ইতালিতে মজুরি না বাড়া, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিক ও শিক্ষার্থীরা। রাজধানী রোমসহ ৬০টির বেশি শহরে ছড়িয়ে পড়া এ আন্দোলনে কৃষক, ট্যাক্সিচালক, ট্রাকচালক ও আবাসন অধিকারকর্মীরাও যোগ দেন। বিক্ষোভকারীদের দাবি, মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসন খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সামরিক খাতে ব্যয় কমিয়ে জনকল্যাণে অর্থ বরাদ্দের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
শুক্রবার ইতালির তৃণমূল শ্রমিক সংগঠন ইউনিওনে সিনদাকালে দি বেসে (ইউএসবি) ২৪ ঘণ্টার সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়। এর অংশ হিসেবে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। রোববার পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে শুক্রবারের কর্মসূচিতে ব্যাপক অংশগ্রহণ ও কয়েকটি শহরে সংঘর্ষের তথ্য পাওয়া গেছে।
রোমের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষকে পতাকা ও ব্যানার হাতে স্লোগান দিতে দেখা গেছে। তাদের কেউ কেউ ধোঁয়া ছড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। ভিডিওতে এক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘পেট্রলের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। গত ৩০ বছরে আমাদের মজুরি বাড়েনি।’ আরেকজন বলেন, তারা বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চান এবং আগামী নির্বাচনে জয়ী হতে চান।
শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনের কর্মীরাও বিক্ষোভে অংশ নেন। তাদের মূল দাবির মধ্যে ছিল জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, মজুরির ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা, অস্ত্র ও সামরিক খাতে ব্যয় কমানো এবং শিক্ষা ও আবাসন পরিস্থিতির উন্নতি।
বিক্ষোভে অংশগ্রহণের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন হিসাব
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা নিয়ে আয়োজক ও সরকারের হিসাবে বড় পার্থক্য রয়েছে। ইউএসবি জানিয়েছে, তাদের ডাকা কর্মসূচিতে সারা দেশে ১০ লাখ থেকে ১৫ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের সংগঠন ওএসএর দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ লাখ। তবে ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ২ লাখ ৫৫ হাজার।
বার্তা সংস্থা এএনএসএ জানিয়েছে, ৬০টির বেশি শহরে কর্মসূচি পালিত হয়েছে। রোমে প্রায় এক লাখ মানুষ মিছিলে অংশ নিয়েছেন বলে দাবি করেছে ইউএসবি। দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের বড় অংশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও রোম ও তুরিনসহ কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়।
মূল ক্ষোভ মজুরি, মূল্যস্ফীতি ও আবাসনসংকট নিয়ে
বিক্ষোভকারীদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ, ইতালিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও অন্যান্য ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, সে তুলনায় মজুরি বাড়েনি। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে মঁদ জানিয়েছে, ইতালিতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে। গত পাঁচ বছরে একটি সাধারণ সুপারমার্কেটের পণ্যের ঝুড়ির দাম বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়াতে হবে। পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় কমানো এবং পেনশনের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে হবে। ইতালিতে আইনগতভাবে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ না থাকাও বিক্ষোভের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।
আবাসনসংকটও আন্দোলনে বড় জায়গা করে নিয়েছে। রোমে শিক্ষার্থীদের একটি কক্ষের মাসিক ভাড়া ৮০০ থেকে ৯০০ ইউরো পর্যন্ত। মিলানে তা ১ হাজার ২০০ ইউরো পর্যন্ত পৌঁছেছে। এ কারণে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি একাধিক অস্থায়ী কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। রোমের সাপিয়েনজা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কলোসিয়ামের কাছে তাঁবু খাটিয়ে আবাসনসংকটের প্রতিবাদ জানান। তাদের বক্তব্য, উচ্চ ভাড়ার কারণে তরুণদের জন্য পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ও স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে।
শিক্ষা ও সামরিক ব্যয় নিয়েও প্রতিবাদ
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দেশটির অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো দুর্বল, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ অনিরাপদ এবং প্রয়োজনীয় অর্থের অভাব রয়েছে। তাঁদের দাবি, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নত করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে, সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর বিরোধিতা করেছেন শ্রমিক ও শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, অস্ত্র কেনা ও সামরিক প্রস্তুতির পেছনে অর্থ ব্যয় না করে তা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যবহার করা উচিত। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং অস্ত্র পরিবহনে ইতালির বন্দর ব্যবহারের বিরুদ্ধেও বিক্ষোভকারীরা অবস্থান নেন।
এ কর্মসূচির সঙ্গে আন্তর্জাতিক বন্দরশ্রমিকদের ধর্মঘটও যুক্ত ছিল। জেনোয়া বন্দরে প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভকারী সমবেত হন। তারা বন্দর ব্যবহার করে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের বিরোধিতা করেন। ইতালির বাইরেও বিভিন্ন দেশের বন্দরে একই দাবিতে কর্মসূচি পালিত হয়।
রোম ও তুরিনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, আটক আট
বিক্ষোভের বেশির ভাগ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হলেও কয়েকটি শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রোমে কলোসিয়ামের কাছাকাছি বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ মূল মিছিল থেকে বেরিয়ে পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছোড়ে এবং কয়েকটি ময়লার পাত্রে আগুন দেয়। পরে একটি দল পার্লামেন্টের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করায় আটজনকে আটক করা হয়।
তুরিনে প্রিফেকচার ভবনের নিরাপত্তাবেষ্টনীর কাছে বিক্ষোভকারীরা এগিয়ে গেলে পুলিশ জলকামান ও লাঠিচার্জ করে। পরে শহরের কেন্দ্রেও নতুন করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ভেনিসের কাছের মেস্ত্রে শহরে পুলিশের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভাঙার চেষ্টার সময় সাতজন পুলিশ সদস্য আহত হন। ভিসেনজায় সড়ক অবরোধের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ ১০ জন আহত হন বলে জানিয়েছে এএনএসএ।
মিলানে বিক্ষোভকারীরা শহরের রিং রোডে মিছিল করেন। এতে প্রায় দেড় ঘণ্টা যান চলাচল ব্যাহত হয়। তবে আগের সপ্তাহগুলোতে শহরটিতে যে লুটপাট ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল, শুক্রবারের কর্মসূচিতে তেমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
সরকারের নিরাপত্তা জোরদার, জ্বালানি সহায়তার ঘোষণা
বিক্ষোভের আগে ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করে। ২৯ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ানতেদোসি বিভিন্ন অঞ্চলের প্রিফেক্ট, পুলিশপ্রধান ও নিরাপত্তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সম্ভাব্য বিক্ষোভস্থলগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে ১৭ ও ১৮ অক্টোবর মিলানে বিক্ষোভের সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ওই পরিস্থিতির পর প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার জনসমাবেশ ও বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তাব্যবস্থা কঠোর করে। একই সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্কদের আটকসংক্রান্ত বিধিতেও পরিবর্তন আনা হয়। মিলানে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিল সরকার।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত ট্রাকচালক, কৃষক ও জেলেদের জন্য সরকার ১৭ কোটি ৫২ লাখ ইউরোর সহায়তা প্যাকেজ অনুমোদন করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এসব পেশার মানুষের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার। এ ছাড়া ২০২৭ সালের বাজেটের খসড়ায় ৩০ বছরের কম বয়সী কর্মীদের জন্য বছরে ২ হাজার ৫০০ ইউরো সহায়তার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপে বিক্ষোভকারীদের অসন্তোষ কতটা কমবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
প্রধানমন্ত্রী মেলোনি বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, তরুণদের সহায়তায় নেওয়া পদক্ষেপগুলো তাঁদের সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে যারা ভাঙচুর করে, তাদের জন্য এসব ব্যবস্থা নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সব মিলিয়ে শুক্রবারের ধর্মঘট ও বিক্ষোভ ইতালিতে মজুরি, মূল্যস্ফীতি, আবাসন, শিক্ষা এবং সামরিক ব্যয় নিয়ে জমে থাকা অসন্তোষকে সামনে নিয়ে এসেছে। ১ নভেম্বর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে ওই দিনের ধর্মঘট শেষ হলেও আন্দোলনের মূল দাবিগুলোর সমাধান হয়নি। ফলে আগামী দিনগুলোতে শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কোন দিকে যায়, সেদিকে নজর রয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি, দ্য গার্ডিয়ান, পার্সটুডে, রয়টার্স, লে মঁদ, এএনএসএ ও আলজাজিরা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


