পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু একজন মুখ্যমন্ত্রী নন, তিনি এক দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীক। কলেজ স্ট্রিটের রাজপথ থেকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলন, ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো সব মিলিয়ে ‘দিদি’ থেকে ‘অগ্নিকন্যা’ হয়ে ওঠার গল্প ভারতীয় রাজনীতিতে এক অনন্য অধ্যায়। কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনি বাস্তবতা সেই শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। টানা তিন দফা ক্ষমতায় থাকার পর পশ্চিমবঙ্গে এখন প্রশ্ন মমতার জনপ্রিয়তার ভিত্তি কেন দুর্বল হয়ে পড়ছে, নাকি বিজেপির উত্থানই বদলে দিচ্ছে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল সংগ্রাম দিয়ে। অল্প বয়সে বাবার মৃত্যু, পারিবারিক কষ্ট, ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ এসবই তাকে লড়াকু চরিত্রে গড়ে তোলে। কংগ্রেসের রাজনীতি থেকে উঠে এসে তিনি ধীরে ধীরে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেন। ১৯৯৭ সালে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে একক লড়াই শুরু করেন। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলনের নেতৃত্ব তাকে সাধারণ মানুষের কাছে প্রতিবাদের মুখে পরিণত করে। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসেন এবং বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটান।
ক্ষমতায় এসে মমতা সরকার একাধিক জনমুখী প্রকল্প চালু করে, যার মধ্যে কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভান্ডারসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে নারী ভোটব্যাংক ও গ্রামীণ জনসমর্থন ধরে রাখতে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার সঙ্গে সঙ্গে শাসনবিরোধী মনোভাবও বাড়তে থাকে। সাধারণ মানুষের একাংশের অভিযোগ দলীয় প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং দুর্নীতি তৃণমূলের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, কয়লা পাচার, গরু পাচারসহ একাধিক অভিযোগ বিরোধীদের হাতে বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে। পার্থ চ্যাটার্জিকে ঘিরে বিপুল নগদ অর্থ উদ্ধারের ঘটনা তৃণমূল সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে। বিজেপি এসব ইস্যুকে ধারাবাহিকভাবে জনমনে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় যে, তৃণমূলের বিকল্প হিসেবে তারাই সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান আকস্মিক নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের ফল। বুথভিত্তিক সংগঠন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সক্রিয়তা, আগ্রাসী প্রচারণা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যকর ব্যবহার সব মিলিয়ে বিজেপি ধীরে ধীরে রাজ্যে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে। নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তা, ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’-এর প্রতিশ্রুতি এবং উন্নয়নের বার্তা বিজেপিকে নতুন ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
একই সঙ্গে ধর্মীয় ও পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিও বড় ভূমিকা রাখে। বিজেপি তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘সংখ্যালঘু তোষণ’-এর অভিযোগ তুলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটকে একত্র করার চেষ্টা চালায়। এই মেরুকরণ রাজ্যের নির্বাচনি সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করে। অন্যদিকে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, প্রভাবশালী নেতাদের দলত্যাগ এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনীতিতে কখনোই সহজে হার মানা নেতা হিসেবে দেখা হয়নি। রাজপথের আন্দোলন থেকে প্রশাসনের শীর্ষে ওঠা এই নেত্রী বরাবরই সংকটে লড়াই করে টিকে থেকেছেন। তাই ফলাফলের প্রবণতা প্রতিকূলে গেলেও তিনি শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছিলেন। গণনাকেন্দ্র ছাড়তে নিষেধ করে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, রাজনৈতিকভাবে তিনি এখনও পরাজয় মেনে নিতে প্রস্তুত নন।
২০২৬ সালের এই নির্বাচন তাই শুধু ক্ষমতার পালাবদলের সম্ভাবনা নয়; এটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বেরও পরীক্ষা। একদিকে মমতার ব্যক্তিগত সংগ্রাম, জনসংযোগ ও কল্যাণমূলক রাজনীতি; অন্যদিকে বিজেপির সংগঠিত বিস্তার, দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণা এবং বিকল্প শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা বরাবরই পরিবর্তনের বার্তা দিতে দ্বিধা করেননি বামফ্রন্ট থেকে তৃণমূল, আর এখন তৃণমূল বনাম বিজেপির দ্বৈরথ সেই ধারারই নতুন সংস্করণ। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, এখানে কোনো শক্তিই চিরস্থায়ী নয়; শেষ কথা বলে জনমতই।
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



পশ্চিমবঙ্গে যেই ক্ষমতায় আসুক সম্পর্কে প্রভাব পড়বে না: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ঐতিহাসিক উত্থান