নরসিংদীর মনোহরদীর খিদিরপুর ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. নাজিম উদ্দিন তার শিক্ষকতা জীবনে বদলে দিয়েছেন বহু ছাত্রের জীবনের মোড়। কলেজের শিক্ষার মানোন্নয়নে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এছাড়া খেলাধুলা ও তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছেন। এসব অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন গুণী শিক্ষকের মর্যাদা।
গত ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবসে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে পেয়েছেন সম্মাননা ও পুরস্কার। তার এই অর্জনে জেলার সব শ্রেণি-পেশার মানুষ উচ্ছ্বসিত ও গর্বিত।
নাজিম উদ্দিন ২০২৪ সালে খিদিরপুর ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর নিয়মিত পাঠদান চালু রাখা, খেলাধুলা ও শিক্ষার মান উন্নয়ন, শ্রেণিকক্ষ, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও মনিটরিংয়ের জন্য সিসি ক্যামেরা স্থাপন, কলেজ ক্যাম্পাসে বৃক্ষ রোপণ করে সবুজায়ন করেছেন। এছাড়া কলেজের বেশকিছু জমি অবৈধ দখল থেকে উদ্ধার করেছেন। শিক্ষার্থী-শিক্ষক, অভিভাবক, পরিচালনা কমিটি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে কলেজটির সার্বিক উন্নয়নে কাজ করছেন। উল্লেখ্য, ১৯৮৭ সালে ছয় একর জায়গার ওপর খিদিরপুর মনতলা এলাকার সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান এ এম আনোয়ার হোসেন কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন।
গুণী শিক্ষক নাজিম উদ্দিনের বেশকিছু অর্জন রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ হয়ে খিদিরপুর ডিগ্রি কলেজে এইচএসসিতে মানবিক বিভাগে ভর্তি হতে আসা আল ইমরানকে ভর্তি করেন বিজ্ঞান বিভাগে। এরপর ইমরান জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি উত্তীর্ণ হন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে লেখাপড়া শেষ করে স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকায় পিএইচডি করতে যান। সেখানে থাকাবস্থায় তিনি নাসাতে আবেদন করেন এবং গবেষক হিসেবে যোগদান করেন।
২৮ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তার অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনায় অনেকেই বড় চিকিৎসক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী হয়েছেন।
কলেজের শিক্ষার্থীদের দাবি, নাজিম অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর নিয়মিত পাঠদান, সিসি ক্যামেরায় পর্যবেক্ষণ, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, স্কাউট ও গার্লস গাইড সক্রিয় রাখা এবং কলেজের দেয়াল নির্মাণ ও ভবন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এছাড়া শিক্ষার্থীদের সন্তানের মতো স্নেহ দিয়ে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়তে কাজ করছেন। এজন্য সব শিক্ষার্থীই তাকে শ্রদ্ধা করে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আকরাম হোসেন মানিক ও আব্দুল হক জানান, নাজিম অধ্যক্ষ হিসেবে কলেজে যোগ দেওয়ার পর থেকেই শিক্ষার মানের ওপর জোর দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর কলেজের বেশকিছু জমি অবৈধ দখল মুক্ত করেছেন।
গুণী শিক্ষক নাজিম উদ্দিন বলেন, কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও পরিচালনা পরিষদের সমন্বয়ে কলেজে শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষার পরিবেশ, অবৈধ দখলে থাকা জমি উদ্ধারসহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণেই এই কলেজে গুণী শিক্ষকের সম্মাননা এসেছে। এটা কারো একার নয়, এটা কলেজ কর্তৃপক্ষ, মনোহরদী ও জেলাবাসীর অর্জন। তাই চাকরি জীবনের বাকি সময়ে এই সম্মাননার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে চাই। কলেজের শিক্ষার্থীরা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়ে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারে, সেভাবে তাদের গড়ে তুলতে চাই।
শিক্ষাজীবনে নাজিম ১৯৮১ সালে বীরগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৮৭ সালে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান শাখায় প্রথম বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৮৯ সালে কটিয়াদী ডিগ্রি কলেজ থেকে বিজ্ঞান শাখায় পরীক্ষা দিয়ে এইচএসসিতে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তী সময়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে সম্মানসহ স্নাতকোত্তর শেষ করেন।
১৯৯৮ সালে মনোহরদী বড়চাপা কলেজে গণিতের প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। এই কলেজে কর্মরত থাকাবস্থায় ২০০৪ সালে জাতীয় শিক্ষক দিবস উপলক্ষে মনোহরদী উপজেলায় শ্রেষ্ঠ শিক্ষক (কলেজ পর্যায়) হন। এরপর ২০০৪ সালে তিনি গণিতের প্রভাষক হিসেবে মনোহরদী খিদিরপুর ডিগ্রি কলেজে যোগদান করেন। ২০২৪ সালে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ২০২৫ সালে জাতীয় শিক্ষক দিবস উপলক্ষে মনোহরদী উপজেলায় শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক (কলেজ পর্যায়) নির্বাচিত হন।
এছাড়া তিনি ময়মনসিংহে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে কবিতা প্রতিযোগিতায় প্রথম, উপস্থিত বক্তৃতায় প্রথম এবং বিতর্কে দলগত চ্যাম্পিয়নসহ শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। শুধু তাই নয়, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও শিক্ষা খাতে অবদান রাখায় তিনি অর্জন করেছেন একাধিক পুরস্কার।
নাজিম উদ্দিন ১৯৭১ সালের ১১ জানুয়ারি মনোহরদীর চরমান্দালিয়া মজিন্দপুর গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ফতেহ আলী এবং মায়ের নাম সাহেদা খাতুন। আট ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। পারিবারিক জীবনে তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়ের জনক। তার স্ত্রী রোকসানা আক্তার গৃহিণী।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


