দ্য ইকোনোমিস্টের সাম্প্রতিক প্রচ্ছদে ‘দ্য ট্রুথ অ্যান্ড দ্য লাইস অ্যাবাউট ইসলাম ইন ইউরোপ’ নিবন্ধের সমালোচনা করে আয়ান হিরসি আলি লিখেছেন ‘দ্য লাই অ্যাবাউট ইসলাম’। ইউরোপে ইসলাম ও ইসলামিজম নিয়ে আলোচনায় ‘ইউরোপে ইসলাম সম্পর্কে সত্য ও মিথ্যা’ নিবন্ধে যে ভারসাম্য দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে, সেটি বাস্তব পরিস্থিতিকে যথাযথভাবে তুলে ধরে না। কারণ দ্য ইকোনোমিস্ট ইসলামিজম এবং ইউরোপীয় উগ্র ডানপন্থাকে দুটি সমান্তরাল বা প্রায় সমান ধরনের চরমপন্থা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। হিরসি আলি এই তুলনাকে প্রত্যাখ্যান করে বলছেন, দুই পক্ষের প্রকৃতি, ঐতিহাসিক ভিত্তি ও সাংগঠনিক কাঠামো এক নয়।
দ্য ইকোনোমিস্টের অনুসন্ধানের মূল কাঠামো ছিল—একদিকে অল্পসংখ্যক ইসলামপন্থি চরমপন্থি, অন্যদিকে অল্পসংখ্যক উগ্র ডানপন্থি; আর মাঝখানে রয়েছে বিপুলসংখ্যক শান্তিপ্রিয় মুসলমান ও ইউরোপীয় নাগরিক। দ্য ইকোনোমিস্ট মনে করে, দায়িত্বশীল অবস্থান হলো উভয় প্রান্তের চরমপন্থাকে প্রত্যাখ্যান করা এবং কোনো গোষ্ঠীর কয়েকজন সদস্যের কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো সম্প্রদায়কে দায়ী না করা।
হিরসি আলির আপত্তি এখানেই। তার প্রশ্ন, সত্যিই যদি দুই পক্ষকে একই ধরনের হুমকি হিসেবে তুলনা করা হয়, তাহলে ইউরোপীয় উগ্র ডানপন্থার কি ইসলামি ঐতিহ্যের সমপর্যায়ের কোনো ধর্মীয় ও মতাদর্শিক কাঠামো রয়েছে? তার উত্তর—নেই। তার যুক্তি অনুযায়ী, ইসলামের রয়েছে কুরআন, হাদিস, ইসলামী আইনশাস্ত্র, ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এবং প্রায় দেড় হাজার বছরের একটি বিস্তৃত বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য। তিনি বিশেষভাবে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম এবং সুন্নি ইসলামের চারটি ফিকহি মাজহাবের কথা উল্লেখ করেছেন। বিপরীতে ইউরোপীয় উগ্র ডানপন্থার রয়েছে বিভিন্ন ম্যানিফেস্টো, অনলাইন মিম, বিচ্ছিন্ন লেখক ও মতাদর্শিক গোষ্ঠী—কিন্তু তার কোনো সমতুল্য ধর্মগ্রন্থ বা সুসংহত ঐতিহাসিক ধর্মীয় কাঠামো নেই।
এই পার্থক্য দেখিয়ে হিরসি আলি বলতে চান, ইসলাম এবং ইউরোপীয় উগ্র ডানপন্থাকে শুধু “দুটি চরম প্রান্ত” হিসেবে পাশাপাশি বসালে ইসলামিজমের প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আড়াল হয়ে যায়। তার মতে, ইসলাম একটি ধর্ম; আর ইসলামিজম হলো সেই ধর্মীয় ঐতিহ্যের নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও মতাদর্শ। তাই ইসলাম, মুসলমান এবং ইসলামিজম—এই তিনটি বিষয়কে একই অর্থে ব্যবহার করা যেমন ভুল, তেমনি ইসলামিজমের রাজনৈতিক প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা না করে কেবল ইসলামভীতিকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখাও সমস্যাজনক।
হিরসি আলির যুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি মনে করেন ইউরোপের অভিজাত রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে ইসলাম সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট ধরনের আত্মতুষ্টি তৈরি হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘বহুত্ববাদ’, ‘অন্তর্ভুক্তি’ এবং ‘সহনশীলতা’—এসব ইতিবাচক মূল্যবোধের আড়ালে অনেক সময় এমন কিছু পার্থক্যকে আড়াল করা হয়, যেগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। তার মতে, কোনো মতাদর্শের সমালোচনা করাকে একটি পুরো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দেখলে প্রকৃত সমস্যাটি বিশ্লেষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। হিরসি আলির বক্তব্য দ্য ইকোনোমিস্ট–এর প্রতিবেদনের একটি সমালোচনামূলক অবস্থান; এটি কোনো নিরপেক্ষ ঐকমত্যের বিবৃতি নয়। দ্য ইকোনোমিস্ট যেখানে ইসলামকে ইউরোপের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখার প্রবণতার বিরোধিতা করছে এবং ইসলামিজম ও ইসলামভীতিকে পৃথক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করছে, হিরসি আলি বলছেন—এই তুলনা ইসলামিজমের ঐতিহাসিক ও মতাদর্শিক ভিত্তির গুরুত্বকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। ফলে দুই লেখার মধ্যে মূল বিরোধটি অনেকাংশে ইসলাম, ইসলামিজম, মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং ইউরোপীয় উগ্র ডানপন্থার সম্পর্ক কীভাবে বিশ্লেষণ করা হবে, তা নিয়ে।
আয়ান হিরসি আলির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও তার যুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি। হুভার ইনস্টিটিউশন–এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি সোমালিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন, সৌদি আরব, ইথিওপিয়া ও কেনিয়ায় বেড়ে ওঠেন, পরে নেদারল্যান্ডসে আশ্রয় পান এবং ডাচ পার্লামেন্টের সদস্য হন। ইসলামি উগ্রপন্থার সমালোচনার কারণে তিনি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েন। চলচ্চিত্র নির্মাতা থিও ভ্যান গঘের সঙ্গে কাজ করার পর ২০০৪ সালে ভ্যান গঘ একজন ইসলামপন্থি চরমপন্থির হাতে নিহত হন এবং হিরসি আলিকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি হুভার ইনস্টিটিউশনের রিসার্চ ফেলো।
দুই লেখার মূল বিরোধ সহজভাবে বললে, দ্য ইকোনোমিস্ট বলছে—ইসলামকে ইসলামিজমের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়; ইউরোপে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে উগ্রপন্থিদের কর্মকাণ্ড দিয়ে বিচার করা উচিত নয়; একই সঙ্গে ইসলামিজম ও ইসলামভীতিকে মোকাবিলা করতে হবে। অন্যদিকে হিরসি আলি বলছেন—ইসলামিজমকে ইউরোপীয় উগ্র ডানপন্থার সমান্তরাল একটি ছোট চরমপন্থি সমস্যা হিসেবে দেখলে এর ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও মতাদর্শিক ভিত্তি যথাযথভাবে বোঝা হবে না। তার আপত্তি মূলত দ্য ইকোনোমিস্ট–এর ‘দুটি সমান চরম প্রান্তের মাঝখানে শান্তিপূর্ণ মধ্যপন্থা’—এই কাঠামোর বিরুদ্ধে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুই লেখাই ‘ইসলাম’ ও ‘ইসলামিজম’-কে আলাদা করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে, কিন্তু তাদের বিশ্লেষণের কেন্দ্র আলাদা। দ্য ইকোনোমিস্ট মূলত ইউরোপীয় মুসলমানদের সামাজিক অবস্থান ও ইসলামভীতি নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন; হিরসি আলি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ইসলামিজমের মতাদর্শিক ভিত্তি, এর ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এবং ইউরোপের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে।
সূত্র: দ্য ফ্রি প্রেস ও দ্য ইকোনমিস্ট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


