প্রযুক্তির অগ্রগতি কি মানুষকে নৈতিকভাবে এগিয়ে নিচ্ছে

প্রযুক্তির অগ্রগতি কি মানুষকে নৈতিকভাবে এগিয়ে নিচ্ছে

১৭৪৯ সালের এক গ্রীষ্মের দিনে প্যারিসের রাস্তায় হাঁটছিলেন ফরাসি দার্শনিক জ্যঁ জাক রুশো। হঠাৎ তার চোখে পড়ে দিজোঁ একাডেমির একটি প্রশ্ন—বিজ্ঞান ও শিল্পকলার অগ্রগতি কি মানুষের নৈতিকতাকে পরিশুদ্ধ ও উন্নত করেছে? সাধারণ একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিযোগিতার প্রশ্ন হলেও রুশোর কাছে এটি হয়ে উঠেছিল গভীর আত্মজিজ্ঞাসার মুহূর্ত। ইরাকি ইতিহাসবিদ ও শিক্ষাবিদ সাতি আল-হুসরি ১৯৫১ সালের তার একটি গ্রন্থে এই ঘটনাকে রুশোর চিন্তার জগতে এক ধরনের জাগরণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।

রুশোর উপলব্ধি ছিল—বিজ্ঞান ও জ্ঞানের অগ্রগতি নিজে থেকেই মানুষকে নৈতিকভাবে উন্নত করে না। বরং জ্ঞান কখনো কখনো মানুষের অহংকার বাড়াতে পারে, কিন্তু চরিত্র বা নৈতিকতা উন্নত নাও করতে পারে। অর্থাৎ অগ্রগতি সব সময় উন্নতি নয়; কখনো কখনো অগ্রগতির আড়ালেও অবক্ষয় লুকিয়ে থাকতে পারে। এই প্রশ্নই কয়েক শতাব্দী পর নতুন রূপে আমাদের সামনে ফিরে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

সাতি আল-হুসরি এই রুশোভীয় প্রশ্নকে শুধু ইতিহাসের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ঘটনা হিসেবে দেখেননি। তিনি এটিকে শিক্ষিত ও সচেতন সমাজ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। আল-হুসরি আরব জাতীয়তাবাদী চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক এবং শিক্ষাবিদ হিসেবে পরিচিত। তার চিন্তায় শিক্ষা ছিল মানুষের মধ্যে একটি বিস্তৃত সামাজিক ও জাতীয় চেতনা গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আধুনিক গবেষণাতেও তাকে আরব জাতীয়তাবাদী চিন্তার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কিন্তু আজকের পৃথিবীতে সেই জিজ্ঞাসার চরিত্র বদলে গেছে। এখন প্রশ্ন শুধু বিজ্ঞান ও শিল্পকলার অগ্রগতি নিয়ে নয়; প্রশ্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অ্যালগরিদম এবং মুহূর্তের মধ্যে বিপুল পরিমাণ তথ্য পাওয়ার ক্ষমতা নিয়ে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, জ্ঞানকে হাতের নাগালে এনে দিয়েছে এবং সৃজনশীলতার অনেক সীমাবদ্ধতা দূর করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি মানুষের নৈতিক বিচারবোধ ও দায়িত্ববোধকে কীভাবে পরিবর্তন করছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শুধু একটি প্রযুক্তিগত হাতিয়ার নয়। এটি মানুষের চিন্তা, লেখালেখি, সৃজনশীলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এমনকি পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও অংশীদার হয়ে উঠছে। যে জ্ঞান অর্জনের জন্য একসময় দীর্ঘ পরিশ্রম প্রয়োজন হতো, এখন তা কয়েক মুহূর্তে পাওয়া যায়। একটি লেখা, ছবি বা ধারণাও মুহূর্তের মধ্যে তৈরি করা সম্ভব। ফলে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—সহজলভ্য জ্ঞান কি মানুষের জ্ঞানকে গভীর করছে, নাকি জ্ঞানের প্রতি মানুষের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা কমিয়ে দিচ্ছে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই পরিবর্তনকে আরো তীব্র করেছে। সেখানে নৈতিকতার মূল্যায়ন অনেক সময় যুক্তি বা চরিত্র দিয়ে নয়, অনুসারীর সংখ্যা, জনপ্রিয়তা কিংবা কোনো বক্তব্য কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে—তার ওপর নির্ভর করে। সত্যের চেয়ে ভাইরাল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে মানুষ নৈতিক হওয়ার চেয়ে নৈতিক হিসেবে দৃশ্যমান হওয়ার প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রুশো যে সামাজিক মুখোশের কথা বলেছিলেন, ডিজিটাল যুগে সেটিই যেন নতুন রূপ পেয়েছে।

প্রযুক্তির গতি এই সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। আগে কোনো খবর, বক্তব্য বা সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবার জন্য সময় পাওয়া যেত। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া মানুষকে দ্রুত বিচার করতে, দ্রুত ক্ষুব্ধ হতে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে। ফলে প্রতিক্রিয়া অনেক সময় চিন্তার জায়গা দখল করে নেয়। প্রযুক্তির এই গতি তাই শুধু প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য নয়; এটি মানুষের আচরণ ও নৈতিকতার ওপরও প্রভাব ফেলে।

তবে প্রযুক্তিকে কেবল নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ হিসেবে দেখাও যথার্থ নয়। প্রযুক্তি নিজে নৈতিক বা অনৈতিক নয়। এটি মানুষের হাতে একটি শক্তিশালী মাধ্যম। সেই মাধ্যম কীভাবে ব্যবহৃত হবে, তা নির্ভর করে মানুষের মূল্যবোধ, শিক্ষা, বিবেক ও দায়িত্ববোধের ওপর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জ্ঞান বাড়াতে পারে, আবার মানুষের হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধও দুর্বল করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষকে সংযুক্ত করতে পারে, আবার একই সঙ্গে সমাজকে বিভক্তও করতে পারে।

তাই রুশোর প্রায় তিন শতাব্দী আগের প্রশ্নটি আজও প্রাসঙ্গিক। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রশ্নটি আরও গভীর হয়েছে—প্রযুক্তির অগ্রগতি কি মানুষের নৈতিক জীবনকে উন্নত করছে, নাকি মানুষকে তার নিজস্ব নৈতিক দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?

সম্ভবত এর উত্তর প্রযুক্তির মধ্যে নেই; উত্তর রয়েছে মানুষকে ঘিরে। অগ্রগতি তখনই প্রকৃত অগ্রগতি হবে, যখন তা মানুষের মানবিকতা, ন্যায়বোধ, দায়িত্বশীলতা ও বিবেককে সঙ্গে নিয়ে এগোবে। প্রযুক্তি যদি মানুষকে ছাড়িয়ে যায়, কিন্তু মানুষের নৈতিকতা তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে না পারে, তবে সেই অগ্রগতি সভ্যতার জন্য আশীর্বাদের পাশাপাশি বিপদের কারণও হতে পারে। রুশোর পুরোনো প্রশ্নের আধুনিক উত্তর তাই হতে পারে—অগ্রগতি তখনই গুণে পরিণত হয়, যখন তার সঙ্গে মানুষও এগিয়ে যায়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন