রংপুরে চার খুনের ঘটনায় পুলিশের ভাষ্য

মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় সপরিবারে হত্যা, গ্রেপ্তার ২

মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় সপরিবারে হত্যা, গ্রেপ্তার ২
গণপতি চক্রবর্তী পরিবারকে হত্যায় গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস (বাঁয়ে) ও সিদ্ধার্থ দাস। ছবি: আমার দেশ

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় ওই শিক্ষককে সপরিবারে হত্যা করে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। গতকাল রোববার দুপুরে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ এ তথ্য জানান।

গত শনিবার রাতে মাছুয়াপাড়ার বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১২) লাশ উদ্ধার করা হয়। গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ধর্মীয় শিক্ষক ছিলেন। তার মেয়ে কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী এবং ছেলে রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

বিজ্ঞাপন

মেট্রো কমিশনার আব্দুল মাবুদ এ বিষয়ে বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে খুনিরা নিহতদের বাসার ছাদে মাদক সেবন করছিল। ওই সময় গণপতি চক্রবর্তী টের পেয়ে তাদের নিষেধ করতে গেলে খুনিরা তার গলায় থাকা গামছা দিয়ে ছাদেই হত্যা করে। শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা উপরে আসার চেষ্টা করলে খুনিরা তাকেও গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করে। তার চিৎকার শুনে মেয়ে প্রার্থী এগিয়ে এলে তাকেও গামছা ও রশি পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে নিচে বাসায় ঢুকে খুনিরা গণপতির ছোট ছেলে প্রিয়মকেও গলায় কাপড় পেঁচিয়ে এবং বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, পরে খুনিরা ওই বাসায় গোসল করে। গোসলের পর ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও শসা খায়। ওই টেবিলেই বসে একটি ইয়াবা সেবন করে। পরদিন শুক্রবার হওয়ায় জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকার সুযোগে খুনিরা বাসা থেকে স্বর্ণালংকার লুটে নিয়ে পালিয়ে যায়।

পুলিশের ভাষ্য, হত্যার পর ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখাতে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করা হয় এবং দুটি মোবাইল ফোন পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। পরে বাসা থেকে নেওয়া স্বর্ণালংকারের কিছু অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় গণপতি চক্রবর্তীর ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে প্রকৃত হত্যাকারীদের শনাক্ত করে সঠিক তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা । রংপুর-৩ আসনের জামায়াত এমপি মাহবুবুর রহমান বেলাল ও মহানগর আমির অধ্যক্ষ আযম খান বলেন, আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে। সামান্য মাদক সেবন করে দুই যুবক একটি পরিবারের চারজনকে একে একে হত্যা করবে—এটা মেনে নেওয়ার মতো নয়।

এ বিষয়ে মহানগর বিএনপি আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সামু ও সদস্য সচিব মাহফুজুন নবী ডন বলেন, প্রকৃতপক্ষে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে এসে মানুষের কাছে সঠিক তথ্য উপস্থাপন করতে আমরা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আহ্বান জানিয়েছি। কারণ, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেকে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের পাঁয়তারা করছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের একটি ভেরিফায়েড পেজ ঘটনাটিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছে। বিএনপি ও জামায়াত নেতারা পাল্টা দাবি করেছেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাসুয়াপাড়া এলাকার কয়েকজন আমার দেশকে বলেন, নিহতদের পাশের বাড়িতে কয়েকজন অপরিচিত লোক কয়েকবার আসা-যাওয়া করেছে। এলাকার মানুষ শান্তিপ্রিয় হওয়ায় এ বিষয়গুলো নিয়ে বাড়াবাড়ি করেনি। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের পর তাদের এখানে আনাগোনার উদ্দেশ্য প্রশাসনকে খুঁজে বের করতে হবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাড়িটির আশপাশে দোকান ও মন্দির রয়েছে এবং এলাকায় নিয়মিত পুলিশ টহলও থাকে। এ অবস্থায় এত বড় হত্যাকাণ্ড কীভাবে ঘটল—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার দাবিতে রংপুর জিলা স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন সংগঠন বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন