ভেনেজুয়েলার তেলে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা যুক্তরাষ্ট্রের

ভেনেজুয়েলার তেলে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা যুক্তরাষ্ট্রের

তেলই গত এক শতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্কের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। সহযোগিতা থেকে বিরোধ, জাতীয়করণ থেকে নিষেধাজ্ঞা—দুই দেশের সম্পর্কের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে তেলের স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নতুন চুক্তি সেই পুরোনো সম্পর্কেরই নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে ।

এক ভিজ্যুয়াল বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১৯৫০ সালের মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি নথিতেই ভেনেজুয়েলার তেলের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছিল। ওই নথিতে বলা হয়েছিল, ভেনেজুয়েলা থেকে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব নীতির ওপর কোনো না কোনোভাবে প্রভাব ফেলে।

বিজ্ঞাপন

ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দেশটি মিত্রবাহিনীর যুদ্ধবিমান, জাহাজ ও ট্যাংকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী ছিল। পরবর্তী কয়েক দশকেও ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় ছিল এবং মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলো দেশটির তেলশিল্পে বড় ধরনের ব্যবসা করত।

পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন আসে ১৯৯৯ সালে হুগো শাভেজ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর। সমাজতান্ত্রিক ও মার্কিনবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত শাভেজ চীন, রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পে বিদেশি কোম্পানির ভূমিকা কমিয়ে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে থাকেন।

২০০৭ সালে শাভেজ তেলক্ষেত্রগুলোতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেন। বিদেশি কোম্পানিগুলোকে সংখ্যালঘু অংশীদার হিসেবে থাকার সুযোগ দেওয়া হলেও রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়। মার্কিন কোম্পানি শেভরন এই শর্ত মেনে ভেনেজুয়েলায় কার্যক্রম চালিয়ে যায়। কিন্তু এক্সনমোবিল ও কনোকোফিলিপস নতুন শর্ত প্রত্যাখ্যান করে দেশটির তেল খাত থেকে বেরিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ক্ষতিপূরণ নিয়ে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে তারা দীর্ঘ আইনি লড়াইও চালায়।

শাভেজের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় আসেন। তিনি শাভেজের নীতিই অনেকাংশে অব্যাহত রাখেন এবং রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং তার সরকারকে অগণতান্ত্রিক ও অবৈধ বলে সমালোচনা করতে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি-অর্থনৈতিক সংকট দেশটির অর্থনীতিকে আরো দুর্বল করে। এ সময় ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির বড় অংশ চীনের দিকে চলে যায়। চীন ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে তেল নেওয়ার পাশাপাশি অতীতে দেওয়া ঋণের অর্থও তেলের মাধ্যমে ফেরত পেত।

এরপর দুই দেশের সম্পর্ক আরো তীব্র সংঘাতের দিকে যায়। যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ তোলে এবং তার বিরুদ্ধে ৫ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে। তবে বিশেষজ্ঞরা মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

২০২৬ সালের শুরুতে পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী কারাকাসে অভিযান চালিয়ে মাদুরোকে আটক করে। এরপর ডেলসি রদ্রিগেজ ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার সরকার সহযোগিতার পথ বেছে নেয়।

এরপর গত আগস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের ওপর বড় ধরনের মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চুক্তির ঘোষণা দেন। চুক্তির আওতায় ৬৫০০ কোটি ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত তেলসম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। হোয়াইট হাউস এটিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং বলেছে, এর মাধ্যমে আগামী এক শতকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি আধিপত্য নিশ্চিত হবে।

তবে চুক্তিটি নিয়ে ভেনেজুয়েলায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দেশটির অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিসকো রদ্রিগেজ চুক্তিটিকে ‘শোষণমূলক’ বলে সমালোচনা করেছেন। এটি এমন এক চুক্তি, যা ভেনেজুয়েলার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সমান অবস্থান থেকে করা হয়নি। একইভাবে বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোও বলেছেন, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ভেনেজুয়েলার জনগণের, কোনো অনির্বাচিত সরকারের নয়।

অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসন চুক্তিটিকে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি পুনর্গঠন, তেল উৎপাদন বাড়ানো এবং দেশটিতে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পথ তৈরির উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরছে। ওয়াশিংটনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো চীন ও রাশিয়ার প্রভাব কমানো এবং ভেনেজুয়েলার তেল খাতে মার্কিন প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

ফলে গত এক শতকের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলা সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার ফিরে এসেছে একই বিষয়—তেল। একসময় সহযোগিতার ভিত্তি ছিল যে তেল, পরে সেটিই দুই দেশের বিরোধের অন্যতম প্রধান কারণ হয়েছে। আর বর্তমান তেলচুক্তি সেই পুরোনো সম্পর্ককে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন