নেপাল ও তিব্বতে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহ ধসকে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বড় ধরনের দুর্যোগের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বরফ, তুষার ও পারমাফ্রস্ট দ্রুত গলে যাওয়ায় পাহাড়ি ভূখণ্ডের স্থিতিশীলতা কমছে। এর পরিণতিতে ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা, হিমবাহ হ্রদ ভেঙে বন্যা, এমনকি কিছু অঞ্চলে ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
এক বিশ্লেষণে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ভূ-ভৌত ও জলবায়ু ঝুঁকিবিষয়ক অধ্যাপক ইমেরিটাস বিল ম্যাকগুয়ার বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব শুধু আবহাওয়া ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করছে। গত সপ্তাহে নেপাল ও তিব্বতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিপর্যয় এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
হিমবাহ সরে গেলে বরফের নিচে থাকা অস্থিতিশীল ভূখণ্ড উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন জমাট থাকা মাটি ও শিলা গলে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে যায়। ফলে সামান্য বৃষ্টি, ভূমিকম্প কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক পরিবর্তনেও বড় ধরনের ভূমিধস ঘটতে পারে। আবার হিমবাহ গলে পাহাড়ি এলাকায় তৈরি হওয়া হ্রদগুলোর পানি কোনো পর্যায়ে বাঁধ ভেঙে নিচের দিকে নেমে এলে ভয়াবহ ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ বা হিমবাহ হ্রদজনিত আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হতে পারে।
হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের ঝুঁকি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। সেখানে হাজার হাজার হিমবাহ হ্রদ রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২০০টি নিচের দিকে বসবাসকারী মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক নেপাল-তিব্বত বিপর্যয় দেখিয়েছে, একটি হিমবাহ ধস কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যে নদীর গতিপথ বদলে দিয়ে ব্যাপক এলাকায় প্রাণহানি ও অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারে।
তবে ঝুঁকি শুধু হিমালয়েই সীমাবদ্ধ নয়। আলাস্কা, আন্দিজ, গ্রিনল্যান্ড এবং ইউরোপীয় আল্পসেও বরফ গলার কারণে ভূ-তাত্ত্বিক পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে। আলাস্কায় বিপুল পরিমাণ বরফ গলে যাওয়ায় ভূত্বকের ওপর চাপ কমছে, যা কিছু সক্রিয় ভূ-চ্যুতিতে ভূমিকম্পের প্রবণতা বাড়াতে পারে। একই ধরনের পরিবর্তন দ্রুত বরফ হারানো অন্যান্য অঞ্চলেও দেখা যেতে পারে।
গ্রিনল্যান্ডকেও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করেছেন ম্যাকগুয়ার। সেখানে প্রায় দুই থেকে তিন কিলোমিটার পুরু বরফের স্তরের নিচে থাকা ভূ-চ্যুতিগুলো হাজার হাজার বছর ধরে বিপুল চাপের মধ্যে রয়েছে। বরফ গলে সেই চাপ কমতে থাকলে ভবিষ্যতে ভূমিকম্পের তৎপরতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। আইসল্যান্ডে দ্রুত বরফ গলার কারণে আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ বাড়ার আশঙ্কার কথাও বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়েছে।
নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগে ইতোমধ্যে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং প্রায় চার হাজার মানুষের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বসতি, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো। জাতিসংঘও সতর্ক করেছে, হিমালয় অঞ্চলে আগামী বছরগুলোতে হিমবাহজনিত বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা চরম আবহাওয়ার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। বরফ, পাহাড়, ভূত্বক, নদী ও সমুদ্র—পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাকৃতিক ব্যবস্থার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যত বাড়বে, এসব ব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতা থেকে বড় ধরনের দুর্যোগের সম্ভাবনাও তত বাড়তে পারে। তাই হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার করা জরুরি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

