দাম নিয়ে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া থাকলেও এবার দেশের বিভিন্ন জেলায় পাটের ভালো ফলনে খুশি চাষিরা। মে-জুনের তীব্র খরার পর জুলাই-আগস্টে টানা বর্ষণে অনেক এলাকায় ফলন প্রত্যাশা ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি বাজারে দামও তুলনামূলক ভালো হওয়ায় গত কয়েক বছরের লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার আশা করছেন কৃষকরা।
বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদনকারী দেশ, বছরে উৎপাদন ১৫ লাখ টন। দেশে বর্তমানে সাড়ে সাত থেকে আট লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়। প্রায় ৮০ লাখ বেল পাট উৎপন্ন হয়, যার ৫১ শতাংশ পাটকলে ব্যবহৃত হয়। ৪৪ শতাংশ কাঁচা অবস্থায়ই রপ্তানি হয়। অন্যদিকে মাত্র ৫ শতাংশ দেশে অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়। দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ১২ শতাংশ পাট চাষ ও প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের প্রায় ৪০ লাখ কৃষক পাট চাষের সঙ্গে জড়িত। প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন প্রায় চার কোটি মানুষ। ফরিদপুর, যশোর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, টাঙ্গাইল ও জামালপুরে উৎপাদন তুলনামূলক বেশি। চলতি মৌসুমে রপ্তানি সীমিত থাকলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম ঊর্ধ্বমুখী, যা দেশীয় চাহিদা বৃদ্ধি ও সীমিত সরবরাহের প্রতিফলন। পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগও এ চাহিদা ধরে রাখতে সহায়ক বলে জানিয়েছেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা।
বাণিজ্য, শিল্প এবং পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পাটপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো গেলে পাটের দাম বাড়বে এবং কৃষকরাও চাষে উৎসাহিত হবেন। তিনি চীনে পাট রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা এবং দুদেশের সহযোগিতায় টেক্সটাইল খাতের রপ্তানি দ্বিগুণ করার সম্ভাবনার কথা জানান।
এদিকে, টানা চার বছর কমার পর গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি পৌনে ৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ কোটি ডলারে, যা গত তিন অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে রপ্তানিকারকরা বলছেন, বন্যায় গত বছর উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কাঁচা পাটের দাম বেড়ে গিয়েছিল। উচ্চমূল্যের কারণেই অর্থের হিসাবে রপ্তানি বেড়েছে, পরিমাণে বাড়েনি।
বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) সভাপতি তাপস প্রামাণিক জানান, গত অর্থবছরে প্রতি মণ কাঁচা পাট কিনতে হয়েছে ৫,৫০০ থেকে ৬,০০০ টাকায়, যা তার আগের বছর ছিল ৩,০০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা। তিনি বলেন, কাঁচামালের সরবরাহ মসৃণ করতে পারলে রপ্তানি দুই-তিন বিলিয়ন ডলারে নেওয়া সম্ভব।
এদিকে, কাঁচা পাটের রপ্তানির পরিমাণ ৭৭ শতাংশ কমে ৩৮ হাজার টনে নেমেছে। অথচ আগের বছর ছিল এক লাখ ৬৭ হাজার টন। অবশ্য পাটের বস্তার রপ্তানি ৫ শতাংশ বেড়ে ১৩ কোটি ডলার এবং সুতার রপ্তানি ১৮ শতাংশ বেড়ে ৪৯ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। আবার ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রয়াদেশ কমায় বহুমুখী পাটপণ্যের রপ্তানি ১১ শতাংশ কমে সাত কোটি ৪৪ লাখ ডলারে নেমেছে।
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েশনের এমডি রাশেদুল করিম বলেন, বহুমুখী পণ্য উৎপাদন ছাড়া রপ্তানি বাড়ানোর বিকল্প নেই। এজন্য গবেষণা ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
বর্তমানে প্রতি মণ পাটের বাজারদর ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, আবহাওয়াগত কারণে কিছু কিছু জায়গায় ফলন হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি মিল মালিকদের সাড়া কম থাকায় বাজারে দামও কম।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কয়েকজন চাষি জানিয়েছেন, উৎপাদন খরচ বাড়লেও ন্যায্য দাম মিলছে না। সরকার আগে থেকে দাম নির্ধারণ করে দিলে ভালো হতো। এমন বিচ্ছিন্ন অভিযোগ থাকলেও সামগ্রিকভাবে দেশের অধিকাংশ পাট উৎপাদনকারী অঞ্চলে ফলন ও দাম—উভয় দিক থেকেই স্বস্তির চিত্র ফুটে উঠেছে।
এদিকে ‘সোনালী আঁশে ভরপুর, ভালোবাসি ফরিদপুর’ স্লোগানে পাটের রাজধানীখ্যাত ফরিদপুরে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে এবার ৮৭ হাজার ৪০২ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। সালথা ও নগরকান্দা উপজেলায় সবচেয়ে বেশি পাট চাষ হলেও পর্যাপ্ত পানি সংকট, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মূল্য বৃদ্ধিতে উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে।
রাজশাহীর ৯ উপজেলায় এবার ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে বেশি। ইতোমধ্যে ৮২ শতাংশ জমির পাট কাটা শেষে উৎপাদন হয়েছে ৪৮ হাজার ২০০ টন, যা লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে মণপ্রতি ৪,০০০ থেকে ৪,৩০০ টাকায় বিক্রি হওয়া এই পাট থেকে জেলার আয় হতে পারে প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকা।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পাটের বাম্পার ফলন ও ভালো দামে কৃষকদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও শ্রমিক সংকট ও বাড়তি খরচে তা পুরোপুরি স্থায়ী হচ্ছে না। কৃষক কালাম গায়ান জানান, শ্রমিকের দৈনিক মজুরি এখন ১,৫০০ থেকে ১,৬০০ টাকা। ফলে প্রতি বিঘায় খরচ ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকা। অথচ মণপ্রতি ৩,২০০ থেকে ৩,৩০০ টাকায় বিক্রি করে বিঘাপ্রতি আয় হচ্ছে মাত্র ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা। তিনি সরকারের কাছে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পাট কিনে দাম বাড়ানোর দাবি জানান।
নড়াইলে এবার ২৩ হাজার ৫১৭ হেক্টরে পাট আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় সামান্য বেশি। উৎপাদন প্রত্যাশা তিন লাখ ১৬ হাজার ৮৯৮ বেল। সরকারি প্রণোদনায় ৩,২০০ প্রান্তিক কৃষক বিনামূল্যে বীজ ও সার পেয়েছেন।
বাংলাদেশ পাটচাষি সমিতির সভাপতি মোক্তার মোল্যা জানান, উৎপাদন খরচ না ওঠায় তারা লোকসানে রয়েছেন। মজুরি ও উপকরণের দাম বিবেচনায় নিয়ে চাষিরা মণপ্রতি পাটের দাম ৪,৫০০ থেকে ৬,০০০ টাকায় উন্নীত করা এবং সরকারিভাবে পাট কেনার জোর দাবি জানিয়েছেন। চাষিদের মতে, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে তারা পাট চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন।
সাবেক কৃষি সচিব ড. এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের মতে, পাটের সম্ভাবনা কখনো ফুরাবে না। সীমাবদ্ধ জমিতে উৎপাদন আরো বাড়ানো সম্ভব।
বিজেআরআইয়ের মহাপরিচালক ড. নার্গিস আক্তার জানান, প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ৫৭টি জাত, ২২৩টি কৃষি প্রযুক্তি ও ৬৯টি শিল্প-কারিগরি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। রপ্তানিকারকরা ২০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা পাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে এবারের মৌসুমে ভালো ফলন কৃষকদের স্বস্তি দিলেও উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে বহুমুখী পাটপণ্যের উৎপাদন, নতুন বাজার সৃষ্টি ও কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে রপ্তানি আয় বাড়িয়ে সোনালি আঁশের সম্ভাবনাকে আরো কাজে লাগানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিরা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন]
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


