ইডেন কন্যাদের কুমিল্লা সফর

ইডেন কন্যাদের কুমিল্লা সফর

ইডেন মহিলা কলেজ ইতিহাসের এক অন্যতম গৌরবময় প্রাচীন বিদ্যাপীঠ। এখানে শত শত স্বপ্নবাজ নারী তাদের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন, ভাগ্য ও সমাজের প্রচলিত ধারণার বদলে দিতে পা রাখেন এই স্বপ্নচূড়ায়। সেই স্বপ্নের আঙিনার ইংরেজি বিভাগ এবার চার দেয়ালের গণ্ডি পেরিয়ে পা বাড়াল ইতিহাসের বুকে। বইয়ের পাতায় পড়া ইতিহাস আর সামনে দাঁড়িয়ে হাজার বছর আগের সেই ইতিহাস উপলব্ধি করার উদ্দেশ্যেই বিহারের সাম্রাজ্য শালবনবিহার কুমিল্লার সফর।

যাত্রাপথ শুরু হলো ক্যাম্পাসের প্রাঙ্গণ থেকে। ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করল রজনিগন্ধা, রক্তকরবী ও দোলনচাঁপা বাসের চাকা। ভোরের শীতল বাতাস আর কোমল আলোয় বাসগুলো বেরিয়ে গেল মূল ফটকের সামনে দিয়ে, যেন ইডেনকে বিদায় জানিয়ে কুমিল্লার অভ্যর্থনার অপেক্ষায় ছুটে চলছে সামনে পথে, গন্তব্যের দিকে। হৃদয়ে আনন্দের প্রণোদনা আর উচ্ছ্বাস ভেসে উঠল শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে। গতিপথের ছন্দ, সুর ও তাল-লয়ে জমে উঠল বাসেই সকালের নাশতা। বন্ধুদের আড্ডায় যখন উৎসবমুখর পরিবেশ, তখনই বাস পৌঁছাল প্রথম গন্তব্য ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রিতে। এখান থেকেই শুরু হলো প্রাচীন ইতিহাসের এক রহস্যময় অজানা গল্প জানার সূচনা। যা আজ ইতিহাস, বইয়ের পাতার গল্প ও শিক্ষার্থীদের মনের কল্পনা, তা ছিল অতীতের এক নির্মম সত্য।

বিজ্ঞাপন

প্রথম গন্তব্য : ওয়ার সিমেট্রি

ওয়ার সিমেট্রিতে প্রবেশমাত্রই চোখে পড়ল সারিবদ্ধ বহু সমাধিফলক, যা দেখে বুঝতে বাকি রইল না এটি একটি বিশেষ সামরিক কবরস্থান, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নিহত সৈনিকদের সম্মান জানিয়ে শায়িত করা হয়েছে চিরনিদ্রায়। প্রতিটি সমাধির ওপরে নিহত সৈনিকের নাম, পদবি, সেনাবাহিনীর প্রতীক এবং মৃত্যুর তারিখ খোদাই করা রয়েছে। পাথরে খোদাই করা সংখ্যা জানান দিচ্ছে, মাত্র ২২ বছর বয়সে যাদের জীবন শুরু হওয়ার কথা ছিল, তাদের জীবন থেমে গিয়েছিল চিরকালের মতো। আচমকাই বইয়ের পাতার ইতিহাস নেমে এলো চোখের পাতায়। যুদ্ধের এই নির্মম ও করুণ ইতিহাসে নিমিষেই যেন ভ্রমণ করল শিক্ষার্থীরা।

দ্বিতীয় গন্তব্য : বার্ড

কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকার কেন্দ্রবিন্দুতে বার্ডের অবস্থান, যা ছিল আমাদের যাত্রাপথের দ্বিতীয় গন্তব্যস্থল। এখানে পল্লী উন্নয়নের একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শান্ত ও সবুজে ঘেরা এই প্রাঙ্গণে একচিলতে প্রশান্তির খোঁজে মানুষ ছুটে আসে নানা স্থান থেকে। বার্ডে প্রবেশমাত্রই চোখে পড়ে দুপাশের সবুজ সমারোহ বার্ডের বুক চিরে এক প্রশস্ত ও বিস্তর পথের উন্মোচন করেছে। আরেকটু সামনে এগোতেই দেখা যায় বিভিন্ন গবেষণা একাডেমি আর একটি ক্যাফেটেরিয়া ও কুটির। দূরে তাকাতেই চোখ পড়ে নীলাচল পাহাড়ের দিকে। পাহাড় দেখতেই ইডেনকন্যাদের উচ্ছ্বাস। মুহূর্তেই যেন চোখমুখের ক্লান্তি মিলিয়ে গেল নতুন এক আবিষ্কারের সন্ধানে। অনেকেই সবুজে ঘেরা পাহাড়ের এই সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দি করতে লাগল। সেই সঙ্গে শেষ হলো বার্ডের যাত্রা।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় : ক্যাম্পাসের প্রাঙ্গণ

কুমিল্লার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক জীবন্ত উদাহরণ বর্তমানে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। লালমাটির পাহাড় ও ঘন অরণ্যে ঘেরা এই বিদ্যাপীঠটি যেন এক নৈসর্গিক বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে অতীতের স্মৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে বিজড়িত হয়েছে শিক্ষার্থীদের আধুনিক জ্ঞানচর্চা। ইতিহাসের বুকে ভ্রমণে এসে যেন শিক্ষার্থীরা মিলিত হলো আধুনিকতার এক ছোঁয়ায়। অসম্ভব এই সৌন্দর্যকে বিদায় জানিয়েই তারা রওনা হলো পরবর্তী গন্তব্যস্থলের দিকে।

ইডেন-মহিলা-কলেজ-ইতিহাসের-এক-অন্যতম-গৌরবময়-প্রাচীন-বিদ্যাপীঠ

তৃতীয় গন্তব্য : স্বপ্নচূড়া রিসোর্ট

স্বপ্নচূড়া রিসোর্টটি পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে যেন স্বাগত জানাচ্ছে আগত সব দর্শনার্থীকে। এই স্বপ্নচূড়া রিসোর্টের প্রবেশদ্বার ছিল কৃত্রিম পাথর আর গাছের গুড়ির আদলে তৈরি একটি জঙ্গলে প্রবেশের গুহার মতো, যা আকস্মিক সব ইডেনিয়ানের নজর কেড়েছে। এই প্রবেশদ্বারটি যেন উষ্ণ অভ্যর্থনায় আমাদের জন্য বহুকাল ধরে এভাবেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর খোলা আকাশটা যেন ছাদ হয়ে আশ্রয় দিচ্ছে এই স্বপ্নের মতো স্বপ্নচূড়া রিসোর্টটিকে। রিসোর্টে প্রবেশের পর দুপুরের খাবার শেষ করে সাংস্কৃতিক পর্ব পরিচালনার জন্য নতুন সাজে সেজে ওঠে ইডেনকন্যারা। শিক্ষাসফরের এই পর্বে একত্র হয় সবাই। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মিরাজুল ইসলাম ও চরু হক।

ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. অমল কুমার চক্রবর্তীর বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হয় অনুষ্ঠান। সবার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মাধ্যমে শেষ হয় অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব।

বক্তব্য শেষে অতিথি লিসান আনিছের গান পরিবেশনের মাধ্যমে শুরু হয় সাংস্কৃতিক পর্বটি। তার কণ্ঠে ‘তুমি বরুণ হলে হব আমি সুনীল, তুমি আকাশ হলে হব শঙ্খচিল’ ও ধন্য ধন্য মেরা, ধন্য ধন্য মেরা সিলসিলা এলো, দিল্লিতে নিজামুদ্দিন আউলিয়া এলো’—জনপ্রিয় দুটি গান যেন মুহূর্তেই মাতিয়ে তোলে পুরো আয়োজনকে।

পরবর্তী সময়ে তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অরিন আবৃত্তি করে দেবব্রত সিংহের ‘তেজ’ কবিতাটি। শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে ও অনুষ্ঠানটি আরো প্রাণবন্ত করতে সহযোগী অধ্যাপক সোনিয়া চৌধুরী ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে মনে পড়ল তোমায় অশ্রুভরা দুটি চোখ’—এই গানটি পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে গান পরিবেশন করেন প্রধান অতিথি অপর্ণা চক্রবর্তী। তিনি তার সুমধুর কণ্ঠে ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই, সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি’ গানটি পরিবেশন করেন। রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন তাহসিন। আর এরই মধ্য দিয়ে শেষ হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

আর শুরু হয় র‍্যাফল ড্র’র টানটান উত্তেজনা। র‍্যাফল ড্র’র নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সেই উত্তেজনা বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীদের মনে। সবার মনে হতে থাকে, এই বুঝি আমার নাম ডাকবে। আর তার মধ্য থেকে উপস্থিত সাতজন পুরস্কার অর্জন করেন। অনুষ্ঠানের সবশেষে শুরু হয় হাঁড়িভাঙা প্রতিযোগিতা। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের বিনোদনের জন্য আয়োজন করেন এই প্রতিযোগিতাটি। হাঁড়িভাঙা প্রতিযোগিতায় হাড়ি ভাঙতে সফল হন অতিথি লিসান আনিছ ও সহযোগী অধ্যাপক মাহফুজা আক্তার। আর এরই মধ্য দিয়ে শেষ হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং শুরু হয় শেষ গন্তব্যস্থল শালবনবিহারের উদ্দেশে যাত্রা।

স্বপ্নচূড়া

শেষ গন্তব্য : শালবনবিহার

শালবনবিহারে প্রবেশপথে চোখে পড়ে সারিবদ্ধ হরেক রকমের বাহারি জিনিসপত্রের দোকান, যেখানে বিক্রি করা হয় মাটির তৈরি খেলনা, ফলক, ছোট-বড় শোপিস, ফুলদানি, বাঁশ এবং বেতের তৈরি ঝুড়ি, ওয়াল মেট, টুপি, ব্যাগ ও ঘর সাজানোর নানা তৈজসপত্র। দোকানগুলোর সামনে মুহূর্তেই জমে উঠল উপচেপড়া ভিড়। কেউ কেনে বার্মিজ আচার আবার কেউ বা তার পছন্দের বাঁশের তৈরি ঝুড়ি। এভাবে কেনাকাটা শেষ করে প্রবেশ করে প্রাচীন প্রত্নস্থল শালবনবিহার। সেখানে শিক্ষার্থীরা প্রাচীন বাংলার সমৃদ্ধ বৌদ্ধ সভ্যতা দেখে বিস্মিত হয়ে ওঠে। চারদিকের পোড়ামাটির দেয়াল মূলত দেড় হাজার বছর আগের মানুষের জীবনযাত্রাকে সংজ্ঞায়িত করে। প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিই হলো শালবনবিহারের জ্বলন্ত প্রতীক।

সন্ধ্যা নামতেই শুরু হলো ফিরতি পথের যাত্রা, সঙ্গে একরাশ স্মৃতির পসরা। শিক্ষাসফরের কাটানো আনন্দঘন মুহূর্ত, উল্লাস, হাসি-আড্ডা সবকিছুই যেন দিন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডুব দিয়েছে। কিন্তু এই উল্লাস আর কুমিল্লার পথে এই আনন্দযাত্রা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে বয়ে বেড়াবে ইডেনিয়ানরা। এ যেন ইডেনকন্যাদের জীবনের এক জীবন্ত পাঠ হয়ে ফ্রেমে বন্দি স্মৃতি হয়ে থাকবে চিরকাল।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন