গ্লোবাল আইটিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এক বাংলাদেশি

গ্লোবাল আইটিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এক বাংলাদেশি
হুসাইন মুহাম্মদ আবদুল্লাহ

অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেও থেমে থাকেননি হুসাইন মুহাম্মদ আবদুল্লাহ। প্রযুক্তির প্রতি গভীর আগ্রহ থেকেই ঘরে বসে নিজ উদ্যোগে শুরু করেন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং শেখা। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে, অর্জন করেন ইনফরমেশন সিস্টেমসে (সিএমআইএস) স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। একের পর এক আন্তর্জাতিক পেশাগত সনদ অর্জনের পাশাপাশি নিজেকে তৈরি করেন বিশ্বমানের প্রযুক্তিশিল্পের উপযোগী করে। বর্তমানে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে ‘গ্লোবাল আইটি সার্ভিস ডিরেক্টর’ হিসেবে ২৭ জন সফটওয়্যার প্রকৌশলী ও আর্কিটেক্টের একটি দল পরিচালনা করছেন তিনি। বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি অঙ্গনে নিজের জায়গা করে নেওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিতে কাজের সুযোগ তৈরি, আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জন এবং নতুন প্রজন্মের জন্য আইটি ক্যারিয়ারের প্রস্তুতি—এসব নানা বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন উম্মে কায়নাত আফরাহ

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ থেকে আমেরিকার একটি কোম্পানিতে কাজ করার যাত্রা

আমার এই যাত্রাটা এক দিনে শুরু হয়নি, বরং এটি ছিল নিরবচ্ছিন্ন শেখা এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নিজেকে তৈরি করার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে কাজ করার সময় থেকেই আমি বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত গ্লোবাল এন্টারপ্রাইজ টেকনোলজি (যেমন: Salesforce, Cloud Integration, Enterprise Architecture) নিয়ে কাজ করা এবং এতে দক্ষতা অর্জন করার দিকে নজর দিয়েছিলাম। টেকনোলজির সুবিধা হলো এর ভাষা বিশ্বব্যাপী একই। নিজেকে প্রস্তুত রেখে সঠিক প্ল্যাটফর্মে নেটওয়ার্কিং ও আবেদনের মাধ্যমেই মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল এন্টারপ্রাইজ সিস্টেমে কাজের সুযোগ তৈরি হয়।

আইটি সেক্টরে ক্যারিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে অনুপ্রেরণা

প্রযুক্তি দিয়ে জটিল সমস্যার বাস্তব ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান তৈরির ক্ষমতা আমাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করেছে। আইটি এমন একটি খাত যেখানে প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার সুযোগ থাকে এবং একটি ভালো সফটওয়্যার বা সিস্টেম আর্কিটেকচার হাজার হাজার মানুষের কাজকে সহজ করে দিতে পারে। এই উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং বিশ্বমানের যেকোনো টিমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রভাব ফেলার সুযোগই আমাকে এই সেক্টরে এনেছে।

নিজেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের চাকরির জন্য প্রস্তুতি

আমি প্রধানত তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছিলাম—

• গ্লোবাল টেকনোলজি স্ট্যাক : আন্তর্জাতিক বাজারে যে প্রযুক্তিগুলোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি, সেগুলোতে বিশেষজ্ঞ হওয়া।

• আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন : গ্লোবাল ইন্ডাস্ট্রিতে স্বীকৃত প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা (যেমন: PMP, Salesforce Certifications) অর্জন করা, যা দক্ষতা প্রমাণের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে।

• আচার-আচরণ ও যোগাযোগ : বিশ্বমানের টিমে কাজ করার উপযোগী প্রফেশনাল এথিক্স ও ইংরেজি ভাষায় স্বতঃস্ফূর্ত যোগাযোগের অভ্যাস গড়ে তোলা।

আমেরিকার কোম্পানিতে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে যে দক্ষতা বা অভিজ্ঞতাগুলো সবচেয়ে বেশি কাজে এসেছে

কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি আমার এন্টারপ্রাইজ সলিউশন ডিজাইন, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট (পিএমপি) এবং ডেটা ও সিস্টেম ইন্টিগ্রেশনের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি কাজে এসেছে। আমেরিকান কোম্পানিগুলো কেবল কোডিং বা টুল জানা মানুষকে খোঁজে না; তারা দেখে আপনি ব্যবসার সমস্যা কতটা গভীরভাবে বুঝতে পারছেন এবং কত দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের মধ্যে টেকনিক্যাল সমাধান তৈরি করতে পারছেন।

চাকরি পাওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটা যেমন ছিল

পুরো প্রক্রিয়াটি খুবই সুনির্দিষ্ট এবং প্রতিযোগিতামূলক ছিল। সাধারণত প্রথম ধাপে এইচআর স্ক্রিনিংয়ে গ্লোবাল কালচার ও কমিউনিকেশন স্কিল পরখ করা হয়। এরপর একাধিক টেকনিক্যাল ও আর্কিটেকচারাল রাউন্ড থাকে, যেখানে বাস্তব জীবনের জটিল সমস্যা (Real-World Case Studies) দিয়ে সমাধান করতে বলা হয়। শেষ ধাপে লিডারশিপ ও কালচারাল ফিট ইন্টারভিউ নেওয়া হয়। প্রতিটি ধাপে তাদের মূল নজর থাকে সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করার মানসিকতা (Problem-Solving Mindset) এবং স্পষ্ট যোগাযোগের ওপর।

আমেরিকার আইটি কোম্পানিতে কাজ করতে চাইলে যে দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজন

• কোর টেকনিক্যাল স্কিল : ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা আর্কিটেকচার, এআই বা ফুল-স্ট্যাক ডেভেলপমেন্টে শক্ত ভিত্তি।

• সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা : অ্যালগরিদম বা শুধু থিওরি নয়, বাস্তব জীবনের বিজনেস প্রবলেম সলভ করার ক্ষমতা।

• সফট স্কিলস : প্রফেশনাল কমিউনিকেশন, টাইম ম্যানেজমেন্ট এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার মানসিকতা।

শুধু একাডেমিক ডিগ্রি কি যথেষ্ট

একাডেমিক ডিগ্রি আপনাকে মৌলিক ধারণা দেয়, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে কাজের সুযোগ তৈরি করে আপনার বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা ও প্রজেক্ট পোর্টফোলিও। গ্লোবাল কোম্পানিগুলো দেখে আপনি অতীতে কী তৈরি করেছেন (What you built) এবং কীভাবে প্রবলেম সলভ করেছেন। GitHub পোর্টফোলিও, লাইভ প্রজেক্ট বা ইন্ডাস্ট্রি-স্ট্যান্ডার্ড কাজ ডিগ্রির চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী।

প্রোগ্রামিং বা টেকনিক্যাল স্কিলের পাশাপাশি ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতা

আমি বলব, যোগাযোগ দক্ষতা টেকনিক্যাল স্কিলের মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। আপনার কাছে পৃথিবীর সেরা আইডিয়া বা কোড থাকতে পারে, কিন্তু আপনি যদি তা স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করতে না পারেন, তবে তার মূল্য শূন্য। দূরবর্তী বা আন্তর্জাতিক টিমে কাজ করার প্রধান শর্তই হলো স্বচ্ছ ও সহজ ভাষায় কথা বলা এবং লেখার দক্ষতা।

কোন টেকনোলজি বা স্কিল বর্তমানে শেখা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ

বর্তমানে নতুনদের নিম্নোক্ত ক্ষেত্রগুলোয় নজর দেওয়া প্রয়োজন—

• Artificial Intelligence & Machine Learning : এআই টুলস ব্যবহার

• Cloud Computing : AWS, Azure বা Salesforce-এর মতো ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম।

• Data Engineering & Analytics : ডেটা আর্কিটেকচার এবং ইন্টিগ্রেশন।

• Cybersecurity : আইটি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন