ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যে ইসলামি পারিবারিক আইন সুরক্ষার দাবিতে রাজ্যজুড়ে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান শুরু করেছে মুসলিম সংগঠনগুলো। বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত ধর্মীয় বিধানের পরিবর্তে সব সম্প্রদায়ের জন্য অভিন্ন আইনি কাঠামো চালুর সরকারি উদ্যোগের বিরোধিতা করে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
সুন্নি জমিয়ত উলামা ও রাজা অ্যাকাডেমির উদ্যোগে গত শুক্রবার মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন মসজিদে এই অভিযান শুরু হয়। এতে অংশ নিয়ে ধর্মীয় আলেম ও মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতারা প্রস্তাবিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) বাতিলের দাবিতে গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক পন্থায় প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
মুম্বাই ছাড়াও মালেগাঁও, নাসিক, জলনা ও ভিওয়ান্ডিসহ রাজ্যের বিভিন্ন শহরে এ কর্মসূচি ছড়িয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় মসজিদ কমিটি ও স্বেচ্ছাসেবকেরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহের পাশাপাশি প্রস্তাবিত আইনের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করছেন।
আয়োজকেরা জানিয়েছেন, আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলবে। তবে সরকারের পরামর্শ গ্রহণ ও মতামত সংগ্রহের প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে অভিযানের সময়সীমা বাড়ানো হতে পারে।
শুক্রবারের জুমার খুতবায় আলেমরা প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তাঁদের আশঙ্কা, ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইন পরিবর্তন করে অভিন্ন আইনি কাঠামো চালু করা হলে ইসলামি পারিবারিক রীতি ও ধর্মীয় অনুশাসন পালনের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হতে পারে।
মুসলিম সংগঠনগুলোর দাবি, এ ধরনের আইন ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক সুরক্ষাকে দুর্বল করতে পারে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ে ইসলামি বিধান অনুসরণের অধিকারও সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজা অ্যাকাডেমির প্রধান মুহাম্মদ সাঈদ নুরি মহারাষ্ট্র সরকারের সম্ভাব্য আইনটিতে আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য ছাড় রাখার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, আদিবাসীদের ক্ষেত্রে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রয়োগ না করে অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর তা চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য কী, সরকারের কাছে সেই ব্যাখ্যা চাওয়া প্রয়োজন।
নুরি বলেন, কোনো সম্প্রদায়ের নিজস্ব রীতিনীতি ও ঐতিহ্য রক্ষার জন্য যদি আইনে ছাড় দেওয়া প্রয়োজন হয়, তাহলে অন্য সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিধান ও ব্যক্তিগত আইন সুরক্ষার ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যবস্থা থাকা উচিত।
এদিকে প্রস্তাবিত আইন নিয়ে নিজেদের অবস্থান সমন্বয় করতে মুম্বাইয়ের ইসলাম জিমখানায় বৈঠক করেছেন কয়েকটি মুসলিম সংগঠনের প্রতিনিধিরা। মহারাষ্ট্র মুসলিম ফেডারেশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে জামায়াতে ইসলামী, জমিয়ত উলামা ও অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর মালিক মোতাসিম বলেন, কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত ধর্মীয় নির্দেশনা ইসলামি বিশ্বাসের অপরিহার্য অংশ। এসব বিধান পরিবর্তন করার সুযোগ নেই।
অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মাওলানা মাহমুদ খান দারিয়াবাদি ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় ভারতের সংবিধানের বিভিন্ন বিধানের কথা তুলে ধরেন। তাঁর আশঙ্কা, প্রস্তাবিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হলে সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত ধর্মীয় অধিকার সীমিত হতে পারে।
বৈঠকে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি সমন্বয় এবং সরকারের কাছে মুসলিম সম্প্রদায়ের উদ্বেগ তুলে ধরতে ১৫ থেকে ২০ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
এদিকে মহারাষ্ট্র সরকার প্রস্তাবিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে জনমত জানতে ৩৭টি প্রশ্নসংবলিত একটি প্রশ্নমালা প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে। মুসলিম সংগঠনগুলো সম্প্রদায়ের সদস্যদের এই পরামর্শ গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে নিজেদের মতামত জানানোর আহ্বান জানিয়েছে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন সংগঠন ডিজিটাল ফরম ও তথ্যসংবলিত প্রচারপত্র বিতরণ করছে।
আয়োজকেরা জানিয়েছেন, স্বাক্ষর সংগ্রহ শেষ হলে সেগুলো সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে। ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা এবং ইসলামি ব্যক্তিগত আইন বহাল রাখার দাবিতে তাদের এই উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
সূত্র: মুসলিম নেটওয়ার্ক টিভি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


