সরকারি ভাতার শত শত কোটি টাকা সফটওয়্যার জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের (পরিবর্তিত নাম নগদ লিমিটেড) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর আহমেদ মিশুক এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামীয় ৭৮৬ কোটি টাকার শেয়ার অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার আদেশ দিয়েছেন আদালত।
রোববার ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. শাহজাহান কবিরের আদালত এ আদেশ দেন।
দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তানজির আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এর আগে দুদকের সহকারী পরিচালক ও অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান মিরাজ থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের ১৬ কোটি ৮৪ লাখ ৩৪ হাজার ১২৭টি শেয়ার অবরুদ্ধের নির্দেশ চেয়ে আবেদন দাখিল করেন। যার অভিহিত মূল্য ৭৮৬ কোটি ৩৯ হাজার ২৮৪ টাকা।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ১ এপ্রিল ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত 'নগদ'-এর মাধ্যমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মোট ৩২,৬৫০ কোটি ৭৬ লাখ টাকার বেশি সরকারি ভাতা বিতরণ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী এ টাকা সোনালী ব্যাংক হয়ে ‘নগদ’-এর ই-মানি হিসেবে গ্রাহকের ওয়ালেটে যেত। কিন্তু যেসব গ্রাহক ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে ভাতা তোলেননি (মৃত্যু, পাসওয়ার্ড ভুলে যাওয়া বা অন্য কোনো কারণে), তাদের ওয়ালেট থেকে সফটওয়্যার জালিয়াতির মাধ্যমে উক্ত ই-মানি সরাবরি চুরি করা হতো।
প্রথমে এই অর্থ ২৪,১৫৯টি ভুয়া উদ্যোক্তা ওয়ালেটে এবং পরবর্তীতে ৬৪৮টি ভুয়া ডিএসও (DSO) ওয়ালেটে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে ৩৪টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ট্রাস্টকাম সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে ১,৭০৬ কোটি ৩৮ লাখ ৫৪,২২৯ টাকা রিফান্ডের নামে আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে দুদক। এর মধ্যে কেবল ৮টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমেই আত্মসাৎ করা হয়েছে প্রায় ১,৩২৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৮ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মেয়াদে আত্মসাৎ করা টাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে 'লেয়ারিং' করে থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের নামীয় ১৬ কোটি ৮৪ লাখের বেশি শেয়ার কেনা হয়েছে। এসব শেয়ার মিয়ার্স হোল্ডিংস লিমিটেড (১১ কোটি ৮৬ লাখের বেশি শেয়ার), ফিনটেক হোল্ডিংস লিমিটেড (২ কোটি ৫৭ লাখের বেশি শেয়ার), ব্লু ওয়াটার হোল্ডিংস লিমিটেড, সিগমা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড, চৌধুরী ফ্রন্টিয়ারসহ ১০টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নামে ধারণ করা আছে।
দুদকের আবেদনে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্তরা এসব শেয়ার বিক্রি বা হস্তান্তর করে টাকা বিদেশে পাচারের অপচেষ্টা করছেন। শেয়ারহোল্ডারদের বিদেশি প্রতিষ্ঠান/নাগরিক হিসেবে দেখানো হলেও বিদেশ থেকে শেয়ার ক্রয়ের জন্য টাকা আসার কোনো তথ্য অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ১৪ ধারা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা, ২০০৭-এর ১৮ বিধি অনুযায়ী এসব শেয়ার দ্রুত ফ্রিজ করা না হলে রাষ্ট্রের অপূরণীয় ক্ষতি হতো। আদালত আবেদন মঞ্জুর করে আদেশের কপি নিবন্ধক (যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহ), 'নগদ'-এর প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডারদের বরাবর পাঠানোর নির্দেশ দেন।
বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ডিজিটাল লেনদেন (এমএফএস) হিসেবে ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডকে মাস্টার এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী রাজস্ব ভাগাভাগি হওয়ার কথা ছিল- ডাক বিভাগ ৫১% এবং থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস ৪৯%। পরবর্তীতে মারাত্মক অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রকাশের পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসক নিয়োগ করে। তানভীর আহমেদ মিশুক ও তাঁর স্ত্রীর নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


