পাবনা জেনারেল হাসপাতাল

চার বছরেও শেষ হয়নি হিমঘরের কাজ, লাশ নিয়ে ভোগান্তি

চার বছরেও শেষ হয়নি হিমঘরের কাজ, লাশ নিয়ে ভোগান্তি

প্রায় ৩০ লাখ মানুষের বসবাস পাবনায়। অথচ জেলার প্রধান সরকারি হাসপাতালেই নেই আধুনিক মর্গ ও লাশ সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। ফলে স্বজন হারানোর পরও লাশ নিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

দীর্ঘদিনের দাবির পর পাবনা জেনারেল হাসপাতাল চত্বরে আধুনিক মর্গ ও হিমঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজও শেষ হয়। কিন্তু স্থানীয় কয়েকজনের আপত্তি, আদালতের স্থগিতাদেশ এবং পরবর্তী আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় থেমে গেছে নির্মাণকাজ। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

বিজ্ঞাপন

হাসপাতাল ও গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাবনা জেনারেল হাসপাতাল আঙিনায় আধুনিক মর্গ ও হিমঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ৬ মাস। কাজ শুরুর পর দ্রুতগতিতে এগোতে থাকে নির্মাণকাজ। এক পর্যায়ে ভবনের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়।

তবে ভবনের অবস্থান নিয়ে স্থানীয় কিছু মানুষের আপত্তির কারণে নির্মাণকাজে বাধা সৃষ্টি হয়। বিষয়টি গড়ায় আদালত পর্যন্ত। এরই মধ্যে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্ট ২ মাসের জন্য নির্মাণকাজের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়। এতে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় প্রকল্পের কাজ।

পরে স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হলেও নির্মাণকাজ আর শুরু হয়নি। আইনি জটিলতার পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকে প্রকল্পটি। এভাবে সময় গড়াতে গড়াতে প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদও শেষ হয়ে যায়। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিতব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা এখন কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে। অন্যদিকে আধুনিক মর্গ ও হিমঘরের অভাবে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন জেলার সাধারণ মানুষ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পরও কেন প্রকল্পটি সম্পন্ন করা গেল না। সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও কেন দীর্ঘদিন ধরে একটি জরুরি সেবা চালু করা যাচ্ছে না—এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে জেলাবাসীর মধ্যে।

এদিকে আধুনিক ব্যবস্থার অভাবে অস্বাভাবিক বা অপমৃত্যুর শিকার ব্যক্তিদের লাশ নিয়ে অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন স্বজনরা। জেনারেল হাসপাতালের পরিত্যক্ত মোটরসাইকেল গ্যারেজে সংকীর্ণ কক্ষে চালানো হচ্ছে ময়নাতদন্তের কাজ। এক শয্যার লাশঘরে ধারণক্ষমতা না থাকায় লাশগুলোকে মেঝেতেই ফেলে রাখতে হয়। একটি লাশের ময়নাতদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্য লাশ নিয়ে তীব্র গরমে সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করতে হয় স্বজনদের।

মর্গম্যান দেবচন্দ্র দাস বলেন, হাসপাতাল মর্গে একটির বেশি লাশ পোস্টমর্টেম করা যায় না। একটির ময়নাতদন্ত শেষে আরেকটির কাজ শুরু করতে হয়। আবার অজ্ঞাত লাশের ক্ষেত্রে ভোগান্তি আরো বেশি। কারণ, মর্গে লাশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই।

পাবনা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) জাহিদুল ইসলাম বলেন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা না থাকায় লাশ সংরক্ষণ করা খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, আধুনিক মর্গটি চালু হলে কেবল লাশ সংরক্ষণই নয়, রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য সংগৃহীত আলামতগুলোও নিরাপদ পরিবেশে সংরক্ষণ করা সম্ভব হতো।

তিনি আরো বলেন, এছাড়া একটি আধুনিক মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ডে-লাইট’ বা উপযুক্ত আলোর ব্যবস্থাসহ নানা ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকে। এর ফলে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের যে মূল কাজ, সেটি আরো নিখুঁত ও সহজ হতো।

এ সংকট কেবল স্থানীয় লাশের ক্ষেত্রেই নয়, কোনো প্রবাসী স্বজনের শেষ দেখার আশায় লাশ সংরক্ষণ করা কিংবা কোনো পরিচয়হীন লাশ চেনার জন্য কিছুদিন রেখে দেওয়ার মতো কোনো প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা বর্তমানে পাবনায় নেই। ফলে পরিচয়বিহীন অনেক লাশ চেনার আগেই দ্রুত দাফন করে ফেলতে হচ্ছে। ময়নাতদন্ত ও লাশ সংরক্ষণ নিয়ে এই ঘোর সংকটে পুলিশ প্রশাসনও চরম বিপাকে পড়েছে।

পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ বলেন, আমাদের নিজ ব্যবস্থাপনায় ১১টি থানার মধ্যে ৫টিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ছোট লাশঘর তৈরি করা হয়েছে। তবে যেগুলোতে ২ থেকে ৩টির বেশি লাশ রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে লাশের সংখ্যা বেশি হলে সমস্যায় পড়তে হয়।

প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা এবং নতুন করে টেন্ডার আহ্বানের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে গণপূর্ত অফিসের কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ ব্যাপারে পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে অল্প সময়েই আধুনিক মর্গটি সম্পন্ন করতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন