ইউরোপে তরুণদের চেয়ে আট গুণ বেশি সম্পদ বয়স্কদের

ইউরোপে তরুণদের চেয়ে আট গুণ বেশি সম্পদ বয়স্কদের
ছবি: আলজাজিরা

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাড়িভাড়া, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি সেবায় কাটছাঁটের প্রতিবাদে তরুণদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সেপ্টেম্বরে ফ্রান্সে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ১১টির বেশি ইউরোপীয় দেশে ছড়িয়েছে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেক তরুণ বলছেন, তারা আর আশা করেন না যে তাদের জীবনযাত্রার মান মা-বাবার চেয়ে ভালো হবে। পরিবারের সম্পদের হিসাবেও প্রজন্মের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) ২০২৩ সালের পারিবারিক অর্থ ও ভোগসংক্রান্ত জরিপ অনুযায়ী, ইউরোজোনসহ ইউরোপের আরো দুটি দেশের মধ্যে ৩৫ বছরের কম বয়সি ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন পরিবারের নিট সম্পদের মধ্যম পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার ইউরো (২৭ হাজার ৮৭০ ডলার)। অন্যদিকে, ৫৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সি ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন পরিবারের নিট সম্পদের মধ্যম পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার ইউরো (২ লাখ ৩১ হাজার ৮৮২ ডলার)। অর্থাৎ, বয়স্ক পরিবারের সম্পদ তরুণদের পরিবারের তুলনায় আট গুণেরও বেশি।

আলজাজিরার এক বিশ্লেষণে ইউরোপের ২২টি দেশে বয়সভেদে পরিবারের সম্পদের বণ্টন তুলনা করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০০০ সালের পর থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা বেড়েছে, তা-ও তুলে ধরা হয়েছে।

কোন দেশে সম্পদের ব্যবধান বেশি

ইসিবি ও বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০১০ সাল থেকে পারিবারিক অর্থ ও ভোগসংক্রান্ত জরিপ পরিচালনা করছে। এতে ইউরোজোনের দেশগুলোর পাশাপাশি চেক প্রজাতন্ত্র ও হাঙ্গেরির পরিবারের সম্পদ ও ঋণের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

জরিপে নিট সম্পদ বলতে বাড়ি বা জমি, গাড়ি, মূল্যবান সামগ্রী ও সঞ্চয়ের মোট মূল্য থেকে ঋণ বাদ দেওয়ার পর যে পরিমাণ থাকে, তা বোঝানো হয়েছে।

জরিপে অন্তর্ভুক্ত ২২টি দেশে পরিবারের মোট সম্পদের মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশ রয়েছে ৩৫ বছরের কম বয়সিদের হাতে। বিপরীতে, ৫৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সিদের হাতে রয়েছে পরিবারের মোট সম্পদের ২৪ শতাংশ। বয়সভিত্তিক হিসাবে এই গোষ্ঠীর সম্পদের অংশ সবচেয়ে বেশি।

ফিনল্যান্ডে ৩৫ বছরের কম বয়সিদের হাতে রয়েছে পরিবারের মোট সম্পদের মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। জরিপে থাকা দেশগুলোর মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। দেশটিতে ৫৫ বছরের বেশি বয়সিদের হাতে রয়েছে পরিবারের মোট সম্পদের ৭১ শতাংশের বেশি।

তরুণদের সম্পদের অংশ কম এমন দেশের মধ্যে আরো রয়েছে আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, গ্রিস ও জার্মানি। এসব দেশে ৩৫ বছরের কম বয়সিদের হাতে পরিবারের মোট সম্পদের অংশ যথাক্রমে ১ দশমিক ৪, ১ দশমিক ৬, ১ দশমিক ৮ ও ২ শতাংশ।

বাড়ির দাম ও ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় অনেক তরুণের পক্ষে মা-বাবা বা দাদা-দাদির প্রজন্মের মতো বাড়ি কেনা কিংবা সচ্ছল জীবন গড়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে সম্পদের বণ্টন তুলনামূলকভাবে সমান। লিথুয়ানিয়ায় ৩৫ বছরের কম বয়সিদের হাতে পরিবারের মোট সম্পদের ১৩ দশমিক ২ শতাংশ রয়েছে। ৫৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে এই হার ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ। ক্রোয়েশিয়ায় তরুণদের হাতে রয়েছে ১২ দশমিক ৩ শতাংশ, স্লোভাকিয়ায় ১০ দশমিক ১ শতাংশ এবং এস্তোনিয়ায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের বাইরের দেশগুলোর মধ্যে মাল্টায় তরুণদের হাতে সম্পদের অংশ ১১ দশমিক ১ শতাংশ।

বাড়ির দাম ও ভাড়া বাড়ছে

ইউরোপীয় সামাজিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার কর্মকর্তা এভলিন অ্যাস্টর আলজাজিরার ‘কাউন্টিং দ্য কস্ট’ অনুষ্ঠানে বলেন, বাড়ি ভাড়া নেওয়া এবং কেনা—উভয় ক্ষেত্রেই দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তিনি বলেন, ‘এসব পরিস্থিতি বৈষম্যের অনুভূতিকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। কারণ, সাধারণ পরিবারগুলো বাড়িভাড়া দিতে কিংবা নিজেদের বাড়ি কিনতে হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে, পুঁজি থাকা ধনী ব্যক্তিরা ইউরোপের আবাসন খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে পারছেন।’

২০০০ সালের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা বেড়েছে

২০০০ সালের পর থেকে ইউরোজোন, হাঙ্গেরি ও চেক প্রজাতন্ত্রে খাদ্য, জ্বালানি, পরিবহন এবং গৃহস্থালির বিলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম ৬৭ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্লেষণে থাকা দেশগুলোর মধ্যে হাঙ্গেরিতে দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। সেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম তিন গুণেরও বেশি হয়েছে।

পণ্য ও সেবার দাম পরিমাপের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন সমন্বিত ভোক্তা মূল্যসূচক ব্যবহার করে। ২০০০ সালের দামকে এই সূচকে ১০০ ধরে বিভিন্ন দেশের পরবর্তী সময়ের মূল্যবৃদ্ধির হিসাব করা হয়েছে।

পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে দাম সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২২ সালের পর এ বৃদ্ধি তীব্র হয়েছে। ওই বছর রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করে। পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশ রাশিয়ার জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল।

২০২২ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নে বছরে গড়ে প্রায় ২ শতাংশ হারে দাম বাড়ছিল। কিন্তু ওই বছর বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছায়। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ছিল এ মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ।

পরে মূল্যস্ফীতির হার কমেছে। তবে করোনাভাইরাস মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের সময় যেসব পণ্য ও সেবার দাম বেড়েছিল, সেগুলোর দাম আর আগের পর্যায়ে ফিরে যায়নি।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন