মানুষকে বই পড়ায় উৎসাহিত করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সিঙ্গাপুর সরকার। সরকারি একটি ওয়েবসাইটে বই পড়ার সময় নথিভুক্ত করলে অংশগ্রহণকারীদের অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো কমতে থাকা বই পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনা এবং মানুষকে মোবাইল ফোনে অকারণে দীর্ঘ সময় স্ক্রল করার বদলে বই পড়ায় উৎসাহিত করা।
চলতি মাসে চালু হওয়া এই কর্মসূচিতে একজন অংশগ্রহণকারীকে অন্তত ১৫ মিনিট বই পড়তে হবে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ একটি পড়ার সেশন নথিভুক্ত করা যাবে। এভাবে ৫০টি সেশন সম্পন্ন করলে পাওয়া যাবে ১ সিঙ্গাপুর ডলার। অর্থাৎ টাকার পরিমাণ খুবই সামান্য। তবে আচরণবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থের পরিমাণ কম হলেও এটি মানুষের মধ্যে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে।
মনোবিজ্ঞানী ও ‘দ্য অ্যাংজাস জেনারেশন’ বইয়ের লেখক জনাথন হেইডট মনে করেন, বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে পুরস্কার একটি আচরণ শুরু করার ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। তবে বই পড়ার আনন্দ যদি নিজের মধ্যেই তৈরি হয়, তাহলে অর্থ না থাকলেও সেই অভ্যাস টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে শুধু অর্থের জন্য কেউ বই পড়লে পুরস্কার বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অভ্যাসও বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক লরি বারিলও মনে করেন, নিয়মিত কোনো আচরণ পুনরাবৃত্তি করলে তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হতে পারে। তার মতে, সিঙ্গাপুরের এই উদ্যোগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো মানুষ পুরস্কার পাওয়ার সময় বেশি পড়ছে কি না, তা নয়; বরং পুরস্কার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও তারা বই পড়ার অভ্যাস ধরে রাখতে পারছে কি না।
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আচরণগত মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক আইভো ভ্লায়েভ বলেন, মানুষের আচরণে প্রণোদনার কার্যকারিতা সবসময় অর্থের পরিমাণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। তার মতে, সিঙ্গাপুরের কর্মসূচির অর্থকে প্রচলিত অর্থে বই পড়ার মজুরি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি মানুষকে কাজটি শুরু করার জন্য একটি ছোট ‘ট্রিগার’ হিসেবে কাজ করতে পারে। পড়ার সময় নথিভুক্ত করা, অগ্রগতি দেখা এবং ধারাবাহিকতা ধরে রাখার বিষয়গুলো মানুষকে লক্ষ্য পূরণের দিকে এগিয়ে নিতে পারে।
এই কর্মসূচির ‘গ্যামিফিকেশন’ বা খেলাধুলার মতো পুরস্কারভিত্তিক কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রতিদিন ১৫ মিনিটের একটি সহজ লক্ষ্য, পড়ার ধারাবাহিকতা দেখা এবং নিজের অগ্রগতি অনুসরণ করার সুযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাৎক্ষণিক আকর্ষণের একটি বিকল্প তৈরি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বিশেষ করে যারা আগে বই পড়তেন কিন্তু এখন পড়ার অভ্যাস হারিয়ে ফেলেছেন, তাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। আবার যারা বই পড়তে চান কিন্তু শুরু করতে পারছেন না, তাদেরও ছোট একটি তাৎক্ষণিক পুরস্কার সেই ইচ্ছাকে কাজে পরিণত করতে সাহায্য করতে পারে।
ব্রিটেনে বই পড়ায় উৎসাহ দিতে অর্থের পরিবর্তে অন্য ধরনের পুরস্কারের ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সার্টিফিকেট এবং ‘রিডিং এজেন্সি’র সামার রিডিং চ্যালেঞ্জে ব্যাজ ও সার্টিফিকেট দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এসব উদ্যোগে মূল পুরস্কার হলো স্বীকৃতি ও অর্জনের অনুভূতি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সিঙ্গাপুরের উদ্যোগটি বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। কোথাও অর্থ, কোথাও বই, কোথাও সার্টিফিকেট বা ব্যাজ এবং কোথাও শুধু পয়েন্ট ও প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা রেখে তুলনা করা যেতে পারে। এতে কোন ধরনের প্রণোদনা মানুষের দীর্ঘস্থায়ী পড়ার অভ্যাস তৈরিতে বেশি কার্যকর, তা বোঝা সম্ভব হতে পারে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বই পড়ার জন্য অর্থ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্নও উঠছে—আনন্দ ও জ্ঞান অর্জনের জন্য যে কাজ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে করে, সেটির জন্য কি সরকারকে আর্থিক পুরস্কার দিতে হবে? অধ্যাপক ক্যাটি মিলকম্যানের বলেছেন, সরকার যেহেতু শিক্ষার অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রেই ভর্তুকি দেয় এবং অর্থ ব্যয় করে, তাই বই পড়াকে উৎসাহিত করতে পুরস্কার দেওয়াকেও সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যেতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

