সীতাকুণ্ড পৌর ভবনের দাপ্তরিক কক্ষেই প্রায় এক যুগ ধরে বসবাস করছেন পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. নজরুল ইসলাম। অফিসকক্ষ আবাসিক হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি নিজেই স্বীকার করেছেন তিনি। তার দাবি, ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য নয়, রাতের বেলায় পৌর ভবন পাহারা দেওয়ার প্রয়োজনেই সেখানে থাকেন।
তবে সরকারি ভবনের দাপ্তরিক কক্ষ দীর্ঘদিন আবাসিক হিসেবে ব্যবহার, একই কর্মস্থলে বছরের পর বছর অবস্থান, বদলি আদেশের পরও সীতাকুণ্ডে থাকার অভিযোগ এবং গত জুন-জুলাই দুই মাসে পৌরসভার বিদ্যুৎ বিল ৪ লাখ টাকার বেশি হওয়ায় সরকারি সম্পদ ও জনগণের অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নজরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, দীর্ঘ বছর ধরে পৌরসভার অফিসে আমি বসবাস করে আসছি, এটা ঠিক। তবে আমি নাইট গার্ডের মতো পৌরসভাকে পাহারা দিয়ে রেখেছি। বিদ্যুৎ বিল প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, ৪ লাখ টাকার বেশি বিল শুধু পৌর ভবনের নয়, এর মধ্যে ৯টি ওয়ার্ডের সড়কবাতির বিলও রয়েছে। পৌরসভায় কার্ড মিটার না থাকায় বিদ্যুৎ বিভাগ গড় হিসাবের ভিত্তিতে বিল করে এবং দুই মাসের বিল একসঙ্গে হওয়ায় মোট অঙ্ক ৪ লাখ টাকার বেশি হয়েছে।
তবে বিলের অঙ্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ৪ লাখ টাকার বেশি বিলের মধ্যে পৌর ভবনের বিদ্যুৎ ব্যয় কত এবং ৯টি ওয়ার্ডের সড়কবাতির ব্যয় কত, তার খাতভিত্তিক হিসাব প্রকাশ হয়নি। দাপ্তরিক কক্ষ আবাসিক হিসেবে ব্যবহারের কারণে এসি, ফ্যান, আলোসহ ব্যক্তিগত ব্যবহারের বিদ্যুৎ খরচ সরকারি মিটারে যুক্ত হয়ে থাকলে সেই ব্যয় কোন খাতে পরিশোধ করা হয়েছে, সেটিও স্পষ্ট নয়। প্রকৃত মিটার রিডিং, বিদ্যুৎ বিভাগের বিল প্রস্তুতের হিসাব এবং পৌরসভার অর্থ পরিশোধের নথি যাচাই করা হলে এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সীতাকুণ্ড পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর শামসুল আলম আজাদ আমার দেশকে বলেন, ২০০৮ সালে পৌরসভায় যোগদানের পর বিভিন্ন সময়ে বদলি হলেও নজরুল ইসলাম আবার সীতাকুণ্ডে ফিরে আসেন এবং ২০১৫ সাল থেকে প্রায় একটানা এখানে কর্মরত রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভার দাপ্তরিক কক্ষকে বসতবাড়ির মতো ব্যবহার করছেন ওই কর্মকর্তা।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের ২১ মে ২০২৪ সালের একটি আদেশে নজরুল ইসলামকে সীতাকুণ্ড থেকে গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভায় বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সেখানে যোগ না দিয়ে তিনি সীতাকুণ্ডে অবস্থান করেন। তবে ওই আদেশ পরবর্তী সময়ে স্থগিত, বাতিল বা সংশোধন হয়েছিল কি না, তা সরকারি নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
পৌরসভার প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। পৌরসভার যুবদল নেতা জিয়া উদ্দিন জিয়া আমার দেশকে বলেন, পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম ও নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুন্নবীর মধ্যে দায়িত্ব ও ক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডা. কমল কদর আমার দেশকে বলেন, একজন কর্মকর্তা কীভাবে বছরের পর বছর একই কর্মস্থলে থাকেন এবং বদলি আদেশের পরও সেখানে অবস্থান করেন, তা তদন্ত করা দরকার।
দাপ্তরিক কক্ষ আবাসিক ব্যবহারের অনুমোদন ছিল কি না, ব্যক্তিগত ব্যবহারের বিদ্যুৎ ব্যয় পৌরসভার তহবিল থেকে পরিশোধ হয়েছে কি না এবং দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার পেছনে কোনো প্রশাসনিক প্রভাব বা আর্থিক সুবিধা ছিল কিনা, এসব বিষয় খতিয়ে দেখা উচিত।
এদিকে নতুন বদলি আদেশে মো. নজরুল ইসলামকে নরসিংদীর শিবপুর পৌরসভায় পদায়ন করা হয়েছে। আদেশ অনুযায়ী ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সেখানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে যোগদান না করলে ২ সেপ্টেম্বর থেকে স্ট্যান্ড রিলিজ হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ব্যক্তি বা রাজনৈতিক বিরোধের বাইরে গিয়ে সরকারি নথির ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্ত করা হোক। জুন-জুলাইয়ের বিদ্যুৎ বিল, মিটার রিডিং, বিদ্যুৎ বিভাগের বিল প্রস্তুতের হিসাব, পৌরসভার অর্থ পরিশোধের ভাউচার, পৌর ভবনের বিদ্যুৎ ব্যবহারের খাতভিত্তিক হিসাব, দাপ্তরিক কক্ষ আবাসিক ব্যবহারের অনুমোদন এবং ২০২৪ সালের বদলি আদেশের পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যাচাই করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, পৌর ভবন জনগণের অর্থে পরিচালিত সরকারি প্রতিষ্ঠান। তাই সরকারি ভবন ও অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগ সত্য হলে দায় নির্ধারণ এবং অভিযোগ অসত্য হলে তা পরিষ্কার, উভয় ক্ষেত্রেই নথিভিত্তিক নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


