আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে উৎকণ্ঠায় ভারতীয় কৃষক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে উৎকণ্ঠায় ভারতীয় কৃষক

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তির জন্য অন্তর্বর্তীকালীন কাঠামো প্রকাশ করা হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় কমবে ভারতের ওপর ট্রাম্পের আরোপ করা অতিরিক্ত শুল্ক। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার পথ আরো প্রশস্ত করার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্গঠিত হবে।

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের চাপের মুখে তাদের কৃষিপণ্য নিজেদের বাজারে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে ভারত। এতে ভারত কিছু কৃষিপণ্যের ওপর বাণিজ্য বাধা কমাতে সম্মত হয়েছে, যা কৃষক ও বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

ওয়াশিংটনের কৃষিপণ্য ভারতের বাজারে প্রবেশের সিদ্ধান্তে কারা লাভবান হবে আর কারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।

এ চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চ প্রোটিন-সমৃদ্ধ পশুখাদ্য, ভুট্টা এবং অন্যান্য শস্য থেকে তৈরি ইথানলের উপজাত আমদানির অনুমতি দেবে ভারত, যা দেশি বাজারে উদ্বৃত্ত তৈরি করবে। আমদানিকৃত পশুখাদ্য ভারতের প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের পোলট্রি খাতকে বেশ উপকৃত করবে। বর্তমানে যেখানে পশুখাদ্যের খরচ মোট উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ, সেখানে এই খরচ অনেকটাই কমিয়ে আনবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও কৃষিপণ্য আমদানি বৃদ্ধি পেলে ভারতের তেলবীজ প্রক্রিয়াজাতকারী এবং সয়াবিন চাষিরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। কারণ, ভারতের বাজারে ইতোমধ্যেই এই পশুখাদ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে, ফলে সয়ামিলের মতো তেলবীজের চাহিদা কমছে। আর চাহিদা কমায় তেলবীজের দামও কমেছে। কৃষকরা এখনই সয়াবিন ও চীনাবাদাম ছেড়ে ভুট্টা ও চাল আবাদের দিকে ঝুঁকছে। যদিও দেশি কৃষকদের তেলবীজের আবাদ বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দিচ্ছে মোদি সরকার।

ডিস্ট্রিলার ড্রাইড গ্রেন উইথ সলিবলস বা ডিডিভির সরবরাহ আরো বৃদ্ধি পেলে বিপাকে পড়বে ভারতের ইথানল উৎপাদনকারীরা। কারণ, জৈব জ্বালানির ব্যবহার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। ফলে দেশি বাজারে ইথানলের চাহিদাও কমেছে।

এদিকে শুধু পশুখাদ্যই নয়, আমেরিকা থেকে শুল্কমুক্ত আমদানির তালিকায় রয়েছে সয়াতেলও। আর এই সয়াতেল আমদানি নিয়ে ভারতে কিছু উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাণিজ্য চুক্তির অন্তর্বর্তী কাঠামোতে শুধু শুল্কহার কোটার অধীনেই শুল্কমুক্ত সয়াতেল আমদানি করা হবে। এর অর্থ হলো, কোটার বেশি পরিমাণে সয়াতেল স্ট্যান্ডার্ড শুল্কের সম্মুখীন হবে, যা দেশি উৎপাদকদের সুরক্ষার জন্য নেওয়া একটি পদক্ষেপ।

শুল্কমুক্ত আমদানির তালিকায় থাকছে তুলা, যার প্রভাব পড়বে ভারতীয় কৃষি খাতে। ভারত বর্তমানে তুলা আমদানির ওপর ১১ শতাংশ শুল্কারোপ করেছে। এ অবস্থায় বিশ্বের বৃহত্তম তুলা রপ্তানিকারক দেশ হয়েও নিজ দেশে শুল্কমুক্ত তুলা আমদানির অনুমতি দিলে তা দেশি বাজারে তুলার দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে স্থানীয় বাজারে দাম কমবে এই কৃষিপণ্যটির।

তবে এর প্রভাব খুব একটা পড়বে না বলে আশা করছে মোদি সরকার। কারণ, সরকার শুধু উচ্চমানসম্পন্ন প্রিমিয়াম কোয়াটির তুলা আমদানির অনুমতি দেবে এবং তাও একটি কোটার অধীনে। যদিও ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তুলা উৎপাদনকারী দেশ, তারপরও বস্ত্র খাতে প্রিমিয়াম কোয়ালিটির বিশেষ করে অতিরিক্ত-লম্বা প্রধান তুলার চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়া থেকে তুলা আমদানি করতে হয় দেশটিকে।

আপেল ও শুকনো ফলের আমদানি কি ভারতীয় কৃষকদের হুমকির মুখে ফেলে? সরকারি হিসাবে, বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম আপেল উৎপাদনকারী দেশ তারা। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আপেলের চাহিদার তুলনায় দেশি সরবরাহ অনেকটাই কম। ফলে ইরান, তুরস্ক, আফগানিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র ও চিলি থেকে প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ টন আপেল আমদানি করতে হয় ভারতকে। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে চুক্তির ফলে ২৫ শতাংশ শুল্ক ছাড়ে ন্যূনতম প্রতি কেজি ৮০ রুপিতে আপেল আমদানির অনুমতি দেবে দেশি ব্যবসায়ীদের। আগে যেখানে আমদানি করতে প্রতিকেজিতে গুনতে হতো ১০০ রুপি, সেখানে এখন খরচ হবে ৮০ রুপি, যা ভারতীয় কৃষকদের সুরক্ষায় সহায়ক হবে। ভারতে আখরোট, বাদাম ও পেস্তার মতো শুকনো ফলের ব্যবহারও দিন দিন বাড়ছে। এই পণ্যগুলোর চাহিদা বাড়লেও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন অনেক কম। তাই ছাড়ের আমদানিতে স্থানীয় কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করার সম্ভাবনা কম।

চা, কফি, মসলা ও ফলচাষিরা বাণিজ্য চুক্তি থেকে লাভবান হবেন বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, ট্রাম্প প্রশাসন এই পণ্যগুলোর জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। অন্যদিকে চালের আমদানি শুল্ক ১৮ শতাংশ কমানোর ফলে প্রিমিয়াম বাসমতি এবং নন-বাসমতি উভয় জাতের চাল রপ্তানিকারকরা উপকৃত হবে। তবে এই অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতায় রাস্তায় নামার ডাক দিয়েছে ভারতের অন্যতম বৃহৎ কৃষক সংগঠন সম্মিলিত কৃষক মোর্চা। কৃষি খাত রক্ষায় এই বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ভারতের কৃষক সমাজ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...