তৃতীয় দিনটাই ছিল আসলে বড় পরীক্ষার। বলা যায়, বাংলাদেশের জন্য ‘মুভিং ডে’। সাধারণ একটা টেস্ট ম্যাচ কোন দিকে যাচ্ছে, খেলার ফল কী হতে যাচ্ছে—এ হিসাব অনুমান করা যায় তৃতীয় দিন শেষে। স্কোরবোর্ড বলছে ডারউইন টেস্টের সেই তৃতীয় দিনটাও বাংলাদেশ নিজেদের করে নিল।
এদিনের তিন সেশনেই জয় বাংলাদেশের। অর্থাৎ প্রথম তিন দিনে মোট ১৫ সেশনের মধ্যে ৯টিই বাংলাদেশের দখলে। পরিসংখ্যানটা শুধু চমকপ্রদ নয়, অস্ট্রেলিয়ার জন্য বেশ অস্বস্তিকরও। নিজেদের মাটিতে কোনো টেস্টের প্রথম তিন দিনেই সবকটি সেশন হারার দুঃসহ অভিজ্ঞতা তাদের খুব বেশি থাকার কথা নয়, হয়তো নেই-ই।
অথচ অস্ট্রেলিয়ার সম্প্রচার এবং মিডিয়াগুলো যেন অন্য এক গল্প। ধারাভাষ্য আর বিশ্লেষণে বাংলাদেশের এই দাপটটাকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। মার্ক ওয়াহর মতো কিংবদন্তিও বলেছেন, অস্ট্রেলিয়ার সমস্যা আসলে অস্ট্রেলিয়া নিজেই। তারা নাকি আত্মঘাতী ক্রিকেট খেলছে।
কিন্তু গল্পের আরেকটা দিকও তো আছে। বিশ্ব টেস্ট র্যাংকিংয়ের ৯ নম্বর দল বাংলাদেশ তিন দিন ধরে এক নম্বর দলকে তাদেরই ঘরের মাঠে টেস্ট ক্রিকেটের দীক্ষা দিচ্ছে। পড়াশোনা করাচ্ছে। এই বাস্তবতাটাও তো স্বীকার করতে হয়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া সেটা এড়িয়ে ‘বটগিরিতে’ নেমেছে যেন!
ওয়ানডে কিংবা টি-টোয়েন্টিতে ভাগ্যের জোরে ম্যাচ জেতা যায়। কখনো কখনো অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে যায়। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে ‘ফ্লুক’ বলে কিছু নেই। কিংবদন্তি ক্রিকেটাররা নিশ্চয়ই সেটা জানেন। হয়তো সত্যিটা মেনে নেওয়ার ব্যাপারটাই একটু কঠিন।
আর এখানেই বাংলাদেশের ২৩ বছরের অপেক্ষার গল্পটা মনে পড়ে যায়। এত বছর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগই পায়নি বাংলাদেশ। ক্রিকেটের সেই অভিজাত মানসিকতা হয়তো এত গভীরে প্রোথিত যে, বাস্তবতার আয়নাটা এখনো তাদের সামনে ঠিকমতো ধরা পড়েনি।
এখনো কেউ কেউ হিসাব কষছেন, পঞ্চম দিনে অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে ফিরবে, বাংলাদেশকে ২৫০ রানের লক্ষ্য দেবে, তারপর জিতে যাবে। অসম্ভব নয়। ক্রিকেটে অসম্ভব বলে কিছু নেই। কিন্তু সম্ভাবনার পাল্লা কি সত্যিই অস্ট্রেলিয়ার দিকে ভারী?
পরিসংখ্যান কিন্তু অন্য কথা বলছে। ২০০ বা তার বেশি রানের প্রথম ইনিংস ঘাটতি পুষিয়ে অস্ট্রেলিয়া টেস্ট জিতেছে মাত্র ৮২ বারের মধ্যে তিনবার। আর টেস্ট ক্রিকেটের পুরো ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটেছে ৮১৪ বারের মধ্যে মাত্র ৯ বার।
ফক্স ক্রিকেটের হিসাবও বাংলাদেশের দিকেই ঝুঁকে আছে। তাদের মতে, বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা ৮৫ শতাংশ। তাহলে অতিথিদের একটু কৃতিত্ব দিলে ক্ষতি কী?
বাংলাদেশেও অনেকে এখনো চোখ কচলাচ্ছেন। সত্যিই কি এটা ঘটছে? নাকি স্বপ্ন দেখছি?
জয়ের আশা করা উচিত কি না? কেউ এই প্রশ্ন করলে আমার উত্তর হলো, অবশ্যই জেতা উচিত। কারণ বাংলাদেশ পেছনের তিন দিনে যে ক্রিকেট খেলছে, সেখানে আবেগের চেয়ে পরিকল্পনার ছাপ বেশি। প্রতিটি সেশন যেন আগে থেকেই আঁকা ছকে এগোচ্ছে। পেশাদার ক্রিকেটের যে ছবি বাংলাদেশ এতদিন শুধু দেখাতে চেয়েছে, ডারউইনে সেটাই যেন বাস্তব হয়ে উঠেছে।
তাই স্বপ্ন দেখতে দোষ কোথায়?
পিচটাও এখন পর্যন্ত দারুণ ভারসাম্য রেখেছে। এটাকে সত্যিকারের টেস্ট ম্যাচের উইকেটই মনে হচ্ছে। ব্যাটসম্যান খেলতে পারছে সহজে, আবার বোলারও সুযোগ পাচ্ছেন। যাকে বলে সমান সমান তেমনই ‘ইভেন’ মনে হচ্ছে ডারউইনের উইকেটকে। জানা ছিল, তৃতীয় দিন থেকে স্পিন বড় ভূমিকা রাখবে। রেখেছেও। মার্নাস লাবুশেন আর স্টিভ স্মিথ, দুজনই স্পিনের শিকার।
চতুর্থ দিনে বাংলাদেশের আক্রমণে স্পিন বৈচিত্র্যই হতে পারে বড় অস্ত্র। মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলামের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লাঞ্চের আগেই যদি অস্ট্রেলিয়া ঘাটতি কমিয়ে ফেলে, তাতেও বাংলাদেশের ঘাবড়ানোর কারণ নেই। ধৈর্য ধরে সঠিক জায়গায় বল ফেলতে পারলে অস্ট্রেলিয়া এমন কোনো স্কোর দাঁড় করাতে পারবে বলে মনে হয় না, যা বাংলাদেশের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
কেউ কেউ তো ইনিংস ব্যবধানে বাংলাদেশের জয়ের কথাও বলছেন। সম্ভাবনাটা ক্ষীণ হলেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই টেস্টে এখন আর কোনো সম্ভাবনাকেই পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না।
চতুর্থ দিনও ডারউইনে থাকবে গরম আর আর্দ্রতা। পুরোনো বল হাতে বাংলাদেশের পেসারদের শুরুটা হতে হবে নিখুঁত। স্টাম্পকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালিয়ে যেতে হবে। ক্যামেরন গ্রিন আর অ্যালেক্স ক্যারি আজ কিছুটা থিতু হওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু স্কোরবোর্ডের চাপ বলে একটা জিনিস আছে। একের পর এক ডট বল জমতে থাকলে ব্যাটসম্যানই একসময় ভুল শট খেলবেন।
বাংলাদেশকে তাই বদলানোর দরকার নেই। প্রথম তিন দিন যেভাবে শৃঙ্খলা আর ধৈর্য নিয়ে খেলেছে, সেটাই ধরে রাখতে হবে।
এই বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রে বাংলাদেশ একটা বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে। তারা এবার আর শুধু অংশ নিতে আসেনি। তারা সিরিয়াস। আর সেই সিরিয়াসনেসের সবচেয়ে বড় প্রতিচ্ছবি নাজমুল হোসেন শান্ত। প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে অধিনায়ক হিসেবে তার পরিণতিও যেন চোখে পড়ার মতো বাড়ছে।
ডারউইনে বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত জিতে যায়, তাহলে ম্যাকেতে দ্বিতীয় টেস্ট ঘিরে যে আরো জমজমাট লড়াই অপেক্ষা করছে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে সে গল্প আরেক দিনের।
চতুর্থ দিন কি আর কোনো অস্ট্রেলীয় ব্যাটসম্যান ট্রাভিস হেডের মতো বোল্ড হওয়ার পর ভেঙে পড়া বেলস তুলে ফের স্ট্যাম্প সাজিয়ে ফিরবেন? নাকি এবার অন্য গল্প হবে?
জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে। টেস্ট ক্রিকেট এমনই। এখানে প্রতিটি দিন নতুন নাটক। প্রতিটি সেশন নতুন দৃশ্য। মাঠ যেন মঞ্চ, আনন্দের!
লেখক : অস্ট্রেলীয় প্রবাসী ক্রিকেট বিশ্লেষক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


