ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে এক সপ্তাহেরও বেশি আগে সতর্ক করেছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। তবে সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও নেতানিয়াহু কোনো পদক্ষেপ নেননি—দুই সাংবাদিকের লেখা নতুন একটি বইয়ে এমন দাবি করা হয়েছে।
‘হোস্টেজেস: ৮৪৩ ডেজ অব অ্যাব্যান্ডনমেন্ট’ নামের বইটিতে ইসরাইল ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের কয়েক ডজন সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ইসরাইলি সরকারের অত্যন্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও রয়েছেন বলে বইটির লেখকেরা জানিয়েছেন।
হামাসের তৎকালীন নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার একজন সাবেক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাকে জানিয়েছিলেন যে তারা একটি ‘ভয়ংকর অভিযান’ প্রস্তুত করছে। সিনওয়ার সেটিকে ‘ভূমিকম্প’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
৭ অক্টোবরের প্রায় দেড় সপ্তাহ আগে আবুধাবির প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ থেকে শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ নেতানিয়াহুকে ফোন করেন। প্রায় ৪৫ মিনিটের ওই ফোনালাপে তিনি হামাসের একটি বড় ধরনের অভিযানের পরিকল্পনার কথা জানান। দুই নেতার যোগাযোগের জন্য একজন আমিরাতি কূটনীতিক নেতানিয়াহুর কাছে একটি নিরাপদ ফোন সরবরাহ করেছিলেন।
হামাসের পরিকল্পনা নিয়ে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট উদ্বিগ্ন ছিলেন, কারণ এমন হামলা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে দিতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন। তবে নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়া তাকে বিস্মিত করে। নেতানিয়াহু সতর্কবার্তাটি শান্তভাবে গ্রহণ করেছিলেন।
তবে নেতানিয়াহুর দপ্তর এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে। মঙ্গলবার দেওয়া এক বিবৃতিতে তার দপ্তর বলেছে, আমিরাত ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকে এ ধরনের কোনো সতর্কবার্তা দেয়নি। প্রাসঙ্গিক কোনো তথ্য থাকলে তা দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে আদান-প্রদান করা হয়েছিল বলেও বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে। নেতানিয়াহু নিজেও ওই সময় আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলার কথা অস্বীকার করেছেন এবং প্রতিবেদনটিকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলেছেন।
বইটিতে প্রকাশিত দাবিকে কেন্দ্র করে ইসরাইলের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলের নেতারা জানতে চাইছেন, ৭ অক্টোবরের আগে নেতানিয়াহু কী জানতেন এবং জানলে তিনি কী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন।
সাবেক সামরিক কমান্ডার ও নেতানিয়াহুর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন গাদি আইজেনকোট অভিযোগ করেছেন, ৭ অক্টোবরের হামলা সম্পর্কে নেতানিয়াহুকে বহুবার সতর্ক করা হয়েছিল এবং তিনি সেসব সতর্কতা উপেক্ষা করেছেন। তার ভাষায়, নেতানিয়াহু দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত নন।
আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট বলেছেন, ৭ অক্টোবরের প্রাণহানির জন্য নেতানিয়াহু ‘ব্যক্তিগত ও সরাসরি দায়’ বহন করেন এবং তার আর এক মুহূর্তও প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা উচিত নয়।
কেন্দ্র-বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলানও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নিরাপত্তা ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন। তার বক্তব্য, ‘কেউ আমাকে জাগায়নি’—এ ধরনের ব্যাখ্যার সময় শেষ হয়েছে; নেতানিয়াহু জানতেন, কিন্তু ব্যবস্থা নেননি।
৭ অক্টোবরের হামলার আগে নিরাপত্তা ব্যর্থতা নিয়ে ইসরাইলে দীর্ঘদিন ধরেই স্বাধীন তদন্তের দাবি রয়েছে। বিরোধী দলগুলো বলছে, তারা ক্ষমতায় এলে এ ধরনের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনকে অগ্রাধিকার দেবে। তবে নেতানিয়াহুর সরকার এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ১ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ২৫১ জন জিম্মি হন। এরপর গাজায় শুরু হওয়া ইসরাইলি সামরিক অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে।
নতুন বইয়ের দাবি এখন ইসরাইলের রাজনৈতিক বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—৭ অক্টোবরের হামলার আগে নেতানিয়াহু ঠিক কী জানতেন এবং জানা থাকলে তিনি কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তবে বইয়ে প্রকাশিত দাবিগুলো নিয়ে নেতানিয়াহুর স্পষ্ট অস্বীকৃতিও রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

