তারেক রহমান সরকারের ছয় মাস বা ১৮০ দিনে নানা ইতিবাচক এবং আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের সূচনা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, প্রবাসীকল্যাণ, পরিবেশ, ক্রীড়া ও নাগরিক সেবায় নেওয়া হয়েছে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সময় ক্ষেপণ না করে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছেন এবং নিজেই তা তদারকি করছেন। তার সরকারের খাল খনন, বৃক্ষরোপণ এবং বন্ধ কলকারখানা চালুর উদ্যোগ ইতিবাচক। একসঙ্গে লক্ষাধিক শিক্ষকের অবসর সুবিধা ও কল্যাণ তহবিলের বকেয়া টাকা পরিশোধের ব্যবস্থা করে এসব পরিবারকে স্বস্তি দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের আরো কিছু ভালো কাজ হচ্ছে। তবে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার আলোকে রাষ্ট্র সংস্কার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানির সরবরাহসহ মানুষের দৈনন্দিন জীবনঘনিষ্ঠ সমস্যা-সংকটের দ্রুত সমাধান ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের মতো বড় রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণে বাস্তব অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়।
ছয় মাসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। গ্রাহকরা যেমন নাকাল হয়েছেন, তেমনি ভুগতে হয়েছে সরকারকেও। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনে লুটের রাজ্যে পরিণত করা এ খাতে শৃঙ্খলা ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে আশানুরূপ সাফল্য দেখাতে পারেনি সরকার। পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা সরকার বলছে, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জঞ্জাল সরাতেই তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি খুবই সীমিত। একদিকে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ ও দলের ঘোষিত ৩১ দফার ভিত্তিতে রাষ্ট্রসংস্কার ও পুনর্গঠনের কাজ, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ ঠিক রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে রাখা এবং প্রশাসনে গতি ফেরানোর চাপ কতটা দক্ষতার সঙ্গে সামলাতে পেরেছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের মাথায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। দীর্ঘ প্রায় দু’দশক পর সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও আকাশছোঁয়া। হাসিনার সরকারের রেখে যাওয়া দলবাজ প্রশাসন এবং ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা সামাল দেওয়ার দায়িত্ব বর্তায় তারেক রহমান সরকারের ওপর। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার এ কাজ অনেকটাই এগিয়ে দিয়ে গেছে।
প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী
সরকার গঠনের পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি-নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে বিএনপি সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি অথবা জোরজবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।
বিএনপি সরকার সব ক্ষেত্রেই অনাচার-অনিয়মের সব সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘সরকার গঠনের সুযোগ দিতে যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন কিংবা দেননি অথবা কাউকেই ভোট দেননি, এই সরকারের প্রতি আপনাদের সবার অধিকার সমান। বিএনপি সরকার বিশ্বাস করে, দল-মত, ধর্ম-দর্শন যার যার, রাষ্ট্র সবার। এই দেশে, এই রাষ্ট্রে একজন বাংলাদেশি হিসেবে, আপনার আমার আমাদের প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের অধিকার সমান।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চলবে বিধিবদ্ধ নীতি-নিয়মে।
মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের তিন অগ্রাধিকার
১৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম অফিস করার দিনে মন্ত্রিসভারও প্রথম বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে বৈঠকের সিদ্ধান্ত ও আলোচনার বিষয়গুলো তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রথামাফিক সরকারের প্রথমদিনে মন্ত্রিসভার বৈঠক করতে হয়। বৈঠকে মন্ত্রিসভার সব সদস্য বসেছিলেন, উপদেষ্টারাও ছিলেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের কিছু অনুশাসন দিয়েছেন। সরকার ১৮০ দিনের একটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করছে।
সালাহউদ্দিন জানান, প্রাথমিকভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ ঠিক রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো উন্নত করা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে (গ্যাস-বিদ্যুৎ) যেন কোনো সমস্যা না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো সরকারের অগ্রাধিকার।
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনও অনুরূপভাবে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এ মুহূর্তে অগ্রাধিকার হচ্ছে, পবিত্র রমজান উপলক্ষে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে মানুষের সহনীয় রাখা এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা। মূলত এই তিন বিষয় অগ্রাধিকারে এসেছে।
সরকারের প্রথম ছয় মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর অর্জন ও সীমাবদ্ধতার বিষয়ে সব মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিবেদন গেছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। তিনি তা পর্যালোচনা করছেন। প্রত্যেক মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর পারফরম্যান্সের রিপোর্ট দেখছেন সরকারপ্রধান। ছয় মাসের পারফরম্যান্স রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আগামী দিনের যাত্রা আরো বেগবান করতে কিছু পরিবর্তন ও রদবদলের আলোচনাও রয়েছে।
ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতারাও অনুধাবন করছেন, প্রধানমন্ত্রীর চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও কোথাও যেন টিমওয়ার্কে ছেদ পড়ছে এবং সে কারণে অনেক ক্ষেত্রে বিচ্যুতি দেখা যাচ্ছে। তাতে মানুষের প্রত্যাশা ধাক্কা খাচ্ছে। দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল সরকারের ছয় মাস মূল্যায়ন করতে গিয়ে আমার দেশকে বলেন, সরকারপ্রধানের সাদামাটা জীবনাচার ও দিন-রাত কাজ করার প্রচেষ্টা মানুষকে আশাবাদী করছে। পাশাপাশি প্রত্যাশার জায়গাটা ধাক্কা খাচ্ছে যখন দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানা যাচ্ছে না, মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলার উদ্বেগজনক অবনতি ঘটছে, বিদ্যুৎ-গ্যাস নিয়ে মানুষ কষ্টের মুখে পড়ছে। এ চিত্র দেখে মনে হচ্ছে, কোথাও টিমওয়ার্কে ঘাটতি ও শিথিলতা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তনের বার্তা
সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমান জাতির সামনে আশাবাদ ও ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা দিতে পেরেছেন। সরকারের মুখপাত্র মাহদী আমিনের ভাষায়, প্রধানমন্ত্রী ছয় মাসে জনগণের আস্থা, ভালোবাসা ও সমর্থন অর্জন, নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বার্থ রক্ষা এবং গণমানুষের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্বের প্রমাণ দিতে পেরেছেন। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আচরণকে ভিন্নধারার নেতৃত্বচর্চা হিসেবে বিবেচনা করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। ভদ্রতা, সংযম, সৌজন্য, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
শপথ নিয়েই দলের মন্ত্রী-এমপিদের কাছ থেকে সরকারি প্লট ও শুল্কমুক্ত গাড়ি না নেওয়ার অঙ্গীকার আদায়, প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বাসভবন ব্যবহার করা, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার এবং নিজ খরচে জ্বালানি ব্যয়ের উদ্যোগ ব্যতিক্রমী অনুশীলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ব্যক্তিগত সংযমের বার্তাও বহন করেছে। সরকারি ব্যয় সংকোচনে নানা পদক্ষেপের পাশাপাশি, নিজের ভিভিআইপি প্রটোকল সীমিত করা, চলাচলের সময় সিগন্যালে অপেক্ষা করা, কাছাকাছি কর্মসূচি থাকলে হেঁটে যাওয়া, সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবার অফিস কার্যক্রম পরিচালনা, তরুণ উদ্ভাবকদের উৎসাহিত করার মতো বিষয়গুলো শুধু ব্যক্তিগত আচরণ বা প্রতীকী পদক্ষেপ নয়; বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সরলতা, মানবিকতা, জবাবদিহি, জনসম্পৃক্ততা এবং অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্বের একটি নতুন ধারা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত ও প্রশংসিত হচ্ছে সাধারণের কাছে।
জ্বালানিতেই ম্লান অর্জন
সরকারের গত ছয়মাসে যতটুকু অর্জন, সেটা ম্লান করেছে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাত। এই খাতে সরবরাহ সংকট ছিল প্রকট। সর্বশেষ গ্যাস সংকটের কারণে সপ্তাহজুড়ে দেশের বেশিরভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠান একপ্রকার অচল হয়ে আছে। স্থবিরতা দেখা দিয়েছে অর্থনীতিতে। বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলছে না। সিএনজি ফিলিং স্টেশনে যানবাহন চালকদের ভোগান্তি চরমে উঠেছে। মূলত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটি এবং এলএনজি কার্গো আনলোড করতে না পারায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুতের মারাত্মক সংকট দেখা দেয়। বিদ্যুতের লোডশেডিং এবং গ্যাস সংকটে শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভও হয়েছে। বিদ্যুৎ স্থাপনার নিরাপত্তায় ফোর্স চেয়ে চিঠি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
পরিস্থিতি সামলাতে সরকার নতুন করে আরো দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কৌশলপত্র ঘোষণা করেছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে গত শনিবার দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে সংকটজনিত ভোগান্তির জন্য। তিনি বলেছেন, সংসদে ১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনা ঘোষণা করবেন। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এতে সাড়া দেওয়ার শেষ সময় নভেম্বরে। সেখানে বিদেশি কোম্পানির সাড়া পাওয়া গেলে গ্যাসের বড় মজুত পাওয়া যেতে পারে। দরপত্রের বাইরে জিটুজি ফর্মুলায় মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে পেট্রোবাংলার যৌথ তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগও আছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ১০ দিনের মাথায় ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। এর প্রভাবে হরমুজ প্রণালির সংকটে আটকে যায় জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ। আন্তর্জাতিক বাজারে লাফিয়ে বাড়তে থাকে তেলের দাম। বাংলাদেশে সরবরাহকারীদের অনেকে তেল দিতে অপারগতা জানায়। দেশের তেলের মজুত ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে কমে আসে। একপর্যায়ে সরকার জ্বালানি তেলের রেশনিং শুরু করে। এই রেশনিং ও আতঙ্কের কারণে প্রায় দুই মাস জনগণকে জ্বালানি তেল সংগ্রহে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। চারদিকে হাহাকার দেখা যায়। দু’দফায় দাম বাড়িয়ে রেশনিং তুলে নেওয়ার পর তেল পাম্পে দীর্ঘ সারি কমে আসে।
অবশ্য জ্বালানি, আইন-শৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সংস্কারে ব্যর্থতার অভিযোগ মানছেন না সরকারের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি গতকাল আমার দেশকে বলেন, কিছু ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্যে ঘাটতি থাকতে পারে। দায়বদ্ধতা সরকার অস্বীকার করে না। জনভোগান্তিতে সরকার দুঃখিত। তবে জ্বালানিতে বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ ভালোভাবে সংকট মোকাবিলা করেছে এবং করছে। ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে কাজ করেও অপরাধ হলেই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজেটে অনেক পণ্যের শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। সংস্কার এগিয়ে নিতে অতি স্বল্প সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অধিকাংশ অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এ সময়ে স্বচ্ছতা, সুশাসন, জনকল্যাণ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা, বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় সাশ্রয়, বন্যাদুর্গতদের পুনর্বাসন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত পুনর্গঠনে কাজ করেছে।
সংস্কারে গতি মন্থর
বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংস্কার ইস্যুতে গণভোট একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। ক্ষমতায় গিয়ে রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য সংস্কারসহ জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের কথা বলেছিল বিএনপি। ক্ষমতার পঞ্চম মাসে এসে সংবিধান সংশোধনে কমিটিও গঠন করে সরকারি দল। যদিও সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কারের দাবিতে থাকা বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ওই কমিটিতে অংশ নেয়নি। এ পরিস্থিতিতে সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক উঠছে। ছয় মাসে সংস্কারের ক্ষেত্রে ন্যূনতম অগ্রগতি না হওয়ায় সরকার জনআকাঙ্ক্ষা কতটা ধারণ করতে পেরেছে, তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাচ্ছেন।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে সাংবিধানিক সংস্কারের অঙ্গীকার আছে ৩৫ দফা। আর সে অঙ্গীকারের প্রথম দফায় বলা হয়েছে, ‘সংবিধান সংস্কার বিষয়ে বিগত ১৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে জুলাই জাতীয় সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সে মতে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’ প্রতিশ্রুত সে ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’ ছয় মাসে পেয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।
সরকারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম ছয় মাসে প্রধানত গুরুত্ব পেয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণ অঙ্গীকার বাস্তবায়ন। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’। পরীক্ষামূলকভাবে এর আওতায় এসেছে ৭১ হাজারের বেশি পরিবার। পরিবারের নারীপ্রধানের অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষামূলক পর্ব শেষে কিশোরগঞ্জ থেকে গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
কৃষকদের জন্য চালু করা হয়েছে ‘কৃষক কার্ড’। সরকারের দাবি, প্রথম ছয় মাসে ২০ হাজারের বেশি কৃষক পরিবার এর আওতায় এসেছে। কৃষি উপকরণ কেনার জন্য কার্ডধারীরা আড়াই হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। এছাড়া নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সাড়ে ১৪ লাখ কৃষক পরিবার সরাসরি উপকৃত হবে বলে জানিয়েছে সরকার।
এছাড়া পরিবেশ ও কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি বড় প্রতিশ্রুতি ছিল খাল পুনঃখনন। পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য নিয়েছে বিএনপি। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসেই ৬২টি জেলায় প্রায় এক হাজার কিলোমিটার খাল খনন সম্পন্ন হয়েছে। যদিও খাল খনন ও পুনঃখনন নিয়ে কিছু অনিয়ম ও বিতর্ক সামনে এসেছে।
পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের প্রতিশ্রুতিও ছিল নির্বাচনি ইশতেহারে। প্রথম ১৮০ দিনে আড়াই কোটির বেশি গাছ লাগানোর দাবি করেছে বিএনপি সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইতোমধ্যেই বাস্তবায়নের পথে। বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে অনিয়ম, তথ্যবিভ্রাট এবং একশ্রেণির কর্মকর্তা ও দলীয় লোকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
পাশাপাশি এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা, ২০০ সরকারি ভবনকে চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপান্তর, জাতীয় পল্লি উন্নয়ন দিবস, দুই হাজার মিনি কোল্ডস্টোরেজ, প্রিপেইড মিটারের অতিরিক্ত চার্জ প্রত্যাহার, উপজেলা হাসপাতাল উন্নয়ন, ইউনিয়নভিত্তিক স্বাস্থ্য ইউনিট, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপের তালিকায় রাখা হয়েছে।
এসব জনতুষ্টিমূলক কর্মসূচিতে সংস্কারের গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার চাপা পড়ে গেলে তা দীর্ঘমেয়াদে দল ও সরকারকে চাপ ও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল।
আইনশৃঙ্খলায় বিব্রতকর পরিস্থিতি
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারকে দফায় দফায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখল এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এখনো বড় দাগে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে থাকা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের বলয় ভাঙাও যাচ্ছে না। অনেকগুলো চাঞ্চল্যকর খুন ও ধর্ষণের ঘটনা সরকারকে কয়েক দফায় বেশ চাপে ফেলেছে। সামাল দিতে গিয়ে দ্রুত বিচারের আশ্বাস ও দুয়েকটি ক্ষেত্রে তা অস্বাভাবিক দ্রুততায় করতে হয়েছে। সরকারদলীয় অনেক নেতাকর্মী নানা অপরাধে জড়িয়ে সরকারকে সমালোচনার তীরে বিদ্ধ করছেন। নিজেদের মধ্যে মারামারি, খুনোখুনি চলছে। ছয় মাসে নিজেদের সংঘাতে প্রাণ গেছে ৩৮ জনের। দখল, চাঁদাবাজি, মাস্তানির মতো ঘটনা হাসিনার আমলের তুলনায় কম হলেও পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। শিক্ষাঙ্গনেও কয়েক দফায় মারামারি ও অস্থিরতা দেখা গেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করতে কিছু অতিউৎসাহী নেতাকর্মীর পেশিশক্তির প্রদর্শন সরকারের গণতান্ত্রিক চরিত্রকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে বলে মনে করেন অনেকে।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে দেশের থানাগুলোতে ৯৯ হাজার ৯৯২ মামলা রেকর্ড করা হয়। দাঙ্গার ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৩টি। হত্যার ঘটনায় ১,৭৯১টি এবং দ্রুতবিচার আইনে মামলা হয়েছে ৪০৮টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১১ হাজার ১৬৫টি মামলা হয়। এছাড়া ২৬৫টি ডাকাতি, ৯০৪ ছিনতাই, ৫১২ অপহরণ, ৪৮০৮টি চুরি, ১৫৯১ সিঁধেল চুরি এবং অন্যান্য ঘটনায় ৪১ হাজার ৯২৫টি মামলা হয়েছে।
ছয় মাসে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক বিরোধ এবং গ্যাং কালচারের জেরে বেশকিছু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে সামনে এসেছে। এর মধ্যে মে মাসে ঢাকার পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তার (৮) ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দেয়। পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ী লালচাঁদ ওরফে সোহাগকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে ও ইট দিয়ে আঘাত করে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ঢাকা মহানগরীসহ বড় শহরগুলোতে ছিনতাই ও চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ প্রসঙ্গে মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, সরকার কাজ করছে। শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ১৯ দিনে এবং মেহেরপুরের একটি শিশুধর্ষণ মামলার রায় ২৯ কার্যদিবসে সম্পন্ন হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় এক মাসে ১০টি রায় ঘোষণা করা হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার পলাতক আসামি মোজাফফর হোসেনকে ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তনু হত্যা মামলার আসামি, শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামি এবং সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রশাসন নিয়েও অসন্তুষ্টি
প্রায় দুদশক পর ক্ষমতায় ফিরে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় প্রশাসনকে কার্যকর ও গণমুখী করা। দেড় যুগে বেপরোয়া দলীয়করণ, পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে বিতর্ক, কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে শ্লথগতিÑসব মিলিয়ে প্রশাসনকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানোর কঠিন কাজটি সরকারের অগ্রাধিকারে ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনে পরিবর্তন করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের অনুগত কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনার মতো অভিযোগ উঠেছে। সরকারের দাবি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত গতি এখনো ফেরেনি, বরং মতলববাজ ও অযোগ্য দলবাজরা নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে। আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে পদায়নের অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ তৈরি এবং সরকারি সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জনপ্রত্যাশা এখনো সুদূরপরাহত। বিএনপি ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, প্রশাসনকে জবাবদিহির মধ্যে এনে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানো না গেলে অন্য কোনো সংস্কারই স্থায়ী ফল দেবে না। তাই প্রশাসনিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে কেবলই দলীয় আনুগত্যকে আবারও প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছেÑএমন অভিযোগ করে অনেক বলছেন, নতুন বোতলে পুরোনো মদ ঢালার মতো অবস্থা দেখা যাচ্ছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।
অভিযোগ উঠেছে, সে আগের মতো প্রশাসনে একশ্রেণির সুবিধাবাদী ও দলবাজচক্র ভর করেছে। যাদের ইশারা-ইঙ্গিতে পর্দার আড়াল থেকে অনেক কিছু হচ্ছে। যে কারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রশাসনকে পেশাদার ও গতিশীল করতে চাইলেও তা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি ফেরেনি
ছয় মাসে অর্থনীতির ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি ফেরেনি। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ব্যাংকিং খাতের নাজুক ও দুর্বল অবস্থা, খেলাপি ঋণের পাহাড়, অর্থপাচার এবং রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির প্রভাব কাটেনি। এর সঙ্গে রয়েছে মূল্যস্ফীতির চাপ। রপ্তানি বাজারগুলো এখনো স্থিতিশীল হয়নি। সর্বশেষ জুলাই মাসেও প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি অনেকটা কমেছে। কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ানোও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। ব্যাংকে অলস অর্থের পাহাড় জমেছে। এটা চার লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে রেকর্ড গড়েছে, কিন্তু ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না। তাদের আস্থা ফেরানোর কিছু উদ্যোগ থাকলেও গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে তা সফল হচ্ছে না।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার প্রতিশ্রতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তার ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারের অন্যতম ছিল এটি। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণে কিছু উদ্যোগ থাকলেও সব ক্ষেত্রে এর সুফল এখনো মানুষের কাছে পুরোপুরি পৌঁছেনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


