সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের মূলধারার গণমাধ্যম বা টেলিভিশন সংবাদ মাধ্যমগুলো এক অভূতপূর্ব আস্থার সংকটে পড়েছে। এককালে যা ছিল মানুষের দৈনন্দিন খবরের অন্যতম প্রধান উৎস, আজ তা ক্রমশ তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। পক্ষপাতদুষ্ট খবর পরিবেশন, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতি নির্লজ্জ আনুগত্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনের আসল সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার কারণে মূলধারার এই মিডিয়াকে সাধারণ মানুষ ‘গোদি মিডিয়া’ বলে আখ্যা দিতে শুরু করেছেন। এর ফলস্বরূপ, একদিকে যেমন টেলিভিশন চ্যানেলের দর্শকসংখ্যা বা টিআরপি হু হু করে কমছে, অন্যদিকে তেমনি গণমাধ্যমগুলোতে শুরু হয়েছে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই।
সংবাদমাধ্যমগুলো এখন আর শুধু খবর পরিবেশনের মাধ্যম নয়, বরং তা করপোরেট স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ খবরের বিকল্প উৎস হিসেবে ইউটিউব চ্যানেল এবং সোশ্যাল মিডিয়ার উপর অনেক বেশি নির্ভর করতে শুরু করেছেন, যেখানে স্বাধীন সাংবাদিকরা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি নিরপেক্ষ ও সাহসী খবর পরিবেশন করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে আসা বিভিন্ন প্রবীণ ও কর্মরত সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা এই ভয়াবহ পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। উদাহরণস্বরূপ, শুভ মৈত্র নামক এক প্রবীণ সাংবাদিকের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায় যে, ২৪ ঘণ্টার নিউজ চ্যানেলগুলো বর্তমানে কার্যত ‘ভেন্টিলেশনে’ চলে গেছে। কনটেন্টের মান তলানিতে ঠেকায় এবং সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে আসায় দেশের মিডিয়ার র্যাংকিং বিশ্ব সূচকে ১৫৭-এর মতো হতাশাজনক জায়গায় নেমে গেছে। যা প্রতিবেশী পাকিস্তান ও বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ।
মানুষ এখন আর শুধু টিভির স্ক্রিনের আকর্ষণে খবর দেখেন না। তারা খোঁজেন আসল কনটেন্ট বা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ। করপোরেট মিডিয়া মালিকরা কেবল লাভের অংক বোঝেন। যখনই বিজ্ঞাপনের আয় কমে যায়, তখন সবার আগে কোপ পড়ে সাধারণ সাংবাদিকদের চাকরির ওপর।
লেখক-সাংবাদিক গৌতম বসুমল্লিক উল্লেখ করেছেন যে, কীভাবে করপোরেট মালিকের নির্দেশে রাস্তায় নেমে খবর করা সাংবাদিকরা হঠাৎ করে একদিন অফিসে গিয়ে জানতে পারেন তাদের চাকরি নেই। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই গণহারে চাকরি যাওয়ার প্রতিবাদে কোনো মিছিল বা আন্দোলনও চোখে পড়ে না, যা সাংবাদিকদের চরম অসহায়ত্বকেই প্রমাণ করে।
এই ছাঁটাইয়ের চিত্রটি কতটা ভয়াবহ, তা সম্প্রতি কলকাতার একটি প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমের ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়। একটি সোশ্যাল মিডিয়া আপডেটের তথ্য অনুযায়ী, মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন চ্যানেল ‘নিউজ ১৮ বাংলা’-তে সম্প্রতি ২৮ জন সংবাদকর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। রিপোর্টিং, ডেস্ক, ক্যামেরাম্যান, গ্রাফিক্স ডিজাইনার থেকে শুরু করে ডিজিটাল বিভাগের কর্মীরা এই ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। এই কর্মীরা মূলত মিডল-টায়ার বা মধ্যম সারির ছিলেন, যাদের বেতন ছিল ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে। আর্থিক পুনর্গঠনের অজুহাত দেখিয়ে এই সাধারণ কর্মীদের চাকরি কেড়ে নেওয়া হলেও টিভি নাইন থেকে বিপুল বেতনে দুজন নতুন অ্যাঙ্করকে নিয়ে আসা হয়েছে। একই সঙ্গে চ্যানেলের সম্পাদকীয় নীতিতেও এসেছে রাতারাতি পরিবর্তন।
দীর্ঘদিন ধরে চ্যানেলের দায়িত্বে থাকা শীর্ষ কর্মকর্তা, যিনি রাজ্যের শাসকদলের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন বলে পরিচিত, তিনি ইস্তফা দেওয়ার পর দিল্লি থেকে আসা নতুন চ্যানেল প্রধান পুরোপুরি বিপরীত রাজনৈতিক মেরুর পক্ষে চ্যানেলের অবস্থান ঘুরিয়ে দিয়েছেন। একই উপস্থাপক যারা এতদিন এক দলের পক্ষে কথা বলতেন, তারা হঠাৎ করে তীব্র স্বরে অন্য দলের হয়ে কথা বলায় দর্শকরাও বিভ্রান্ত হচ্ছেন। ফলস্বরূপ, নিজস্ব দর্শক হারাচ্ছে চ্যানেলটি এবং টিআরপি গিয়ে ঠেকেছে তলানিতে।
এই পরিস্থিতি কেবল একটি নির্দিষ্ট চ্যানেলের নয়, বরং সমগ্র মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান অবস্থার প্রতিচ্ছবি। একদিকে মালিকপক্ষের রাজনৈতিক স্বার্থ এবং অন্যদিকে করপোরেট লাভের হিসাব—এই দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন সাধারণ সাংবাদিকরা।
সাংবাদিকতা একসময় শুধু রোজগারের মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল একটি প্যাশন এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। কিন্তু বর্তমানে সেই জায়গাটি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। করপোরেট মিডিয়া যখন সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প খুঁজছেন। ডিজিটাল মিডিয়া, বিশেষ করে ইউটিউব চ্যানেলগুলো এখন সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে। স্বাধীন সাংবাদিকরা সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছেন, যেখানে কোনো করপোরেট সেন্সরশিপ নেই। পরিসংখ্যান ও বর্তমান প্রবণতা এটাই নির্দেশ করে যে, মূলধারার গণমাধ্যম যদি দ্রুত তাদের কনটেন্ট এবং নিরপেক্ষতায় গুরুত্ব না দেয়, তবে আগামী দিনে টেলিভিশন সাংবাদিকতার অস্তিত্ব আরো বড় সংকটের মুখে পড়বে এবং ইউটিউব ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোই খবরের প্রধান এবং নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে নিজেদের পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত করে ফেলবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

