যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করেছে; অথচ যে রাষ্ট্র এসব বসতি গড়ে তুলেছে, অস্ত্র দিয়েছে এবং পুরস্কৃত করেছে, তাকে ছাড় দিয়েছে। পশ্চিমা মহলে পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে তীব্র ও কঠোর নিন্দা ক্রমেই বাড়ছে; তবে পূর্ব জেরুজালেম বা গোলান মালভূমির বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে নয়।
চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করেছে। গাজায় ইসরাইলের ‘গণহত্যার’ প্রধান পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে থাকা দেশগুলো এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও অন্যান্য দেশ যে বয়কট অনেক আগে শুরু করেছিল, তাতে যোগ দিয়েছে। বসতিগুলোর পণ্য কেনাবেচা শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ছিল।
ইসরাইলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও পশ্চিম তীর সফর করে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বলে নিন্দা করেছেন। তবে তিনি ইউরোপীয় বয়কটের বিরোধিতা করে একে ‘ইহুদি জনগণের বিরুদ্ধে বৈষম্য’ বলে অভিহিত করেছেন এবং ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড, যিনি নিজেও ইহুদি ও জায়নবাদী, তাকে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ বলে অভিযুক্ত করেছেন।
এদিকে পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতিগুলোর বিরুদ্ধে বয়কট ঘোষণা করা ইউরোপীয় দেশগুলো ও কানাডা ইসরাইল রাষ্ট্র থেকেই পণ্য আমদানি অব্যাহত রাখবে। যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে ইসরাইলও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ১১ জন ব্রিটিশ এমপিকে ইসরাইল নিয়ন্ত্রিত যেকোনো এলাকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা এবং জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।
বিষয়টি আসলে কী? ইউরোপীয় দেশ ও কানাডা হঠাৎ করে পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে কেন একজোট হচ্ছে? বসতি স্থাপনকারীরা এমন কী করেছে, যার কারণে তাদের বিরুদ্ধে এত কঠোর নিন্দা ও বয়কটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে?
বয়কটের সমর্থকেরা বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধির কথা বলছেন। এর অর্থ হলো—আগের বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বয়কটের জন্য যথেষ্ট ছিল না। তারা ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের পরামর্শমূলক মতামতের ওপরও বয়কটের ভিত্তি দাঁড় করিয়েছে। ওই মতামতে আদালত অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজায় ইসরাইলের অব্যাহত উপস্থিতিকে বেআইনি বলে মত দেয়।
তবে পূর্ব জেরুজালেম, গাজা, পশ্চিম তীর এবং সিরিয়ার গোলান মালভূমিতে ইসরাইলি দখলদারিত্ব ও ইহুদি বসতি স্থাপনকে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯৬৭ সালের নভেম্বরেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৪২ নম্বর প্রস্তাবে যুদ্ধের মাধ্যমে ভূখণ্ড দখলের অগ্রহণযোগ্যতার কথা বলা হয় এবং ওই বছর দখল করা ভূখণ্ড থেকে ইসরাইলি সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়।
তাহলে এই ‘অসহায়’ বসতি স্থাপনকারীদের ওপরই কেন এত বেশি প্রতিক্রিয়ার বোঝা চাপানো হচ্ছে, যখন তারা এই ব্যাপক নিপীড়নের ক্ষেত্রে কেবল অপেক্ষাকৃত ছোট খেলোয়াড়?
১৯৭৯ সালের মার্চে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ৪৪৬ নম্বর প্রস্তাবে ইসরাইলি বসতিগুলোর কোনো আইনি বৈধতা নেই বলে ঘোষণা করা হয়। ১৯৮০ সালের মার্চে ৪৬৫ নম্বর প্রস্তাবে ইসরাইলের বসতি স্থাপন নীতিকে চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ‘চরম লঙ্ঘন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স উভয়ই ২৪২ ও ৪৬৫ নম্বর প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিল; ফ্রান্স ৪৪৬ নম্বর প্রস্তাবের পক্ষেও ভোট দেয় এবং যুক্তরাজ্য ভোটদানে বিরত থাকে।
২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের পরামর্শমূলক মতামত মূলত এসব জাতিসংঘের প্রস্তাবকে আরো শক্তিশালী ও বিস্তৃত করেছে; বসতিগুলো বেআইনি—এ বিষয়ে নতুন কোনো ভিত্তি তৈরি করেনি।
এ ছাড়া পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সংঘটিত সহিংসতা—গাজা ও পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিদের কথা বাদ দিলেও—ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতার তুলনায় অনেক বেশি। ১৯৬৭ সালে ইসরাইলি সেনাবাহিনী ৩ লাখ ফিলিস্তিনিকে বিতাড়িত করে এবং এরপর থেকে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। বিপরীতে বসতিস্থাপনকারীরা সর্বোচ্চ কয়েক ডজন মানুষকে হত্যা এবং আরো কয়েকশ মানুষকে বিতাড়িত করেছে।
তারপরও ইসরাইলের বিরুদ্ধে, কিংবা অন্তত তার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো বয়কট ঘোষণা করা হয়নি। এর ফলে এমন ধারণা তৈরি হয় যে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সহিংসতাকে শাস্তিযোগ্য গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।
জায়নবাদী আন্দোলন এবং ইসরাইলি রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনী ১৮৮০-এর দশক থেকে ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর যে ব্যাপক নিপীড়ন চালিয়ে আসছে, সেখানে বসতিস্থাপনকারীরা যদি কেবল ছোট খেলোয়াড় হয়, তাহলে সেই বড় পরিসরের নিপীড়নের প্রতিক্রিয়ার বোঝা এই ‘অসহায়’ বসতিস্থাপনকারীদের ওপরই কেন চাপানো হচ্ছে?
বাইবেলভিত্তিক দাবি
১৯৪৮ সালের মে মাসের আগে সামরিক বাহিনীর মতো সংগঠিত ইহুদি বসতি স্থাপনকারী দলগুলো এবং পরবর্তীতে ইসরাইলি সেনাবাহিনী ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ সালের ফিলিস্তিনে জায়নবাদী বিজয়ের সময় প্রায় ৮ লাখ স্থানীয় ফিলিস্তিনিকে বিতাড়িত এবং ১৩ হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল। তারা জৈবিক যুদ্ধেও জড়িত ছিল। তারা ফিলিস্তিনি গ্রামের কূপে টাইফয়েড ও আমাশয়ের ব্যাকটেরিয়া বিষ হিসেবে প্রয়োগ করেছিল এবং বসতিস্থাপনকারীদের নেতা ডেভিড বেন-গুরিয়ন এর তত্ত্বাবধান করেছিলেন।
বর্তমান পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতিস্থাপনকারীরা যদি পশ্চিম তীর দখলের ব্যাখ্যা দিতে বাইবেলের আশ্রয় নেন, তাহলে ১৯৬৭ সালের আগে ও পরেও ইসরাইলের তথাকথিত ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ইহুদি বসতি-নেতারাও একই কাজ করেছেন। বেন-গুরিয়ন বারবার স্মরণ করিয়ে দিতেন যে ‘ঈশ্বর আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন’।
১৯৫৬ সালে বেন-গুরিয়ন ‘আরবদের’ ‘আমালেক’ হিসেবেও উল্লেখ করেছিলেন। একইভাবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি কূপে বিষ প্রয়োগের অভিযানের নাম দিয়েছিল ‘অপারেশন কাস্ট দাই ব্রেড’, যা বাইবেলের উপদেশক গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছিল।
১৯৪৮ সালে বাইবেলের বিভিন্ন চরিত্রের নামে ইসরাইলি সামরিক অভিযানের মধ্যে ছিল ‘অপারেশন নাখশোন’, ‘অপারেশন ইফতাখ’ ও ‘অপারেশন ইয়োয়াভ’। বাইবেল থেকে সামরিক অভিযানের নাম নেওয়ার এই প্রবণতা এখনও অব্যাহত আছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ এবং ২০১২ সালে গাজার ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য ‘পিলার অব ডিফেন্স’ নাম ব্যবহার করা হয়েছিল।
এমনকি ইসরাইলের অস্ত্রেরও বাইবেলভিত্তিক নাম রয়েছে। যেমন ‘জেরিকো’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘ডেভিডস স্লিং’ ক্ষেপণাস্ত্র। দেশটির ট্যাংকের নাম ‘মেরকাভা’, যার অর্থ রথ; এটি ইজিকিয়েল গ্রন্থের একটি উল্লেখের সঙ্গে সম্পর্কিত।
২০০০-এর দশকে বসতিস্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোর কূপ ও পানির উৎসে নোংরা ডায়াপার ও অন্যান্য দূষিত বস্তু ফেলে ইচ্ছাকৃতভাবে দূষিত করেছিল। ১৯৪৮ সালে বেন-গুরিয়ন যেমন জায়নবাদী গবেষণাগারে তৈরি জৈবিক উপাদান ব্যবহার করেছিলেন, তারা তেমন কিছু করেনি।
বর্তমান ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরে পোগ্রোম বা সাম্প্রদায়িক হত্যাযজ্ঞ চালালেও ১৯৪৮ সালের জায়নবাদী বসতি স্থাপনকারীরা ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। বর্তমানের তুলনামূলক কম সহিংস বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গাজায় চলমান ‘গণহত্যার’ তুলনা চলে না।
১৯৪৮ সালের আগে ও পরের ইসরাইলের ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের মতো ১৯৬৭-পরবর্তী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা, বিশেষ করে আমেরিকান বসতি স্থাপনকারীরা, বেন-গুরিয়নের মতো একই বাইবেলভিত্তিক দাবি করেন—ঈশ্বর তাদের ‘জুডিয়া ও সামারিয়া’ দিয়েছেন। তারা নতুন কোনো দাবি সামনে আনছেন না।
বাছাই করে শাস্তি
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের ‘গণহত্যা’ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী পশ্চিম তীরে ১ হাজার ২০০-এর বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, যাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিশু।
শুধু ২০২৬ সালেই ইসরাইলি সেনাবাহিনী ও ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের হাতে পশ্চিম তীরে প্রায় ১০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৯ জন শিশু। এর মধ্যে ২৩ জন বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় নিহত হয়েছে। একই সময়ে, গত কয়েক মাসে ইসরাইলি সেনাবাহিনী পশ্চিম তীরের কয়েকটি শরণার্থী শিবির ব্যাপকভাবে ধ্বংস করেছে এবং সেখানকার বাসিন্দাদের বিতাড়িত করেছে।
ইসরাইলি বসতি নিয়ে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রতীকী। এটি কার্যকর করতে হলে ইসরাইলকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনতে হবে।
ইউরোপীয় ও কানাডীয় দেশগুলোর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথাকথিত ‘দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের’ সম্ভাবনা নষ্ট করেছে বসতিস্থাপনকারীরা নয়, বরং ইসরাইলি সরকার ও সামরিক বাহিনী—লেখক এমন দাবি করেন। বসতিগুলোর বিরুদ্ধে বয়কটের পক্ষে যুক্তি হিসেবে এই ‘সমাধান’ রক্ষার কথা বলা হয়েছে।
ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদ ও উপনিবেশ স্থাপনের পেছনে প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হলো সরকার ও সেনাবাহিনী। বসতি স্থাপনকারীরা কেবল তাদের পদাতিক বাহিনীর মতো কাজ করে। অথচ বয়কটের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে তাদেরই। এটি গুরুতর অবিচার, অবিলম্বে এর বিরোধিতা ও প্রতিকারের আহ্বান জানাই।
ইউরোপীয় ও কানাডীয় দেশগুলো—যারা ইসরাইলের দখলদারত্ব ও ‘গণহত্যার’ পৃষ্ঠপোষক, আবার যারা এর বিরোধিতাও করে—যদি ন্যায়সংগত হতে চায় এবং ইসরাইলের ‘ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদী শাসন’ ও ফিলিস্তিনি ভূমিতে উপনিবেশ স্থাপন বন্ধ করতে চায়, তাহলে কয়েকজন অসহায় বসতিস্থাপনকারীকে শাস্তি না দিয়ে ইসরাইল রাষ্ট্রকেই শাস্তি দেওয়া উচিত। কারণ, রাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন ছাড়া ওই বসতিস্থাপনকারীরা ক্ষমতাহীন।
বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার ১২ দেশের সিদ্ধান্ত ইহুদি বসতিগুলোর অর্থনীতিতে কোনো প্রভাবই ফেলবে না এবং ইহুদি উপনিবেশ স্থাপন বন্ধ করবে না। কারণ, এসব বাণিজ্যের পরিমাণ ওই দেশগুলোর ইসরাইলের সঙ্গে করা বিপুল বাণিজ্যের তুলনায় খুবই সামান্য।
কেবল ইসরাইল রাষ্ট্র ও তার সব অঙ্গের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ও নিঃশর্ত বয়কটই কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে পারে। আর সেটিই হবে বসতিস্থাপনকারীদের প্রতিও ন্যায্য আচরণ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


