২০২৬ সালের ১৪ আগস্ট সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু শুধু যে এড়ানো যেত তা-ই নয়, বরং এখানে আরো অনেক বিষয় জড়িয়ে আছে। দুর্ঘটনার পর অনুসন্ধানে সেখানে হাইড্রোজেন সালফাইড, মিথেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং অ্যামোনিয়া গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
হংকং আন্তর্জাতিক কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অব শিপসের সব নিয়ম মেনে চলার সনদ ছিল ফেরদৌস স্টিলের। তারপরও এ ঘটনা ঘটেছে। এটাই সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়। ইন্ডিয়ান রেজিস্টার অব শিপিং (আইআরক্লাস) থেকে তাদের সনদ দেওয়া হয়েছিল। সঙ্গে বিউরো ভেরিটাস থেকে আইএসও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির সনদও তাদের ছিল। বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড থেকেও তারা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেয়েছিল।
এত সনদের পরও ৯টি তাজা প্রাণ রক্ষা করা গেল না। এই ট্র্যাজেডি তাই একটি সোজা প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে : বাংলাদেশে এই সনদ কি সত্যি কোনো সুরক্ষা নিশ্চিত করছে? নাকি এটি শুধু কিছু কাগজপত্র, অডিট আর সরকারি সইয়ের স্তূপ ছাড়া আর কিছুই নয়, যার সঙ্গে শ্রমিকদের প্রতিদিনের বাস্তবতার কোনো মিল নেই?
এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এ দুর্ঘটনার ঠিক এক মাস আগে ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছিল। বারবার পেশাগত নিরাপত্তা না মানার কারণে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সরকারি তদন্তে যদি এটি সত্যি প্রমাণিত হয়, তবে বোঝা যাবে যে, ইয়ার্ডের নিরাপত্তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের আগেই সন্দেহ ছিল। তারপরও এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটার আগ পর্যন্ত কাজ কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হয়নি।
হংকং কনভেনশনের শর্ত
২০২৫ সালের ২৬ জুন হংকং কনভেনশন কার্যকর হয়। বিশ্বজুড়ে একটি আন্তর্জাতিক নিয়ম চালু করা এর মূল উদ্দেশ্য। বাণিজ্যিক জীবন শেষে কোনো জাহাজ যখন ভাঙা হবে, তখন তা যেন মানুষের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা আর পরিবেশের জন্য হুমকি না হয়ে দাঁড়ায়Ñসেটাই নিশ্চিত করতে চায় এই কনভেনশন।
কনভেনশনের নিয়ম অনুযায়ী, যেসব জাহাজ ভাঙতে আনা হবে, সেগুলোতে একটি ‘বিপজ্জনক পদার্থের তালিকা’ থাকতে হবে। কোনো ধরনের বিপজ্জনক পদার্থ, কতটুকু আছে আর কোথায় আছে, তা স্পষ্ট করে উল্লেখ করা চাই। অনুমোদন পাওয়া ইয়ার্ডকে একটি ‘জাহাজ রিসাইক্লিং ফ্যাসিলিটি প্ল্যান’ বা পরিকল্পনা মেনে চলতে হবে। এর মধ্যে থাকবে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, জরুরি পরিস্থিতির প্রস্তুতি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং হিসাব রাখার নিয়ম। এছাড়া প্রতিটি নির্দিষ্ট জাহাজ কীভাবে নিরাপদে ভাঙা হবে, তার জন্য আলাদা একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, নিজ দেশের ইয়ার্ডগুলো এসব নিয়ম মানছে কি না¬Ñতা সরকারকে যাচাই করতে হবে। সনদ কিন্তু সমাধানের একটি অংশমাত্র। এর জন্য চাই নিয়মিত নজরদারি আর আইনের প্রয়োগ। এই কনভেনশন অনুযায়ী জাহাজের মালিক, যে দেশের পতাকাবাহী জাহাজ, বন্দর কর্তৃপক্ষ, যে দেশে জাহাজ ভাঙা হচ্ছে, সেই দেশ এবং ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষÑসবার ওপরই দায়িত্ব বর্তায়। কোনো ইয়ার্ড একটা অডিটে পাস করলেই শেষ নয়, সঠিক নিয়ম না মানলে পরদিনই সেটি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকলে, শ্রমিকদের ঠিকমতো প্রশিক্ষণ না দিলে বা মালিক পক্ষ নিরাপত্তার চেয়ে লাভ বেশি দেখলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
বদ্ধ জায়গার বিপদ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা
এমটি রাসি জাহাজে যেভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, সমুদ্র কিংবা কারখানার কাজে এ ধরনের বিপদ খুবই পরিচিত বিষয়। সেটি হলো বিপজ্জনক গ্যাসে ভরা কোনো বদ্ধ ঘরে প্রবেশ করা।
পচা পানি বা জৈব বর্জ্য অনেক দিন জমে থাকলে সেখানে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস তৈরি হতে পারে। হাইড্রোজেন সালফাইড খুব বিষাক্ত গ্যাস। এটি দ্রুত মানুষকে কাবু করে ফেলে। গ্যাসের তীব্রতা বেশি হলে আপনি বুঝে ওঠার আগেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলবেন। কোনো বদ্ধ ঘরে ঢোকার আগে একটি লিখিত নিয়ম মেনে চলা দরকার। সেই জায়গাটিকে আগে আলাদা করতে হবে। ভেতরের তরল ও তরল বর্জ্য পরিষ্কার করতে হবে। জোরপূর্বক বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। বাইরে থেকে ঘরের ভেতরের বাতাস পরীক্ষা করতে হবে। শুধু এক জায়গায় নয়, ঘরের ভেতরে বিভিন্ন স্তরে ও স্থানে বাতাসের মান মেপে দেখতে হবে। ঘরে ঢোকার লিখিত অনুমতিপত্র থাকতে হবে। প্রয়োজনে ঠিকঠাক মাস্ক বা রেসপিরেটর পরতে হবে। বাইরে একজন লোক দাঁড়িয়ে পাহারা দেবে। ভেতরের সঙ্গে সার্বিক যোগাযোগ রাখতে হবে। সঠিক সরঞ্জামসহ দক্ষ উদ্ধারকারী দলকে সবসময় তৈরি রাখতে হবে। আগেরজন পরীক্ষা করে গেছে এবং সব ঠিক আছে বলেছেÑএমন কথা বিশ্বাস করে কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া যাবে না।
রাসি জাহাজের ঘটনাটি আরো বেশি উদ্বেগের। জানা গেছে, নিরাপত্তাকর্মী ও শ্রমিকরা জায়গাটিতে যাওয়ার আগেই সেখানে তরল বর্জ্য দেখতে পাওয়া যায়। এমন বর্জ্য দেখার সঙ্গে সঙ্গেই সাবধান হওয়া উচিত ছিল। সেখানে অক্সিজেন কমে যাওয়া, আগুন ধরা বা বিষাক্ত গ্যাস জমার আশঙ্কা থাকে। বর্জ্য কী তা চিহ্নিত করা, সরিয়ে ফেলা এবং ভালোভাবে পরীক্ষা না করা পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখা উচিত ছিল।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) অনেক আগে থেকেই জাহাজ ভাঙার কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আগুনে পোড়া, বিস্ফোরণ, ওপর থেকে পড়ে যাওয়া, ভারী স্টিল গায়ে পড়া, খনিজ অ্যাসবেস্টস, বিষাক্ত রাসায়নিক এবং ক্ষতিকর গ্যাসের মুখোমুখি হওয়া এই কাজের নিত্যদিনের ঘটনা। আইএলওর নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা আছে : নিয়মিত ঝুঁকি মেপে দেখতে হবে, যোগ্য লোক দিয়ে নজরদারি করতে হবে, সঠিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং জরুরি অবস্থার পরিকল্পনা রাখতে হবে।
সনদ এবং প্রকৃত নিরাপত্তার পার্থক্য
ফেরদৌস স্টিলকে হংকং কনভেনশনের নিয়ম মানার প্রধান সনদটি দিয়েছিল আইআরক্লাস। কিন্তু সেই সনদ ছিল ইয়ার্ডের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও সুযোগ-সুবিধার জন্য। দুর্ঘটনা ঘটার ঠিক আগে রাসি জাহাজের ওই নির্দিষ্ট ঘরে ক্ষতিকর গ্যাস ছিল কি নাÑএই সনদ কিন্তু তা প্রমাণ করে না।
জাহাজ সম্পর্কিত অন্যান্য কাজের দায়িত্বে ছিল আরো কিছু প্রতিষ্ঠান। বিপজ্জনক পদার্থের তালিকা তৈরি করেছিল মেটিজসফট এশিয়া। অন্যদিকে শিপ স্ট্রিপ নামের দেশি একটি বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থা প্রাথমিক পরিদর্শন ও জাহাজ কাটার কাঠামো পরিকল্পনা তৈরি করে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থাও পরিদর্শন ও অনুমোদনের কাজে জড়িত ছিল।
তাই তদন্তের সময় কয়েকটি বিষয়ে কার কতটুকু দায় ছিল তা স্পষ্ট করা দরকার : এগুলো হলো
ইয়ার্ডের সার্বিক হংকং কনভেনশন অডিট কি যথেষ্ট কঠোর ছিল? জাহাজে যেসব বিপজ্জনক পদার্থ ছিল, তার সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা হয়েছিল কি? জাহাজ কাটার পরিকল্পনায় কি বদ্ধ জায়গা এবং ক্ষতিকর গ্যাসের ঝুঁকির কথা বলা ছিল? শ্রমিকরা ঘরে ঢোকার ঠিক আগে কে বাতাসের মান পরীক্ষা করেছিল? বাতাস মাপার যন্ত্রটি কি ঠিক ছিল? ঘরে ঢোকার বা কাজ করার অনুমতিপত্রে কে সই করেছিল?
উৎপাদন চালু রাখার জন্য কারখানা কর্তৃপক্ষ কি কোনো সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল? প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকারী দল এবং শ্বাস নেওয়ার আধুনিক সরঞ্জাম কি সেখানে উপস্থিত ছিল?
একটা সনদ দিয়ে শুধু এটাই বোঝায় যে কিছু নিয়ম তৈরি আছে। তবে প্রতিবার কাজ বা কাটার সময় সেসব নিয়ম মেনে চলা হচ্ছে কি নাÑতা সনদ দিয়ে প্রমাণ করা যায় না। কারখানার নিরাপত্তা প্রতিদিন যাচাই করতে হয়। সনদ দেওয়া সংস্থা আর সরকারি কর্তারা যদি শুধু ইয়ার্ডের দেওয়া কাগজপত্রের ওপর ভরসা করেন, আগে থেকে জানিয়ে পরিদর্শন করেন, কিংবা গোপনে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা না বলেন, তবে বাইরে থেকে একটা ইয়ার্ডকে নিরাপদ মনে হলেও ভেতরে অনেক বড় গাফিলতি লুকিয়ে থাকতে পারে।
বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে পড়ছে
নিরাপদ ও আধুনিক জাহাজ রিসাইক্লিং সুবিধা গড়ে তোলার জন্য বাংলাদেশ বেশ কিছু বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। ইয়ার্ডগুলো এখন লিক-প্রুফ মেঝে, ক্রেন, বর্জ্য পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, বিপজ্জনক বর্জ্য রাখার আলাদা জায়গা তৈরি করেছে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করা হয়েছে এবং শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য পোশাকের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ হংকং কনভেনশনে স্বাক্ষর করায় এটি বিশ্বব্যাপী কার্যকর হওয়ার পথ সহজ হয়েছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) তাদের বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
তা সত্ত্বেও কাঠামোগত কিছু সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। প্রথমত, আইন প্রয়োগের জায়গায় সমন্বয়ের অভাব আছে। বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয় প্রশাসনÑসবাই এখানে কিছু না কিছু ক্ষমতা ভোগ করে। যখন দায়িত্ব এভাবে ভাগ হয়ে যায়, তখন এক সংস্থা মনে করে অন্য সংস্থা হয়তো সবচেয়ে জরুরি নিরাপত্তা বিষয়টি দেখে নিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, পরিদর্শনগুলো আগে থেকে জানা থাকে এবং শুধু কাগজপত্রের ওপর বেশি নজর দেওয়া হয়। পরিদর্শকরা আসবেন শুনে ইয়ার্ড হয়তো একদিনের জন্য সেজেগুজে বসে থাকে। কিন্তু প্রতিদিনের আসল চেহারা থাকে অন্যরকম।
তৃতীয়ত, দুর্ঘটনার পর বিচারের ব্যবস্থা খুব দুর্বল। তদন্ত কমিটি হয়। ক্ষতিপূরণ দেওয়া আর অপরাধী ইয়ার্ড সাময়িক বন্ধ করার আশ্বাসও পাওয়া যায়। তবে সম্পূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন আমরা সচরাচর দেখতে পাই না। দোষীদের খুব কমই আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি হয়। ফলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকে।
সর্বশেষ, পলিযুক্ত কাদা মাটিতে জাহাজ ভাসিয়ে কেটে ফেলার পুরোনো পদ্ধতির কারণে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ, জরুরি উদ্ধারকাজ এবং আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার কঠিন হয়ে পড়ে। যদিও হংকং কনভেনশন এই পদ্ধতি একেবারেই নিষিদ্ধ করেনি, তবে জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে এভাবে উন্মুক্ত কাদামাটিতে জাহাজ কাটলে প্রকৃত ড্রাই ডক বা আধুনিক প্ল্যাটফর্মের মতো নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই শক্ত।
আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা
সব দায় শুধু বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। জাহাজমালিক, ব্রোকার, নগদ অর্থ দিয়ে ক্রেতা, জাহাজের পতাকাবাহী দেশ এবং আন্তর্জাতিক ক্লাসিফিকেশন সোসাইটিÑতারা সবাই এই বিশ্ববাজার থেকে ব্যবসা করছে। জাহাজের মালিকরা অনেক সময় সেই ইয়ার্ডকেই বেছে নেন, যারা ভাঙা লোহা বা স্ক্র্যাপের দাম বেশি দেয়। আর সেই বেশি দাম দেওয়া সম্ভব হয় শুধু কম মজুরি, পরিবেশ রক্ষায় কম খরচ আর দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে।
জাহাজ মালিকদের উচিত সনদপত্র দেখেই সন্তুষ্ট না হয়ে নিজেদের দায়বদ্ধতা থেকে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা। এই ইয়ার্ডে আগে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে কি না, নিরাপত্তা কেমন, বর্জ্য কীভাবে ফেলা হয়Ñসব খোঁজ নেওয়া দরকার। আইএমও ঠিকই বলেছে, এই চুক্তি শুধু জাহাজভাঙার দেশের ওপরই নিয়ম চাপায় না, সঙ্গে জড়িত সব পক্ষকেই দায়িত্ব দেয়।
সনদ প্রদানকারী সংস্থাগুলোকে নিজেদের নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখতে হবে। কোনো সনদে পরিচালিত ইয়ার্ডে যদি বড় দুর্ঘটনা ঘটে, তবে স্বাধীনভাবে তার তদন্ত হওয়া উচিত। তারা নিয়ম ভেঙেছে কি না, তা সবার সামনে প্রকাশ করতে হবে এবং দরকারে সেই ইয়ার্ডের সনদ বাতিল বা স্থগিত করতে হবে।
বাংলাদেশের এখন কী করা উচিত
স্বাধীন পরিদর্শন টিম গঠন করা অপরিহার্য, যারা বিনা নোটিসে পরিদর্শন করবেন। সরকারের একটি অনলাইন ডেটাবেস থাকা দরকার। সেখানে প্রতিটি ইয়ার্ডের সনদ, পরিদর্শনের তথ্য, নিয়ম ভাঙার ইতিহাস, দুর্ঘটনা, নেওয়া পদক্ষেপ এবং ক্ষতিপূরণের হিসাব থাকবে। বড় দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর পর সনদটি নতুন করে খতিয়ে দেখতে হবে। বারবার নিয়ম ভাঙা ইয়ার্ড শুধু ছোটখাটো জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যেতে পারবে না।
এমটি রাসি জাহাজের ঘটনাটি স্বাধীনভাবে তদন্ত করে পুরো রিপোর্ট প্রকাশ করা প্রয়োজন। শুধু বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি নয়, বরং কোনো কোনো ম্যানেজার, নিয়ামক সংস্থা বা সনদ প্রদানকারীদের ব্যর্থতায় শ্রমিকরা এভাবে মৃত্যুর মুখে পড়ল, তাও স্পষ্ট করতে হবে। যাদের অবহেলা পাওয়া যাবে, তাদের যেন জীবনের মূল্যের সমান শাস্তি ভোগ করতে হয়।
সীতাকুণ্ড এলাকার বাইরে বিশেষ উদ্ধারকারী দল তৈরি রাখা উচিত। ক্ষতিকর গ্যাসে আহতদের চিকিৎসার জন্য এলাকার হাসপাতালগুলোকে তৈরি করতে হবে। জাহাজভাঙার কাজে কিশোর বা শিশু শ্রম একদম বন্ধ করা দরকার। যারা অনিরাপদ কাজ করতে অস্বীকার করবে, তাদের চাকরি সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এমনকি ঠিকাদারের অধীন শ্রমিকসহ সবাই যেন দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও বীমার সুবিধা পায়, তাও নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ কথা
রাসি জাহাজের শ্রমিকদের মৃত্যু থেকে শেখার মতো যদি কোনো একটি বিষয় থাকে, তা হলোÑ‘গ্রিন ইয়ার্ডের’ সনদ স্রেফ কাগজের টুকরো ছাড়া আর কিছুই নয়। হংকং কনভেনশন অবশ্যই একটি শুভ সূচনা, তবে এটি শুধু শুরুর ধাপ মাত্র। সঠিক বর্জ্যের তালিকা, কার্যকর পর্যবেক্ষণ, প্রতিদিনের নিয়ম রক্ষা, শ্রমিকের সত্যিকারের অধিকার আর কঠোর শাস্তি যদি না থাকে, তবে এই কনভেনশনের কোনো দাম নেই।
জাহাজভাঙা শিল্প থেকে বাংলাদেশ অনেক কিছু পাচ্ছে : লোহা, কর্মসংস্থান আর কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুযোগ। কিন্তু কোনোটির জন্যই ব্যবসার স্বার্থে শ্রমিকদের অকালমৃত্যুকে মেনে নেওয়া যায় না। বাংলাদেশকে এখন নিয়মিত ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে।
লেখক: ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব মেরিন সার্ভেয়ার্স ইউএসএর সাবেক সভাপতি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


