স্পেনে এক বছরে দুই ট্রেন দুর্ঘটনা, নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি বেঁচে ফেরা যাত্রীদের

স্পেনে এক বছরে দুই ট্রেন দুর্ঘটনা, নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি বেঁচে ফেরা যাত্রীদের
এটি ইউরোপের অন্যতম ভয়াবহ রেল বিপর্যয়। ছবি: রয়টার্স

স্পেনে এক বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে দুটি ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১১৫ জনের। এর আগে ২০১৩ সালে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ৮০ জন। একের পর এক দুর্ঘটনার পর রেলপথের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণে আরো বিনিয়োগের দাবি জানিয়েছেন দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা যাত্রী ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নতুন রেললাইন নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো লাইন ও সংকেতব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্ব দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

বুধবার মধ্য স্পেনের টলেডোর কাছে উর্দা শহরের পাশে দুটি ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৬৯ জন নিহত হন। এর মাত্র ১০ মাস আগে, গত জানুয়ারিতে দক্ষিণ স্পেনের কর্দোবার কাছে আদামুজ এলাকায় একই রেলপথে দুটি ট্রেনের সংঘর্ষে প্রাণ হারান ৪৬ জন। আর ১৩ বছর আগে, ২০১৩ সালে উত্তর-পশ্চিম স্পেনের সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলার কাছে আংরোইসে দ্রুতগতির একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে ৮০ জন নিহত হয়েছিলেন। সেটিই স্পেনের সবচেয়ে প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনা।

আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির তিনটি ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা যাত্রীরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি ঠেকাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

২০১৩ সালের আংরোইস দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া ক্রিস্টোবাল গনজালেজ বলেন, ‘আমি বেঁচে গেছি, কিন্তু এত বছর পরও সেই মানসিক ক্ষত রয়ে গেছে। আমাদের আরো দুর্ঘটনা বন্ধ করতে হবে।’

ওই দুর্ঘটনায় গনজালেজের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লেগেছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার গতিতে চলার কথা ছিল ট্রেনটির। কিন্তু সেটি ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার গতিতে চলতে গিয়ে লাইনচ্যুত হয়। দুর্ঘটনায় ৮০ জন নিহত হন।

আলজাজিরাকে গনজালেজ বলেন, ‘এখন আমরা আংরোইস, আদামুজ ও উর্দায় তিনটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা দেখলাম। ব্যবস্থা না নিলে এমন দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে।’

তিনি বলেন, আংরোইসে চালক অতিরিক্ত গতিতে ট্রেন চালাচ্ছিলেন। আদামুজ দুর্ঘটনার তদন্তে রেললাইনে ত্রুটি পাওয়া গেছে। আর উর্দার দুর্ঘটনার পেছনে মানুষের ভুল এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সমস্যার ভূমিকা থাকতে পারে। কারণ যা-ই হোক, নিরাপত্তায় আরো বিনিয়োগ করে এসব দুর্ঘটনা বন্ধ করতে হবে।

আংরোইস দুর্ঘটনার সময় এক বন্ধুর সঙ্গে সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলা যাচ্ছিলেন গনজালেজ। তিনি ছিলেন ট্রেনটির সামনের বগিতে। দুর্ঘটনার সময় ট্রেনটি লাইন থেকে ছিটকে গিয়ে একটি ঢালে আছড়ে পড়ে। অন্য যাত্রীদের শেষ মুহূর্তে সাহায্য করার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি ট্রেনের ভেতরেই ছিলেন।

সেই দিনের ঘটনা নিয়ে এখনো কথা বলতে কষ্ট হয় তার। মানসিক আঘাতজনিত সমস্যায় ভুগছেন তিনি। গনজালেজ বলেন, ‘যা ঘটেছিল, তা নিজের মধ্যেই রেখে দেব। এ বিষয়ে কথা বলা খুব কঠিন। বলতে চাইলেও পারব কি না জানি না। ঘটনাটি কল্পনারও বাইরে।’

‘বিশ্বাস করতে পারছি না, আবারও এমন ঘটনা ঘটল’

চলতি বছরের জানুয়ারিতে আদামুজ দুর্ঘটনার সময় রেনফে পরিচালিত ট্রেনটির যাত্রী ছিলেন সান্তিয়াগো রোসেন্দো। দুর্ঘটনার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ট্রেনের যাত্রীদের মধ্যে তখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।

আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘প্রথমে হঠাৎ করেই ট্রেনটি থেমে যায়। এরপর প্রচণ্ড শব্দে সংঘর্ষ হয়। ট্রেনটি এদিক-ওদিক দুলতে থাকে। একপর্যায়ে কাত হয়ে পড়ে। চারদিকে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার।’

রোসেন্দো জানান, দুর্ঘটনার পর ট্রেন থেকে নেমে প্রথমেই তিনি একটি লাশ দেখতে পান। ওই রাতে তিনি একাই মাদ্রিদ থেকে দক্ষিণ স্পেনের হুয়েলভা যাচ্ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘একই রেলপথে আবারও এমন ঘটনা ঘটেছে, এটা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। আমাদের কিছু একটা করতেই হবে।’

আদামুজ দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছে, রেললাইনের একটি অংশ ভেঙে যাওয়ায় একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি ট্রেনের সামনে চলে আসে। এতে দুটি ট্রেনের সংঘর্ষ হয়।

চলতি বছরের এসব দুর্ঘটনার পর বিশেষজ্ঞরা রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।

ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত স্পেন প্রতিবছর উচ্চগতির রেলপথে গড়ে প্রায় ১৬৭ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। একই ধরনের রেল নেটওয়ার্ক থাকা ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় এই ব্যয় বেশি। তবে এই অর্থের মাত্র ১৬ শতাংশ ব্যয় হয়েছে রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতে। বাকি অর্থ ব্যয় হয়েছে অবকাঠামো নির্মাণে।

অন্যদিকে ইতালি, জার্মানি ও ফ্রান্স তাদের রেল নেটওয়ার্কের রক্ষণাবেক্ষণে মোট বাজেটের গড়ে ৩৩ থেকে ৩৯ শতাংশ ব্যয় করেছে। অথচ এসব দেশের প্রতিটির উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক স্পেনের ৪ হাজার কিলোমিটারের নেটওয়ার্কের চেয়ে ছোট।

রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ

স্প্যানিশ অ্যাসোসিয়েশন অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্সের মুখপাত্র হোসে মারিয়া গোইকোলেয়া আলজাজিরাকে বলেন, রেল নেটওয়ার্কের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয়ও বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, ‘১৯৮২ সালে যখন প্রথম রেলপথ চালু হয়েছিল, তখন নেটওয়ার্কটি ছিল খুব ছোট। এখন এটি অনেক বড় হয়েছে এবং ব্যবহারও বেড়েছে। পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুধু নতুন রেললাইন নির্মাণের দিকে নজর দিলে চলবে না, রক্ষণাবেক্ষণেও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।’

২০২৪ সালে স্পেনের উচ্চগতির ট্রেনে প্রায় ৪ কোটি মানুষ যাতায়াত করেছেন। ২০১৯ সালের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্কে যাত্রী ছিলেন প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ। তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যাত্রীর সংখ্যা ১৪ শতাংশ কমেছে।

এ বছর দুটি দুর্ঘটনাই ঘটেছে মাদ্রিদ-সেভিয়া রেলপথে। স্পেনের রেল নেটওয়ার্কে এই একমাত্র পথটিতে জার্মানিতে তৈরি ১৯৭০-এর দশকের এলজেডবি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে এই প্রযুক্তি ধাপে ধাপে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে।

গোইকোলেয়া মনে করেন, এলজেডবি ব্যবস্থা পুরোপুরি সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত মাদ্রিদ-সেভিয়া রেলপথটি বন্ধ রাখা উচিত।

তিনি বলেন, ‘আমি মাদ্রিদ-সেভিয়া রেলপথটি বন্ধ রাখার পক্ষে, যতক্ষণ না এলজেডবি ব্যবস্থা সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। বুধবারের দুর্ঘটনার জন্য ব্যবস্থাটি আংশিকভাবে দায়ী ছিল। এটি কাজ করেনি। তবে মনে হচ্ছে, মানুষের ভুলও দুর্ঘটনার আরেকটি কারণ। অবশ্য এ সিদ্ধান্ত রাজনীতিবিদদের, আমার নয়।’

গোইকোলেয়া আরো বলেন, জানুয়ারির দুর্ঘটনার কারণ ছিল রেলপথের ত্রুটি।

কাতালোনিয়ার পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ রামিরো আউপিন লোপেরা বলেন, ২০১১ সাল থেকে অর্থনৈতিক সংকটের পর স্পেনের উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্কের রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগ হাস্যকর পর্যায়ে কমে গেছে।

তিনি আলজাজিরাকে বলেন, ‘একদিকে রেল নেটওয়ার্কের ব্যবহার বেড়েছে, অন্যদিকে রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগ কমেছে। এক বছরেরও কম সময়ে দুটি দুর্ঘটনা ঘটেছে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। রাজনীতিবিদদের বিজ্ঞান ও অবকাঠামো সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা এসবের প্রতি অবহেলা থেকে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।’

স্পেনের রাষ্ট্রীয় রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রেনফে ছাড়াও দেশটিতে দুটি বেসরকারি রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলো হলো ফ্রান্সের ওউইগো এবং ইতালির একটি ব্যবসায়ী জোটের অংশ ইরিও। প্রতিষ্ঠান দুটি মাদ্রিদ-সেভিয়া রেলপথের এলজেডবি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।

গত বছর স্পেনের ওউইগোর তৎকালীন পরিচালক হেলেন ভেনেজুয়েলা দেশটির রেডিও ক্যাদেনা সেরকে বলেছিলেন, ‘মাদ্রিদ-সেভিয়া রেলপথে এলজেডবির মতো পুরোনো ব্যবস্থা রয়েছে। বিষয়টি অনেকটা সাদাকালো পর্দায় নেটফ্লিক্স দেখার মতো। আমরা নেটফ্লিক্স, অথচ এই ব্যবস্থা এখনো সাদাকালোতেই আটকে আছে।’

এদিকে সর্বশেষ দুর্ঘটনার জন্য রেলকর্মীদের দায়ী করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন স্পেনের ট্রেনচালকদের ইউনিয়ন সেমাফের কর্মকর্তা দিয়েগো মার্তিন। তিনি বলেন, ‘দোষারোপ করে দুর্ঘটনা ঠেকানো যায় না। দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করা এবং তা নির্ধারণ করাই পারে এমন ঘটনা প্রতিরোধ করতে।’

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন