অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে বিভিন্ন খামার থেকে ৮ লাখের বেশি মৌমাছি চুরি হয়েছে। এসব মৌমাছির মূল্য কয়েক হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাগুলোকে অত্যন্ত পরিকল্পিত ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত চুরি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
অ্যাথারটন টেবিলল্যান্ডস এলাকার মৌচাষি টম বিডনার জানান, তিনজন মৌচাষির কাছ থেকে মোট ৪৪টি মৌমাছির কলোনি চুরি হয়েছে। প্রতিটি মৌচাকে অন্তত ২০ হাজার মৌমাছি থাকায় মোট চুরি হওয়া মৌমাছির সংখ্যা ৮ লাখের বেশি বলে তিনি হিসাব করেছেন।
চোরেরা পুরো মৌচাক নিয়ে যায়নি। তারা মৌচাকের ‘ব্রুড বক্স’ বা যে অংশে মৌমাছির বংশবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় লার্ভা ও ডিম থাকে, সেটি খুলে নিয়ে গেছে। এরপর নিজেদের বাক্সে মৌমাছিগুলো স্থানান্তর করে আবার আগের মতো মৌচাক সাজিয়ে রেখে গেছে। ফলে দূর থেকে দেখলে বোঝার উপায় ছিল না যে সেখানে চুরি হয়েছে।
বিডনারের মতে, এ ধরনের কাজ করতে বিশেষ সরঞ্জাম ও মৌচাষ সম্পর্কে ভালো জ্ঞান প্রয়োজন। চোরেরা মধুও নেয়নি। ফলে মৌচাক বাইরে থেকে প্রায় অক্ষতই দেখা গেছে। তার সন্দেহ, চুরির সঙ্গে মৌচাষ শিল্পের পরিচিত ব্যক্তিরাই জড়িত থাকতে পারেন।
মারিবা গ্রামীণ ও স্টক ক্রাইম স্কোয়াডের গোয়েন্দা সার্জেন্ট বেন ক্রসও মনে করেন, চুরির সঙ্গে কোনো শখের মৌচাষি নয়, বরং বাণিজ্যিকভাবে কাজ করা কেউ জড়িত থাকতে পারে।
এই চুরির কারণে মৌচাষিরা শুধু মৌমাছিই হারাচ্ছেন না, হারাচ্ছেন পরাগায়ন চুক্তি থেকে পাওয়া আয়ও। বর্তমানে উত্তর কুইন্সল্যান্ডে অ্যাভোকাডোর মৌসুম চলছে। এ সময় ফলনের জন্য বিভিন্ন খামারে মৌমাছির বাক্স রাখা হয়। এসব বাক্সের মাধ্যমে মৌমাছি ফসলের পরাগায়নে সহায়তা করে। ফলে মৌমাছি চুরি হলে মৌচাষির পাশাপাশি কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
বিডনার জানান, মৌমাছির বাক্সগুলো বিভিন্ন খামারে চুক্তির ভিত্তিতে রাখা হয়। কিছু বাক্স আবার মহাসড়কের পাশেও রাখা থাকে। অতীতে মৌচাক নিয়ে নড়াচড়ার ঘটনা ঘটলেও এত বড় চুরি তিনি মনে করতে পারছেন না।
এদিকে উত্তর কুইন্সল্যান্ডের মৌচাষ শিল্প আরো একটি বড় সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। সম্প্রতি কেয়ার্নসের দক্ষিণে প্রথমবারের মতো ‘ভারোয়া মাইট’ পরজীবী শনাক্ত হয়েছে। এই পরজীবী মৌমাছির কলোনির জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত।
কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেগান ও’মারা জানান, ২০২২ সালে নিউক্যাসলে পরজীবীটি শনাক্ত হওয়ার পর এর বিস্তার ঠেকাতে ১০ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলারের বেশি ব্যয় হয়েছে। তবে বর্তমানে ব্যবহৃত চিকিৎসাগুলোর কার্যকারিতা সীমিত। পরজীবীটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছড়িয়ে পড়লে আগামী ৩০ বছরে শিল্পটির ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে।
পরজীবীটির বিরুদ্ধে আরো কার্যকর চিকিৎসা তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণা চলছে। সম্ভাব্য চিকিৎসাগুলোর একটি এমআরএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করার চেষ্টা চলছে। তবে সেটি ব্যবহার উপযোগী হতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলে অধ্যাপক ও’মারা জানিয়েছেন।
মৌচাষি টম বিডনারের ভাষায়, মৌমাছি চুরি এবং ভারোয়া মাইট—দুটিই তাদের জন্য বড় চাপ তৈরি করেছে। উত্তর কুইন্সল্যান্ডের উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে সেখানে মৌমাছির প্রজনন সারা বছর চলতে পারে। ফলে পরজীবীটি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেশি। এমন পরিস্থিতিতে মৌমাছির নিরাপত্তা নিয়ে আরো সতর্ক থাকতে হচ্ছে মৌচাষিদের।
চুরি যাওয়া মৌমাছির সন্ধান ও ঘটনার তদন্ত চলছে। তবে এত বড় সংখ্যক মৌমাছি পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট শিল্পে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

