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়ন দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে তিন ম্যাচের সিরিজ।

ম্যাকাইয়ের এই হার বাংলাদেশকে মনে করিয়ে দিল, গতি আর বাউন্সের সামনে টেকনিক্যাল দৃঢ়তা ছাড়া টেস্ট ক্রিকেটে টেকা কঠিন। ডারউইনের সাফল্য বলছে সামর্থ্য আছে, ম্যাকাইয়ের ব্যর্থতা বলছে তার ধারাবাহিকতা এখনো অধরা। আগামী দিনগুলোয় এই ফারাক ঘোচানোই হবে বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

বাংলাদেশ : ৬৪ (৩৪ ওভার) ও ৯৫ (৩৮.৩ ওভার; শান্ত ৩১, মুশফিক ২৯*; স্টার্ক ১০/৫১ ম্যাচে, কামিন্স ৩/১০, লায়ন ৩/২৫)

অস্ট্রেলিয়া : ২১০ (৫২.৩ ওভার; গ্রিন ৬৭, লায়ন ৩২*; শরিফুল ৭/৪৮)

ফল : অস্ট্রেলিয়া ইনিংস ও ৫১ রানে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ ও সিরিজ : মিচেল স্টার্ক।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন