ভারতীয় সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া খবর, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় প্রভাব

ভারতীয় সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া খবর, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় প্রভাব
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত এখন আর শুধু আকাশ কিংবা হরমুজ প্রণালিতে সীমাবদ্ধ নেই। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা যখন শিরোনাম দখল করে আছে, তখন সামাজিক মাধ্যমে মিম ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের মাধ্যমে আরেকটি নীরব লড়াই চলছে। পরস্পরবিরোধী দাবি ও পাল্টা দাবির স্রোত যুদ্ধ ও স্থবির হয়ে থাকা যুদ্ধবিরতি আলোচনাকেও তাৎক্ষণিকভাবে প্রভাবিত করছে।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এর স্পষ্ট উদাহরণ। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি চাঞ্চল্যকর কিন্তু অযাচাইকৃত দাবি ইন্টারনেটের এক অখ্যাত কোণ থেকে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের প্রথম পাতায় পৌঁছে যায়, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বক্তব্যে উঠে আসে এবং জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজও তা শেয়ার করেন। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

৫ আগস্ট সকালে ভারতে অবস্থানকারী একটি বেনামি এক্স অ্যাকাউন্টে বিস্ফোরক দাবি করা হয়। পোস্টে বলা হয়, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ভাহিদি বলেছেন, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা পর্যন্ত ইরানও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা থেকে সরে আসবে না। পোস্টটির সঙ্গে ছিল ওই জেনারেলের ছবি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি মাশরুম ক্লাউডের ছবি।

তবে ওই কমান্ডার এমন কথা বলেছেন—এমন কোনো প্রমাণ ছিল না। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে—এমন প্রমাণও নেই। তারপরও দাবিটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

ইসরাইলি কয়েকটি অ্যাকাউন্টে পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ার পর দেশটির একটি টেলিভিশন চ্যানেলও কথিত উদ্ধৃতিটি প্রচার করে এবং একে ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রথম প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে। ওই দিন সন্ধ্যায় জেরুজালেমের জাতীয় সমাধিক্ষেত্র মাউন্ট হার্জেলে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও দাবিটি উল্লেখ করেন এবং একে ইরানের উদ্দেশ্যের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন।

ওয়াশিংটনে জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ অনলাইনে দাবিটি শেয়ার করে বলেন, ইরান অবশেষে এমন কিছু স্বীকার করছে, যা বহু বছর ধরেই স্পষ্ট। ফ্লোরিডার সিনেটর রিক স্কটও এটি পুনঃপ্রচার করেন। ফক্স নিউজও দাবিটি নিয়ে প্রতিবেদন করে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এ বিষয়ে তথ্য যাচাই-বাছাই করে জানায়, এর সূত্র ছিল প্রায় এক লাখ ৭৫ হাজার অনুসারী থাকা একটি ভারতীয় এক্স অ্যাকাউন্ট। দুই ঘণ্টার মধ্যে আরো একটি ভারতীয় অ্যাকাউন্ট, যার অনুসারী প্রায় ৮২ হাজার, দাবিটির হিন্দি অনুবাদ প্রকাশ করে।

এরপর ‘মোসাদ কমেন্টারি’ নামে একটি ইসরাইলি অ্যাকাউন্ট পোস্টটি আরো ছড়িয়ে দেয়। নামটি ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থার নামের সঙ্গে মিললেও অ্যাকাউন্টটির সঙ্গে ওই সংস্থার কোনো নিশ্চিত সম্পর্ক নেই। অ্যাকাউন্টটি ইঙ্গিত দেয়, ইরান আন্তরিকভাবে আলোচনায় না গিয়ে সময়ক্ষেপণ করছে। এর আধা ঘণ্টা পর ইসরাইলের চ্যানেল-১৪ উদ্ধৃতিটি ইংরেজিতে প্রচার করে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ছেলে ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ইয়াইর নেতানিয়াহু কয়েক মিনিটের মধ্যেই পোস্টগুলো ছড়িয়ে দেন। এর তিন ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে দাবিটি তার বাবার ভাষণে উঠে আসে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ভাইরাল পোস্টটিকে ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে গুজবের একটি উদাহরণ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি এমন দাবির পেছনে ইসরাইলকে দায়ী করলেও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি। তার দাবি, গত দুই দশক ধরে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে ন্যায্যতা দিতে একই ধরনের অভিযোগ ব্যবহার করা হয়েছে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রায় তিন দশক ধরে আন্তর্জাতিক নজরদারির মধ্যে রয়েছে। তবে তেহরান বরাবরই বলে আসছে, কর্মসূচিটি বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উদ্বেগই ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিযানের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

পরে ভাইরাল দাবিটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ওয়াল্টজের পোস্টটি এক্স থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

ঘটনাটি প্রমাণ করেছে, একটি বেনামি অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো একটি জাল উদ্ধৃতি কীভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দেশ ও ভাষার সীমানা পেরিয়ে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক বক্তব্যকে প্রভাবিত করতে পারে—এমনকি সত্যতা যাচাই হওয়ার আগেই।

সূত্র: এনডিটিভি

আরএ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন