মৃত্যুর ৩০ বছর পরও সালমান শাহকে ঘিরে এত আগ্রহ কেন

মৃত্যুর ৩০ বছর পরও সালমান শাহকে ঘিরে এত আগ্রহ কেন
সালমান শাহ । ছবি: বিবিসি

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৫ বছর। মৃত্যুর তিন দশক পরও তাকে ঘিরে দর্শকের আগ্রহ ও কৌতূহল কমেনি। বরং নতুন প্রজন্মের মধ্যেও তার জনপ্রিয়তা দেখা যাচ্ছে।

ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহমিদা জামান ইষ্টি সালমান শাহকে নিজের চোখে দেখতে না পারাকে জীবনের বড় আফসোস মনে করেন। অথচ তার জন্মের প্রায় ছয় বছর আগেই মারা যান এই নায়ক।

বিজ্ঞাপন

ইষ্টি বলেন, তার বাবা-মা দুজনই সালমান শাহর ভক্ত ছিলেন। ছোটবেলায় তাদের কাছ থেকেই সালমান শাহ সম্পর্কে জানতে পারেন তিনি। অল্প সময়ের ক্যারিয়ারে তার সাফল্য এবং হঠাৎ রহস্যজনক মৃত্যু পরবর্তী সময়ে তাকে সালমান শাহর প্রতি আগ্রহী করে তোলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিছা নূজহাতের কাছেও সালমান শাহ অন্য রকম। তার ভাষায়, বাংলা সিনেমার অন্য নায়ক-নায়িকাদের তুলনায় সালমান ছিলেন ব্যতিক্রম। অভিনয় থেকে ফ্যাশন—সব ক্ষেত্রেই তিনি অন্যদের চেয়ে ‘দু-কদম এগিয়ে’ ছিলেন।

নাফিছা বলেন, সালমান শাহ ছিলেন একটি প্রজন্মের আইকন। তার ফ্যাশন, সিনেমা ও গান এখনো জনপ্রিয়।

চার বছরের ক্যারিয়ারে ২৭ সিনেমা

১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমায় অভিনয় করে রাতারাতি তারকা বনে যান সালমান শাহ। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে তিনি অভিনয় করেন ২৭টি সিনেমায়। এর বেশির ভাগই ছিল সুপারহিট।

তার স্বল্প সময়ের ক্যারিয়ারই তাকে দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে দেয়। মৃত্যুর ৩০ বছর পরও অনেকে তাকে ভুলতে পারেননি।

সিলেটের হযরত শাহজালালের দরগাহ সংলগ্ন কবরস্থানেও এখনো ভক্তদের দেখা যায়। জামালপুর থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে একজন ভক্ত সালমান শাহর কবর জিয়ারত করতে সিলেটে এসেছিলেন।

চলচ্চিত্র গবেষক, নির্মাতা ও অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন রাজু মনে করেন, সালমান শাহকে ঘিরে তৈরি হওয়া ফ্যানডম বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিরল। তার ফ্যাশন ও অভ্যাসও দর্শকেরা অনুসরণ করেন বলে জানান তিনি।

স্কুলে বাদ পড়েছিল ‘সালমান’, পরে সেটিই পরিচয়

সিলেটের হযরত শাহজালালের দরগাহ সংলগ্ন কবরস্থান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে দাড়িয়াপাড়া এলাকায় সালমান শাহ ভবন। এটি তার নানাবাড়ি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বাড়িতেই তার জন্ম।

বাবা-মা আদর করে তার নাম রেখেছিলেন চৌধুরী মোহাম্মদ সালমান শাহরিয়ার। ডাকনাম ছিল ইমন।

বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। ইমনের জন্মের কয়েক বছর পর তার বদলি হয় কুমিল্লায়। সেখানে একটি স্কুলে ভর্তি করানোর সময় তার দীর্ঘ নাম নিয়ে সমস্যা হয়। শিক্ষকেরা নাম ছোট করার পরামর্শ দেন।

তখন নাম থেকে ‘সালমান’ বাদ দেওয়া হয়। রাখা হয় চৌধুরী মোহাম্মদ সালমান শাহরিয়ার।

তখন কেউ ভাবেনি, বড় হয়ে সেই বাদ পড়া ‘সালমান’ নামেই তিনি সবার কাছে পরিচিত হবেন।

‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান পরে তার নামের সঙ্গে ‘শাহ’ যুক্ত করেন। সালমানের মা নীলা চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, অভিনেতা নাসিরুদ্দীন শাহর প্রতি তার মায়ের ভক্তি এবং সালমান শাহরিয়ারের নামের ‘শাহরিয়ার’ অংশ থেকেই ‘শাহ’ নেওয়া হয়। এভাবেই নাম হয় সালমান শাহ।

ছোট পর্দা থেকে চলচ্চিত্রে

সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন সালমান শাহ। তার নানা কামরুজ্জামান বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এ অভিনয় করেছিলেন। অভিনয়ে আসার ক্ষেত্রে তার নানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন সালমান শাহ।

তার মা নীলা চৌধুরীও নিয়মিত রেডিও ও টেলিভিশনে গান করতেন। মায়ের হাত ধরেই আশির দশকের শুরুর দিকে টেলিভিশনে অভিষেক হয় সালমান শাহর।

শিশুশিল্পী হিসেবে শুরু হয় তার অভিনয়। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিটিভির একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের গানে মডেল হন তিনি। পরে বিটিভির তালিকাভুক্ত শিল্পী হন এবং একাধিক নাটকে অভিনয় করেন। পাশাপাশি বিজ্ঞাপনচিত্রেও মডেল হন।

সালমান শাহ জানিয়েছিলেন, নাটক ও বিজ্ঞাপনে অভিনয় শুরু করেছিলেন শখের বশে। এর মধ্যেই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ আসে খ্যাতনামা নির্মাতা আলমগীর কবিরের কাছ থেকে।

আশির দশকের শেষ দিকে ঔপন্যাসিক সেলিনা হোসেনের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেছিলেন আলমগীর কবির। সেখানে রইস চরিত্রে অভিনয় করছিলেন সালমান শাহ। তবে ১৯৮৯ সালে এক দুর্ঘটনায় আলমগীর কবির মারা গেলে সিনেমাটির কাজ আর শেষ হয়নি।

এরপর আসে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’-এর সুযোগ। বলিউডের ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’-এর সাফল্যের পর অনুমোদন নিয়ে ছবিটির বাংলা সংস্করণ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় আনন্দমেলা সিনেমা লিমিটেড।

নায়কের জন্য নতুন মুখ খুঁজছিলেন পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান। ১৯৯২ সালে একদিন আকস্মিকভাবেই সালমান শাহর কাছে প্রস্তাব দেন তিনি।

প্রথমে বাবা-মা রাজি ছিলেন না। ছেলের আগ্রহ দেখে পরে তারা সম্মতি দেন। ১৯৯৩ সালের মার্চে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মুক্তির পর ব্যাপক সাফল্য পায়। এরপর সালমান শাহ হয়ে ওঠেন ঢালিউডের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক।

২৫ বছর বয়সে আকস্মিক মৃত্যু

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে আকস্মিক মৃত্যু হয় সালমান শাহর। তখন তিনি স্ত্রী সামিরা হককে নিয়ে ঢাকার নিউ ইস্কাটনের একটি ভবনের ১১ তলার ফ্ল্যাটে থাকতেন। তার বাবা-মা ও ভাই থাকতেন গ্রিনরোডে।

ওই দিন সকালে বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী ছেলের সঙ্গে দেখা করতে ইস্কাটনের বাসায় যান। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও ছেলের দেখা না পেয়ে তিনি গ্রিনরোডের বাসায় ফিরে যান।

সকাল প্রায় ১১টার দিকে সালমানের মা নীলা চৌধুরীকে ফোন করে দ্রুত ইস্কাটনের বাসায় যেতে বলা হয়। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, ভবনের নিচে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছেন।

পরে ১১ তলার ফ্ল্যাটে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা সালমান শাহকে খাটের ওপর পড়ে থাকতে দেখেন। বাড়ির কর্মচারীরা তার হাতে তেল মালিশ করছিলেন।

সালমানের শরীরে মৃত্যুর লক্ষণ দেখে পরিবারের সদস্যরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। প্রথমে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

চিকিৎসকেরা জানান, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।

মৃত্যু নিয়ে শুরু হয় সন্দেহ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর সালমান শাহর লাশ এফডিসিতে নেওয়া হয়। সেখানে সহকর্মী ও ভক্তদের ভিড় জমে যায়।

পরে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় সিলেটে। সেখানে জানাজা শেষে হযরত শাহজালালের মাজার সংলগ্ন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়েছিল। তবে লাশ দেখার পর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়।

সালমানের মামা আলমগীর কুমকুম তার গলায় দাগ এবং যে রশি দিয়ে আত্মহত্যা করা হয়েছে বলে বলা হয়েছিল, তার মধ্যে অসামঞ্জস্যের কথা উল্লেখ করেন।

একের পর এক তদন্ত

সালমান শাহর মৃত্যুর পর তার বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেন। পরে সেটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করা হয়। তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি।

দাফনের প্রায় এক সপ্তাহ পর কবর থেকে লাশ তুলে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত করা হয় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তিন সদস্যের মেডিকেল বোর্ডের প্রধান ছিলেন তৎকালীন ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. নারগিস বাহার চৌধুরী।

দ্বিতীয় ময়নাতদন্তেও আত্মহত্যার আলামত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্নও পাওয়া যায়নি।

১৯৯৭ সালের নভেম্বরে সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে সালমান শাহর মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যার কথা বলা হয়।

পরিবার ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে নারাজি জানায়। পরে ২০০৩ সালে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ২০১৪ সালে কমিটি প্রতিবেদন দেয়। সেখানেও সালমান শাহর মৃত্যুকে অপমৃত্যু বলা হয়।

এরপর সালমানের মা আবার নারাজি আবেদন করেন। ২০১৬ সালে আদালত তদন্তের দায়িত্ব দেয় র‍্যাবকে।

২০১৭ সালে সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য আবার আলোচনায় আসে। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বিউটিশিয়ান রাবেয়া সুলতানা রুবি ফেসবুক ভিডিওতে দাবি করেন, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছিল। তার স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরে অবশ্য নিজের ওই বক্তব্য প্রত্যাহার করেন রুবি।

পরবর্তী সময়ে তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন দেয় সংস্থাটি। সেখানে বলা হয়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। তার লেখা একটি সুইসাইড নোট পাওয়ার কথাও জানানো হয়।

পরিবার পিবিআইয়ের প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করে।

২৯ বছর পর হত্যা মামলা

পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে ঢাকার একটি আদালত সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা গ্রহণ করেন। মামলাটি পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।

এরপর গত বছরের অক্টোবরে সালমানের মামা আলমগীর কুমকুম রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। এতে সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, সাবেক শাশুড়ি লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ বাহাই, অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, বিউটিশিয়ান রাবেয়া সুলতানা রুবি ও রেজভী আহম্মেদসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়।

মামলাটি এখন তদন্ত করছে সিআইডি। তদন্ত চলাকালে দেশে থাকা আসামিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। তবে গত ৯ আগস্ট বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করলে অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, এটি বহুল আলোচিত মামলা। এর আগে বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রতিবারই বাদীপক্ষ নারাজি জানিয়েছে। ৩০ বছর ধরে বিষয়টি এভাবেই চলছে। প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।

অভিযুক্তদের বক্তব্য

সালমান শাহর মৃত্যুর জন্য শুরু থেকেই তার সাবেক স্ত্রী সামিরা হককে দায়ী করে আসছেন পরিবারের সদস্যরা। সর্বশেষ হত্যা মামলাতেও তাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সামিরার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

২০২৪ সালে একটি স্থানীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন সামিরা। তবে তিনি স্বীকার করেন, মৃত্যুর আগে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়েছিল। এর কেন্দ্রে ছিলেন অভিনেত্রী শাবনূর।

সালমান শাহ ও শাবনূরের জুটি দর্শকের কাছে জনপ্রিয় ছিল। তাদের সম্পর্ক নিয়ে প্রেম ও বিয়ের গুঞ্জনও ছড়িয়েছিল। এ নিয়ে সালমান ও সামিরার সংসারে অশান্তি তৈরি হয়েছিল বলে জানা যায়।

শাবনূরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন সময় সামাজিক মাধ্যমে তিনি বলেছেন, কাজের সম্পর্কের বাইরে সালমান শাহর সঙ্গে তার অন্য কোনো সম্পর্ক ছিল না।

অভিনেতা আশরাফুল হক ডনও সালমান শাহ হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, সালমান শাহ যেদিন মারা যান, সেদিন তিনি ঢাকার বাইরে ছিলেন।

অন্য আসামি রেজভী আহম্মেদও পরে সালমান শাহর মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন। তার ভাষ্য, গ্রেপ্তারের সময় তার বয়স ছিল ১৫ বছর। ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি কী, সেটিও তিনি জানতেন না। তাকে যা বলা হয়েছিল, তিনি তা-ই করেছিলেন।

অন্য আসামিদের বেশির ভাগই বর্তমানে বিদেশে অথবা আত্মগোপনে রয়েছেন। তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অতীতে বিভিন্ন সময় তারাও সালমান শাহ হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

‘এখনও মিস করি’

সালমান শাহর চার বছরের চলচ্চিত্র জীবনে তার কোনো সিনেমাই লোকসানের মুখে পড়েনি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। প্রযোজকদের কাছে তখন সালমান মানেই ছিল সাফল্যের নিশ্চয়তা।

মৃত্যুর সময়ও তার হাতে প্রায় ডজনখানেক সিনেমা ছিল। এর মধ্যে প্রায় ছয়টি সিনেমার শুটিং চলছিল। তার আকস্মিক মৃত্যুতে এসব সিনেমার প্রযোজক ও পরিচালক বড় ধরনের সমস্যায় পড়েন।

কিছু সিনেমায় তার মতো দেখতে তরুণদের দিয়ে অসমাপ্ত শুটিং শেষ করা হয়। আবার যেসব সিনেমার বড় অংশের শুটিং বাকি ছিল, সেগুলোর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। কোনো কোনো সিনেমায় নতুন নায়ক নিয়ে আবার শুটিং করতে হয়।

পরিচালক ড. মতিন রহমান বলেন, তার একটি সিনেমার অর্ধেক শুটিং বাকি ছিল। সালমান শাহর মৃত্যুর পর পুরো সিনেমাটি বাদ দিতে হয়। এতে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে।

পরিচালক জাকির হোসেন রাজুর ভাষায়, সালমানের মৃত্যুতে পুরো চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোক নেমে এসেছিল। প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলী—সবাই ভেঙে পড়েছিলেন।

তিনি বলেন, কোনো ডানপিটে বা রোমান্টিক চরিত্র লেখার সময় এখনো তার সালমান শাহর কথা মনে পড়ে। এখনো তাকে মিস করেন তিনি।

নতুন প্রজন্মের কাছেও জনপ্রিয়

সালমান শাহর জনপ্রিয়তার বড় একটি দিক ছিল তার ফ্যাশন। তার পোশাক, চুলের স্টাইল, হাঁটা-চলা ও অঙ্গভঙ্গি পর্যন্ত অনুকরণ করতেন ভক্তরা।

ভক্ত মোস্তফা জামান বলেন, তিনি এখনো সালমান শাহর মতো ডান হাতে ঘড়ি পরেন। সালমানের একটি বদভ্যাসও তার মধ্যে চলে এসেছে—দাঁত দিয়ে নখ কাটা।

সালমান শাহর মৃত্যুর পর অনেক ভক্তই তার চলে যাওয়া মেনে নিতে পারেননি। কেউ সিনেমা হলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এখনো অনেকে ইউটিউবে শুধু তার সিনেমাই দেখেন।

তবে শুধু যারা তাকে জীবিত অবস্থায় দেখেছেন, তাদের মধ্যেই নয়; মৃত্যুর পর জন্ম নেওয়া প্রজন্মের মধ্যেও সালমান শাহকে নিয়ে আগ্রহ রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌসের ভাষায়, সালমান শাহ ছিলেন একজন ট্রেন্ডসেটার। তার ফ্যাশন, অভিনয় ও মার্জিতভাবে কথা বলার ধরন এখনো মানুষ পছন্দ করে।

জেন-জি প্রজন্মের আল মুক্তাদিরের কাছে সালমান শাহর সাবলীল অভিনয় ও স্বাভাবিক সংলাপ বলার ধরন আকর্ষণীয়। তার ফ্যাশন সেন্সও নতুন প্রজন্মের এই দর্শককে মুগ্ধ করে।

কেন এখনো এত জনপ্রিয়?

চলচ্চিত্র গবেষক ও নির্মাতা ড. জাকির হোসেন রাজুর মতে, সালমান শাহর অভিনীত অনেক সিনেমায় কিশোর ও তরুণদের রোমান্সের বিষয়টি ছিল। ফলে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও তার জায়গা তৈরি হচ্ছে।

তার মতে, বর্তমান জেন-জি ও নতুন দর্শকদের ভিজ্যুয়াল জগতেও সালমান শাহ স্বাভাবিকভাবেই জায়গা করে নিয়েছেন। এ কারণেই ৩০ বছর পরও তাকে ঘিরে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

পরিচালক ড. মতিন রহমান অবশ্য সালমান শাহর অস্বাভাবিক মৃত্যুকেই তার দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ মনে করেন। তার মতে, স্বাভাবিকভাবে মৃত্যু হলে হয়তো সালমান ৩০ বছর ধরে মানুষের কাছে এত জনপ্রিয় থাকতেন না। অস্বাভাবিক মৃত্যুই তাকে আরো দীর্ঘ সময় মানুষের আলোচনায় রেখেছে।

মৃত্যুর তিন দশক পরও সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্যের সমাধান হয়নি। ফলে তাকে ঘিরে আলোচনা ও কৌতূহলও থামেনি। ভক্তদের কেউ কেউ এখনো তার মৃত্যুর বিচার দাবি করছেন।

সালমান শাহর এক ভক্ত রাহিমা নিশাত নিঝুম বলেন, ‘এটা আত্মহত্যা, নাকি হত্যা? এটার জটটা খুলুক আমরা সেটাই চাই।’

অতীতে পুলিশ ও বিচার বিভাগের বিভিন্ন তদন্তে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়েছে। তবে তার পরিবার ও ভক্তরা তা মেনে নেননি।

সালমান শাহ স্মৃতি সংসদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মাসুদ রানা নকীবের বক্তব্য, যদি আত্মহত্যাই হয়ে থাকে, তবে এর নেপথ্যে কারো দায় ছিল কি না, সেটিও খুঁজে দেখা প্রয়োজন।

তার মতে, সালমান শাহর মৃত্যুতে শুধু তাঁর পরিবার নয়, বাংলাদেশের পুরো চলচ্চিত্র শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সালমান শাহ নেই। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রও থেমে নেই। প্রতিবছর নতুন সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের নায়ক-নায়িকারা চলচ্চিত্রে আসছেন। তবে মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে সালমান শাহ যে প্রভাব তৈরি করেছিলেন, মৃত্যুর ৩০ বছর পরও সেটিই তাকে ভক্তদের কাছে বাঁচিয়ে রেখেছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন