শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে তিন সাংবাদিকের ওপর হামলা ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় এক সাংবাদিকের মুঠোফোন ও পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নিয়ে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ মুছে ফেলতে বাধ্য করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। পরে এক সাংবাদিককে মুঠোফোনে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা।
মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
হামলার শিকার সাংবাদিকরা হলেন—নিউজ টুয়েন্টিফোর টেলিভিশন ও জাগো নিউজের প্রতিনিধি বিধান মজুমদার অনি, দ্য ডেইলি স্টারের শরীয়তপুর ও মাদারীপুর প্রতিনিধি জাহিদ হাসান রনি এবং দৈনিক এদিনের জেলা প্রতিনিধি বরকত উল্লাহ।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সম্প্রতি কোনো লিখিত নোটিশ না দিয়ে শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এর প্রতিবাদে রোববার প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন।
এরই প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকালে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি অংশ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করে। ওই কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
প্রথমে বিধান মজুমদার অনির ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ। তিনি বলেন, “পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আমার ওপর অতর্কিতভাবে হামলা চালানো হয়। একপর্যায়ে কয়েকজনের সহযোগিতায় কোনোমতে ঘটনাস্থল থেকে নিজেকে রক্ষা করে সরে আসি। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।”
এর কিছুক্ষণ পর সংবাদ সংগ্রহের সময় জাহিদ হাসান রনি ও বরকত উল্লাহর ওপরও হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ। জাহিদ হাসান রনি বলেন, জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লাসহ বেশ কয়েকজন তাকে মারধর করেন। পরে তার পরিচয়পত্র ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নিয়ে ধারণ করা ফুটেজ মুছে ফেলতে বাধ্য করা হয়।
বরকত উল্লাহ বলেন, “জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফ মোল্লা আমাকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘ও সাংবাদিক, ওকে ধর।’ এরপর তাঁর নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবক দলের আমান মাদবরসহ কয়েকজন সংঘবদ্ধভাবে আমার ওপর হামলা চালান। তাঁরা আমাকে কিল, ঘুষি ও লাথি মারেন।”
তিনি আরও বলেন, একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। হামলার সময় তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতা ও শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন বলে জানান বরকত উল্লাহ।
ঘটনার বিষয়ে জানতে জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এক সংবাদকর্মীর সঙ্গে উত্তেজিত ও হুমকিমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই কথোপকথনে তিনি বলেন, “অনেকেই লিস্টে আছে, সন্ধ্যার পর খবর পেয়ে যাবে। তুমি নিজেও তৈরি থাকো ইনশাআল্লাহ... তোমরা লেখবা আর আমরা তো তোমাদের পিটাবো।”
অভিযোগের বিষয়ে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমিনুর রহমান আমান বলেন, “একজন ব্যক্তিকে দেখেছি কয়েকজনকে ধাক্কাধাক্কি করতে। আমরা জানতাম না তিনি সাংবাদিক।” এর বেশি কিছু বলতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে শরীয়তপুর জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আব্দুস সালাম বলেন, সাংবাদিকেরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেছেন। তারা এভাবে তার প্রত্যাহার চাইতে পারেন না। সাংবাদিকতার আড়ালে কিছু সন্ত্রাসী ও ফ্যাসিবাদের দোসর বিএনপির সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য এমন কাজ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে সেখানে কোনো সাংবাদিক নিগৃহীত বা মারধরের শিকার হয়েছেন কি না, তা তার জানা নেই বলে জানান।
ঘটনার পর স্থানীয়রা আহত সাংবাদিকদের উদ্ধার করে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তারা প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
শরীয়তপুর জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেন সরদার বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। এ ঘটনায় শরীয়তপুর জেলা প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানাচ্ছি।
শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) তানভীর হোসেন বলেন, গণমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে বিষয়টি ইতোমধ্যে জানতে পেরেছেন। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

