ফ্রান্সে আবারও লাখো মানুষের বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ২৯০

ফ্রান্সে আবারও লাখো মানুষের বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ২৯০
ছবি: রয়টার্স

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষাব্যবস্থার পরিস্থিতির প্রতিবাদে ফ্রান্সে আবারও লাখো মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। গতকাল শনিবার রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ সময় প্যারিস ও লিওঁতে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিক্ষোভ ঘিরে সারা দেশে অন্তত ২৯০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। টানা তৃতীয় সপ্তাহান্তে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হলো।

উচ্চবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন সংগঠন এবং শ্রমিক ইউনিয়নের জোটের দাবি, শনিবারের বিক্ষোভে প্রায় ৫ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। তাদের মধ্যে শুধু প্যারিসেই ছিলেন ২ লাখ।

তবে দেশটির কর্তৃপক্ষের হিসাবে, সারা দেশে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২০ হাজার। রাজধানীতে অংশ নেন ৭০ হাজার মানুষ।

প্যারিসে বিক্ষোভ মিছিল শুরুতে শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে শনিবার মূল মিছিল শেষ হওয়ার কথা ছিল এমন একটি স্থানের কাছে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হলে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। এ সময় রাস্তায় থাকা ময়লার পাত্র ও বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেওয়া হয়। শহরের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়।

প্যারিস থেকে আলজাজিরার প্রতিবেদক নাতাশা বাটলার বলেন, ‘আমরা দেখেছি, পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ভিড় লক্ষ্য করে প্রচুর কাঁদানে গ্যাস ছুড়ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। এ কারণে আমাদেরও সেখান থেকে সরে যেতে হয়েছে।’

দাঙ্গা পুলিশ মাইকিং করে বিক্ষোভকারীদের রাস্তা ছেড়ে দিতে বলে। অন্যথায় আরো কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার হুঁশিয়ারি দেয় তারা। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসাকর্মীরা সরিয়ে নেন। এ সময় কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে হাত তুলে দেখান, তারা কোনো ক্ষতি করতে চান না।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, প্যারিসের উপকণ্ঠে কালো পোশাক পরা মুখোশধারী অসংখ্য ব্যক্তি হাতুড়ি দিয়ে ফুটপাতের পাথর তুলে পুলিশের দিকে ছুড়ে মারেন। নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে অন্তত একটি আগুন ধরানো বস্তু ছোড়া হয়। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে এবং লাঠিপেটা করে।

বিক্ষোভ ঘিরে সারা দেশে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনেজ সতর্ক করে বলেন, বিশেষ করে হ্যালোইন উপলক্ষে সন্ধ্যার পর বিশৃঙ্খলা তৈরির ঝুঁকি অনেক বেশি।

শেষ মুহূর্তে আদালতের সঙ্গে আইনি বিরোধের পর প্যারিসের মূল বিক্ষোভ মিছিলের স্থান শহরের পূর্ব প্রান্তে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ছাড়া শঁজেলিজে এলাকার আশপাশে অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কদের রাত ৯টা পর্যন্ত চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।

বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ সরকারের ওপর

আলজাজিরার প্রতিবেদক নাতাশা বাটলার বলেন, বেশির ভাগ বিক্ষোভকারী সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। তবে তাদের অনেকের অভিযোগ, সরকার তাদের কথা শুনছে না।

বাটলার বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যারা বারবার রাস্তায় নেমেছেন, তাদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, তারা আর সরকারকে বিশ্বাস করেন না। সেই আস্থা হারিয়ে গেছে।’

তবে সরকার বলছে, বিক্ষোভকারীদের দাবির প্রতি তারা মনোযোগ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁন লেকর্নু এ সপ্তাহে শিক্ষার্থী ইউনিয়নগুলোর সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা নিয়েও কাজ করছেন তিনি।

গত মাসে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে এ আন্দোলনের শুরু। তাদের অভিযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না, শিক্ষকসংকট রয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্যমূলক। পরে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোও আন্দোলনে যোগ দেয়।

ইউরোপের অন্য দেশেও বিক্ষোভ

গত ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সে বিক্ষোভে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ওই বিক্ষোভ কয়েক বছরের মধ্যে দেশটিতে সবচেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গার রূপ নেয়। প্যারিসে বিভিন্ন দোকানপাটে লুটপাটও চালানো হয়।

ফ্রান্সের বাইরে ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার জার্মানির তরুণেরাও এ আন্দোলনে যোগ দেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষায় সরকারি ব্যয় কমানো এবং বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের পরিকল্পনার প্রতিবাদে দেশটির বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেন।

কোলোন শহরে বড় জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। আয়োজকদের দাবি, জার্মানির ৩০টির বেশি শহরে বিক্ষোভে অংশ নিতে ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষ নাম নিবন্ধন করেছিলেন।

স্পেনের বার্সেলোনায় ২৪ অক্টোবরের দাঙ্গায় প্রায় ১৩০ জনকে গ্রেপ্তারের পর আঞ্চলিক পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বেশির ভাগই অপ্রাপ্তবয়স্ক।

এদিকে ইতালির মিলান, তুরিন ও বোলোনিয়ায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর দেশটির পুলিশও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন