ইরানের অর্থনৈতিক সংকট আরো গভীর হওয়ার মধ্যে দেশটির তেলমন্ত্রী মোহসেন পাকনেজাদ পদত্যাগ করেছেন। প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানির প্রধান হামিদ বোভার্দকে ভারপ্রাপ্ত তেলমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
পাকনেজাদ ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে। তবে তার পদত্যাগ এমন এক সময়ে হলো, যখন মার্কিন অবরোধ ও যুদ্ধের কারণে ইরানের তেল রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় মারাত্মকভাবে কমে গেছে। দেশটিতে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে এবং বছরের প্রথম তিন মাসে অর্থনীতি ১০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।
ইরানের তেল খাতের ওপর সবচেয়ে বড় চাপ এসেছে তেল রপ্তানি থেকে আয় দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান দীর্ঘদিন ধরে অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী বা ‘ট্রাস্টি’ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে আসছে। সম্প্রতি ইরানি সংবাদপত্র ফারহিখতেগানের এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, পাকনেজাদের আমলে গঠিত এমন একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশে বিক্রি করা তেলের প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানির কাছে বকেয়া রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ইরানের পার্লামেন্টের জ্বালানি কমিশন তদন্ত শুরু করেছে।
তবে এই অভিযোগই পাকনেজাদের পদত্যাগের সরাসরি কারণ—এমন কোনো সরকারি ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বরং প্রেসিডেন্টের দপ্তর তার ব্যক্তিগত কারণের কথা জানিয়েছে। ফলে তেল খাতের ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন তার পদত্যাগের পেছনে কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
নতুন ভারপ্রাপ্ত তেলমন্ত্রী হামিদ বোভার্দ আগে ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তেল ও গ্যাস খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা বোভার্দ এমন সময়ে দায়িত্ব নিলেন, যখন ইরানের জ্বালানি ব্যবস্থা নজিরবিহীন চাপে রয়েছে।
দেশটির অভ্যন্তরীণ জ্বালানি পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। সেপ্টেম্বরে সরকার নির্ধারিত ভর্তুকিযুক্ত সীমার অতিরিক্ত পেট্রলের দাম দ্বিগুণ করা হয়। এর আগে পেট্রল ঘাটতি এবং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারির খবর পাওয়া যায়। ইরানের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা দেশটির পরিশোধন সক্ষমতার তুলনায় বেড়ে যাওয়ায় আমদানির ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।
একই সময়ে মুদ্রার দরপতন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরো কঠিন করে তুলেছে। ডলারের বিনিময়মূল্য ২ লাখ ৬৯ হাজার তোমানে উঠেছে এবং এক মাসের ব্যবধানে প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক ও নার্সদের বেতনও দ্রুত বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
ইরানের সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি বৈঠক করেছে। তেহরানের মেয়র আলিরেজা জাকানি চাল, চিনি, তেল ও ডিটারজেন্টসহ ১২টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ছয় মাসের জন্য স্থির রাখার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। তবে এই মূল্যনিয়ন্ত্রণ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এদিকে তেল রপ্তানি নিয়ে ইরানের সংকট আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলছে। মার্কিন নৌ অবরোধ ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাতের কারণে ইরানের তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের সংকট বাড়ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, বর্তমান অস্থিরতার প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্তও স্থায়ী হতে পারে।
সব মিলিয়ে তেলমন্ত্রীর পদত্যাগকে শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব পরিবর্তন হিসেবে দেখলে ইরানের বর্তমান সংকটের ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না। তেল রপ্তানি কমে যাওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ঘাটতি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন—সবগুলো সংকট একই সময়ে ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। নতুন ভারপ্রাপ্ত তেলমন্ত্রীর প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে এই পরিস্থিতিতে তেল ও গ্যাস খাত সচল রাখা এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স, আনাদোলু এজেন্সি ও দ্য ন্যাশনাল
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


