নাব্য সংকটে বাঁশখালীর শঙ্খ নদী, জেগে উঠেছে অসংখ্য চর

নাব্য সংকটে বাঁশখালীর শঙ্খ নদী, জেগে উঠেছে অসংখ্য চর

দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান শঙ্খ নদী নাব্য সংকটে হারিয়েছে জৌলুস। এই নদীর বুকে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর । এতে জীবিকা হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন কয়েক হাজার জেলে ও মাঝি ।

জানা গেছে, চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, সাতকানিয়া ও চন্দনাইশের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া শঙ্খ নদীতে নৌকা চালিয়ে ও মাছ ধরে হাজার হাজার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করতেন। শঙ্খ নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম ব্যবসাকেন্দ্র ঐতিহ্যবাহী ইশ্বর বাবুরহাট। খুবই জৌলুসপূর্ণ ছিল ওই হাট। সাগরদ্বীপ কুতুবদিয়াসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলার লোকজন ডিঙি নৌকা ও সাম্পান চালিয়ে বাজার করতে আসতেন এই হাটে। ইশ্বর বাবুরহাট সেই সময়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের ‘সিঙ্গাপুর’ হিসেবেও পরিচিত ছিল। এই নদীতে শত শত জেলে মাছ ধরে, তা বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। শত শত মাঝিমাল্লা নৌকা চালিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার চালাতেন। তাই মানুষের জীবনজীবিকা ধারণের এই নদীটি এক সময় জৌলুসপূর্ণ ছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী এ অঞ্চলের প্রধান যোগাযোগমাধ্যম ছিল এই শঙ্খ নদী। নদীপথে লবণ পরিবহনের সহজলভ্যতার কারণে দোহাজারী ও পটিয়াতে গড়ে উঠেছিল লবণ শিল্প এলাকা। এখনো বেশ কয়েকটি লবণ মিল ওখানে রয়েছে। সেই সময়ে নদীর প্রশস্ততা কম হলেও গভীরতা ছিল বেশি। সারাবছর পানি থাকত নদীতে। বান্দরবান থেকে বঙ্গোপসাগরের মোহনা পর্যন্ত যতগুলো বাণিজ্যিক স্থান ছিল, প্রায় সবগুলোতেই অসংখ্য নৌকা, সাম্পান ও ইঞ্জিনচালিত বোটের দাপট ছিল। ভিড় তো ছোট ছোট বাণিজ্যিক জাহাজও। ব্যবসায়ীরা এসব নৌযানের সাহায্যে তাদের পণ্যসামগ্রী আনা-নেওয়া করত। নাব্য হারিয়ে ফেলায়, এখন শঙ্খের অনেক জায়গায় ডিঙি নৌকাও চলতে পারছে না। কালের পরিক্রমায় শঙ্খ নদীর প্রশস্ততা বৃদ্ধি পেলেও কমতে থাকে গভীরতা। ফলে শীত মৌসুমে নদীতে পানি কমে যায় এবং হাজার হাজার মাঝি নৌকা চালাতে না পেরে বেকার হয়ে পড়েছেন। নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ায়, নদী কেন্দ্রিক যোগাযোগমাধ্যমও প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

ইশ্বর বাবুরহাট সংলগ্ন এলাকার জলদাস পাড়ার বাসিন্দা গোপাল জলদাস জানান, নানান প্রকার সুস্বাদু মাছের অন্যতম প্রজনন ক্ষেত্রছিল মিঠা পানির এ শঙ্খ নদী। এ নদীর মাছ আহরণ করে তার পূর্ব পুরুষসহ হাজার হাজার জেলে পরিবার জীবন নির্বাহ করেছেন। চিংড়ি, চিরিং, বাইলা, বোয়াল, রুই, কাতাল, পাঙাশ, আইড় মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত এ নদীতে। পূর্বের সেই চিত্র এখন আর দেখা যায় না।

পুকুরিয়া ইউনিয়নের ফরিদ আহমদ মেম্বার বলেন, প্রতিনিয়ত অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে প্রতিদিন ভাঙছে শঙ্খ নদীর তীর। সম্প্রতি নদীভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে নুরুল কবির, রুহুল কবির, আজিজুল হক ও আবদুল মোনাফের ভিটেমাটি। অবিলম্বে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ এবং পরিকল্পিত টেকসই প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণসহ পরিকল্পিতভাবে নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্য ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপবিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল জানান, প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বান্দরবান, চন্দনাইশের ধোপাছড়িসহ বিভিন্ন পাহাড়ে অতিরিক্ত গাছ কাটার ফলে, পাহাড়ের শক্ত মাটি বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে নদীতে চলে আসে। এতে নদীর কিছুটা গভীরতা কমেছে। নদী শাসনের ব্যাপারে তিনি বলেন, ডলু ও সাঙ্গু নদীর তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় শঙ্খ নদীর বিভিন্ন স্থানে ড্রেজিং চলমান আছে। তবে কিছু কিছু স্থানে স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ড্রেজিংয়ের বদলে প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন