জোড়া এনকাউন্টার ঘিরে বিতর্কের ঝড়

উত্তরপ্রদেশ ও আসামের মডেলে কি ‘এনকাউন্টার রাজ্য’ হয়ে উঠছে পশ্চিমবঙ্গ

উত্তরপ্রদেশ ও আসামের মডেলে কি ‘এনকাউন্টার রাজ্য’ হয়ে উঠছে পশ্চিমবঙ্গ

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গে অপরাধ দমনের নামে কি উত্তরপ্রদেশ বা আসামের ‘এনকাউন্টার’ মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে? মঙ্গলবার একই দিনে উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা এবং মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে পুলিশের গুলিতে দুই অভিযুক্তের মৃত্যুর পর এই প্রশ্নই এখন রাজ্য রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরাধীদের শায়েস্তা করার নামে এই জোড়া এনকাউন্টারের পর প্রশ্ন উঠছে, এটি কি নিছকই পুলিশের আত্মরক্ষা, নাকি বিচার ব্যবস্থাকে এড়িয়ে সরাসরি অভিযুক্তকে নিকেশ করার কোনো সাজানো চিত্রনাট্য? বিশেষ করে ধুলিয়ানে এক সংখ্যালঘু যুবকের মৃত্যুর পর পুলিশি অভিযানের স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন খোদ স্থানীয় বাসিন্দারাই।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার ভোররাতে গাইঘাটায় এবং ভরদুপুরে ধুলিয়ানে ঘটা দুটি এনকাউন্টারের মধ্যে এমন কিছু আশ্চর্য মিল রয়েছে, যা দেখে অনেকেই চমকে উঠেছেন। দুটি ঘটনাই যেন একে অপরের হুবহু ‘রি-মেক’। উভয় ক্ষেত্রেই পুলিশ হেফাজতে থাকা অভিযুক্তকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য নির্জন অকুস্থলে যায় পুলিশ। উভয় ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন এবং ঠিক তিন রাউন্ড করে গুলি চালান। আর শেষে আত্মরক্ষার যুক্তিতে পুলিশের পাল্টা গুলিতে দুই অভিযুক্তেরই মৃত্যু হয়। সাড়ে তিন মাস আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে ১১ বছরের এক নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের এনকাউন্টারের সঙ্গেও এই জোড়া ঘটনার অদ্ভুত মিল পাচ্ছেন অনেকে। যদিও পুলিশের দাবি, আগ্নেয়াস্ত্র ছিনতাইয়ের পর প্রভাস মাত্র এক রাউন্ড গুলি ছোড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানের ঘটনাটি রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক দিক থেকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। গত ২৮ আগস্ট সামশেরগঞ্জের পুরাতন ডাকবাংলা এলাকার বাসিন্দা, ব্যবসায়ী তথা বিজেপি কর্মী সুজিত মণ্ডল নিখোঁজ হন এবং পরে তার খণ্ডবিখণ্ড লাশ উদ্ধার হয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অতীতে ধুলিয়ানে হরগোবিন্দ দাস এবং চন্দন দাস হত্যাকাণ্ডের তুলনা টেনে জানিয়েছিলেন, পশুর মাংস কাটার ছুরি দিয়ে সুজিতকে খুন করা হয়েছে। এই খুনে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে সামাউল শেখ, তাজকিরা বিবি এবং জনি শেখকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সামাউল ও তাজকিরা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ধুলিয়ানে একটি ভাড়াবাড়িতে থাকতেন। মঙ্গলবার দুপুরে সামাউলকে নিয়ে খুনের ঘটনাস্থলে পুনর্নির্মাণে যায় রাজ্য সিআইডি। পুলিশের দাবি, সেখানে সামাউল এক পুলিশের রিভলভার ছিনিয়ে পরপর তিন রাউন্ড গুলি চালান, যার প্রতিটিই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এরপর তিনি রিভলভার উঁচিয়ে জেলা পুলিশের ডিএসপি-কে তাক করলে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাঁচাতে এক ইনস্পেক্টর সামাউলের মাথায় সরাসরি গুলি করেন। জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পুলিশের এই তত্ত্বের পাল্টা দাবি করেছেন স্থানীয়রা। সামাউলের ভাড়াবাড়ি থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরের অকুস্থল ভুটু মার্কেটের বাসিন্দার দাবি, ভরদুপুরে ঘটনাটি ঘটলেও তারা কোনো গুলির শব্দই শুনতে পাননি।

উল্লেখ্য, সুজিত খুনে পুলিশের বিরুদ্ধে কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগ তুলেছিলেন নিহতের স্ত্রী সুমনা মণ্ডল। মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এরপর ধুলিয়ান টিওপি-র ইনচার্জ ও সামশেরগঞ্জ থানার সেকেন্ড অফিসারকে সাসপেন্ড করা হয় এবং জঙ্গিপুরের এসপি-সহ একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তাকে শাস্তির মুখে পড়তে হয়।

অন্যদিকে, গাইঘাটার ঘটনাটিও কম চাঞ্চল্যকর নয়। গত শনিবার গাইঘাটা থানা এলাকার বাসিন্দা ১৭ বছরের এক কিশোরী রাতে জলসা দেখতে গিয়ে নিখোঁজ হয় এবং রোববার সকালে তার বিবস্ত্র, ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার হয়। ধর্ষণের পর খুনের অভিযোগে পুলিশ ওই পরিবারেরই আত্মীয় প্রহ্লাদ দাসকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের দাবি, মঙ্গলবার ভোররাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণ শেষে ফেরার পথে বৈদ্যবাড়ি এলাকার কাছে প্রহ্লাদ প্রস্রাব করার নাম করে গাড়ি থামাতে বলেন। এরপরই তিনি কর্তব্যরত এক পুলিশকর্মীর বন্দুক ছিনিয়ে তিন রাউন্ড গুলি চালান, যার একটি পুলিশের গাড়িতে লাগে এবং এক পুলিশকর্মী জখম হন। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ চার রাউন্ড পাল্টা গুলি চালালে প্রহ্লাদের মৃত্যু হয়। তবে প্রহ্লাদের পরিবারের দাবি, রাত দুটোর সময় পুলিশ তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল।

এই জোড়া এনকাউন্টারের পর রাজ্য সরকারের অবস্থান অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়েছেন, নতুন সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে অপরাধীরা ছাড় পাবে না। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে তিনি পুলিশকে নারী নির্যাতন ও নেশামুক্তির বিষয়ে পরিস্থিতি বুঝে ‘অন স্পট’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ‘খোলা ছুট’ দিয়েছেন এবং পুলিশকর্মীদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ যোগী আদিত্যনাথ বা হিমন্ত বিশ্বশর্মার সুরেই বলেছেন, মানুষের মনে ভরসা ফেরাতে পুলিশকে কিছু ‘অপ্রিয় কাজ’ করতে হবে। রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে অপরাধীদের মনে ভয় ধরানো জরুরি বলে তিনি মনে করেন। রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও বারুইপুর এনকাউন্টারের পর অপরাধীদের কড়া বার্তা দিয়েছিলেন। আরজি কর হাসপাতালে নিহত চিকিৎসকের মা তথা বর্তমান বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথ এই এনকাউন্টারকে একশ ভাগ সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, যারা মেয়েদের ভোগ্যপণ্য ভাবে তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। তবে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ‘এনকাউন্টার’ শব্দটি ব্যবহারে আপত্তি তুলে জানিয়েছেন, এটি শর্টকাট ন্যায়বিচার নয়, বরং পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতায় প্রাণ বাঁচাতে পুলিশের গুলি চালানোর ঘটনা।

সরকারের এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে বিরোধী শিবির। কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী প্রশ্ন তুলেছেন, রাজ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে মানুষের কি বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা চলে গেল? তিনি কটাক্ষ করে বলেন, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের যদি নিজেদের কোমরে রিভলভার রাখার ট্রেনিং না থাকে, তবে তারা কেমন পুলিশ? তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় মনে করিয়ে দিয়েছেন, দেশে আইন আছে এবং এনকাউন্টার করে হয়তো কেবল প্রচারই পাওয়া যায়। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম এই ঘটনাগুলিকে সস্তা ‘সোপ অপেরা এপিসোড’ বলে তোপ দেগেছেন, যা দিয়ে আদতে অপরাধ কমানো সম্ভব নয়। মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর-এর নেতা রঞ্জিত শূরও গভীর রাতে হাত খোলা অবস্থায় এক অভিযুক্তকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণে যাওয়ার পুলিশের এই তত্ত্ব নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। সব মিলিয়ে, গাইঘাটা এবং ধুলিয়ানের জোড়া মৃত্যু পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ও বিচারবিভাগীয় কাঠামোর ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন