ব্রিটিশ রাজনীতিতে রিফর্ম ইউকে নেতা নাইজেল ফারাজ এখনো বড় ধরনের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে আছেন। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও তার আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের সম্ভাবনার মধ্যেও জনমত জরিপে রিফর্ম ইউকে প্রধান দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানে কলামিস্ট আদিত্য চক্রবর্তীর এক মতামতধর্মী নিবন্ধে বলা হয়েছে, ফারাজকে ঠেকাতে পারে এমন ভোটারদের বড় অংশ প্রচলিত রাজনৈতিক ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
নিবন্ধে হোপ নট হেট নামে একটি সংগঠনের নতুন গবেষণার কথা তুলে ধরা হয়েছে। ফোকালডাটার পরিচালিত প্রায় ৯ হাজার মানুষের জরিপের ভিত্তিতে তৈরি এই গবেষণায় রিফর্ম ইউকের বিরোধী ভোটারদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ফারাজবিরোধী ভোটারদের প্রায় অর্ধেক তরুণ, শহুরে, স্নাতক এবং অপেক্ষাকৃত প্রগতিশীল। তবে বাকি একটি বড় অংশ বামপন্থি নয়; বরং তারা সাংস্কৃতিক প্রশ্নে ডানঘেঁষা এবং অর্থনৈতিক বিষয়ে আরও বেশি ডানপন্থি।
গবেষণা অনুযায়ী, এই ডানঘেঁষা ভোটারদের একটি বড় উদ্বেগ হলো রিফর্ম ইউকের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা। অর্থাৎ, তারা ফারাজের রক্ষণশীল অবস্থানের বিরোধী নন; বরং দলটি যথেষ্ট রক্ষণশীল নয় বা তাদের কাছে অতিরিক্ত বিশৃঙ্খল—এমন ধারণা তাদের মধ্যে কাজ করছে। লেখকের মতে, ফারাজের বিরোধিতাকারীদের মধ্যে নারীদের উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। নারীরা ধারাবাহিকভাবে ফারাজের রাজনৈতিক বার্তাকে কম সমর্থন করেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
তবে অভিবাসন প্রশ্নে ফারাজের কঠোর অবস্থানই যে তার বিরোধীদের প্রধান আপত্তির কারণ, এমনটা জরিপে স্পষ্ট নয়। নিবন্ধে বলা হয়েছে, ফারাজবিরোধী অনেক ভোটার তার অভিবাসনবিরোধী বক্তব্যকে আপত্তিকর মনে না-ও করতে পারেন। বিশেষ করে ডানঘেঁষা ভোটারদের কেউ কেউ বর্ণবাদী বক্তব্যের চেয়ে রাজনৈতিক অশালীনতা ও বিশৃঙ্খলাকে বেশি সমস্যা হিসেবে দেখেন। লেখকের মতে, এর মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতে অভিবাসন ও বর্ণবাদবিরোধী বক্তব্যের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যাওয়ার একটি উদ্বেগজনক দিকও সামনে আসে।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, ফারাজবিরোধী ভোটারদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো প্রচলিত রাজনীতি ও ওয়েস্টমিনস্টারের প্রতি তাদের গভীর অসন্তোষ। জরিপে দুই-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি ভোটার মূলধারার রাজনীতিক ও গণমাধ্যমের প্রতি অসন্তুষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে শুধু ফারাজের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালালেই তাকে ঠেকানো সম্ভব হবে না; ভোটারদের দৈনন্দিন সমস্যা ও রাজনৈতিক হতাশার কারণগুলো মোকাবিলা করাও জরুরি বলে লেখক মনে করেন।
চক্রবর্তী’র বিশ্লেষণে আরো বলা হয়েছে, বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় ফারাজবিরোধী কৌশল এক রকম হবে না। ওয়েলস বা স্কটল্যান্ডের মতো অঞ্চলে স্থানীয় জাতীয়তাবাদী দলগুলো যে বিকল্প রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করতে পারে, ইংল্যান্ডে তেমন কোনো একক বিকল্প নেই। ফলে ইংল্যান্ডে ফারাজের বিরুদ্ধে ভোট একত্রিত করার ক্ষেত্রে আরও জটিল রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োজন।
নিবন্ধে ফারাজের বর্তমান রাজনৈতিক সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লেখকের উদ্ধৃত আসনভিত্তিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এখন নির্বাচন হলে রিফর্ম ইউকে ১০০ থেকে ২০০টি পর্যন্ত আসন পেতে পারে। এমনকি দলটি পরবর্তী সরকার গঠন করতে পারে অথবা প্রধান বিরোধী দল হিসেবেও আবির্ভূত হতে পারে—যদিও এটি একটি রাজনৈতিক পূর্বাভাস, নিশ্চিত ফল নয়।
লেখকের মতে, ফারাজের জনপ্রিয়তা মূলত ভোটারদের স্থায়ী আনুগত্যের চেয়ে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি হতাশার প্রতিফলন। তাই লেবার পার্টি যদি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভালো যোগাযোগ বা কিছু প্রতীকী রাজনৈতিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করে এবং জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উদ্বেগের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ফারাজের উত্থান ঠেকানো কঠিন হতে পারে। এটি লেখকের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

