মোদির ‘বিশ্ব একটি পরিবার’ ধারণার বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

মোদির ‘বিশ্ব একটি পরিবার’ ধারণার বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

‘সমগ্র বিশ্ব একটি পরিবার’—ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্রিকস সম্মেলনে সংস্কৃত প্রবাদ ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর মাধ্যমে যে ধারণা তুলে ধরেছেন, সেটিই আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতায় কতটা কার্যকর—এই প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্বকে যদি সত্যিই একটি পরিবার হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বিরোধ মেটানোর সবচেয়ে পরিণত পথ হলো দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও সমঝোতা।

দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে মোদি ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ ধারণাটি সামনে এনেছেন। এর অর্থ—‘বিশ্ব একটি পরিবার’। তবে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রাচীন কোনো বাণী উদ্ধৃত করা সহজ হলেও সেই দর্শনকে বাস্তব রাষ্ট্রীয় আচরণে প্রয়োগ করা অনেক বেশি কঠিন।

বিজ্ঞাপন

ব্রিকস সম্মেলন বিশ্বকে একটি পরিবারের মতো পরিচালনার কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধ, সংঘাত ও অবিশ্বাসের কারণে এই ধারণা বাস্তবায়ন এখনো অনেক দূরের বিষয়। একই সঙ্গে ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির কিছু অবস্থানের সঙ্গে ‘বিশ্ব একটি পরিবার’ ধারণার সামঞ্জস্য নেই।

ব্রিকস সম্মেলনে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। ভারত যদি বিশ্বকে একটি পরিবার হিসেবে দেখে, তাহলে প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ মেটাতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বসাই পরিণত রাষ্ট্রীয় আচরণ। দুই দেশের সমস্যা দুই পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নিলে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও সেটিকে স্বাগত জানাবে।

ব্রিকসের আগের সম্মেলনের সঙ্গে দিল্লি সম্মেলনের তুলনা করা যায়। ২০১৭ সালে চীনের শিয়ামেন সম্মেলনে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছিল। এবারের সম্মেলনে সেই ধরনের সরাসরি অবস্থানের পরিবর্তে ঐকমত্য ধরে রাখার চেষ্টা বেশি দেখা গেছে। এটিকে ব্রিকসের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখেছেন।

‘বিশ্ব একটি পরিবার’ ধারণাটি তখনই অর্থবহ হয়, যখন কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের আগ্রাসন বা দমননীতির সঙ্গে অবস্থান না নিয়ে মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক অবস্থান গ্রহণ করে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও গণপিটুনির মতো ঘটনাও বন্ধ করা হয়। মানবিক মর্যাদা ও সমতার বিষয়টি ‘বিশ্ব পরিবার’ ধারণার অপরিহার্য অংশ।

ব্রিকস সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিকসের উচিত শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা নেওয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতের শুধু উপসর্গ নয়, মূল কারণ মোকাবিলা করা। পশ্চিম এশিয়ায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ।

পশ্চিম এশিয়ায় দ্রুত যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা এবং ফিলিস্তিন সংকটের স্থায়ী সমাধানে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের দিকে এগোনোর প্রয়োজনীয়তার কথাও শি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এ ধরনের অবস্থান ব্রিকসকে শুধু অর্থনৈতিক জোট হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে।

‘বিশ্ব একটি পরিবার’ ধারণার সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘উবুন্টু’ দর্শনেরও তুলনা করেছেন লেখক। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী ব্যবস্থা বিলুপ্তির সময় নেলসন ম্যান্ডেলা ও ডেসমন্ড টুটু ‘উবুন্টু’—‘আমি আছি, কারণ আমরা আছি’—এই দর্শনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এর মধ্যেও মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতা, সমতা ও সম্মানের একই ধারণা রয়েছে।

বাইবেল ও ভারতীয় উপনিষদের মানবিক ঐক্যের ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন ধর্ম ও সভ্যতার ঐতিহ্যে মানবজাতিকে বৃহত্তর একতার অংশ হিসেবে দেখার ধারণা রয়েছে। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে জাতি, ধর্ম, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সেই আদর্শকে বারবার দুর্বল করে।

বিশ্বকে সত্যিকার অর্থে একটি পরিবারে পরিণত করতে হলে শুধু সম্মেলনের মঞ্চে ঐক্যের কথা বললেই হবে না; রাষ্ট্রগুলোর আচরণেও তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ থাকলে শক্তি প্রদর্শনের বদলে আলোচনা, সংঘাতের বদলে সমঝোতা এবং আধিপত্যের বদলে সমতার নীতি অনুসরণ করতে হবে।

বিশ্ব যদি সত্যিই একটি পরিবার হয়, তাহলে পরিবারে বিভক্তি দূর করার প্রথম শর্ত হলো একে অপরের সঙ্গে কথা বলা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর বিরোধ দ্বিপক্ষীয় সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করাই পরিণত ও দায়িত্বশীল পথ। একই সঙ্গে ব্রিকসের মতো জোটগুলোকে বৈশ্বিক সংঘাতের মূল কারণ মোকাবিলা করে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আরো সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন