বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, জুলাই সনদ পুরোটা মানলে প্রধানমন্ত্রীর অসীম ক্ষমতা থাকবে না। হাসিনার মতো যা ইচ্ছা তাই করতে চান বলেই বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের প্রধানমন্ত্রী জুলাই সনদকে এড়িয়ে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কার বাদ দিলে রাষ্ট্র কাঠামোয় ফ্যাসিবাদী চরিত্র কখনো দূর হবে না। এ রকম সংবিধানে যারাই নির্বাচনে ক্ষমতায় আসবে, তারা আরেকজন হাসিনা হয়ে ফ্যাসিবাদের জন্ম দেবে।
তিনি সোমবার বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) উদ্যোগে ‘জুলাই বিপ্লব: স্বাস্থ্য খাতের অবদান ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোট মানতেই হবে। কারণ এতে কোনো নোট অব ডিসেন্ট নেই, নোট অব ডিসেন্ট আছে জুলাই সনদে। এজন্য তারা জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে মানার কথা বললেও গণভোটের রায় মানার কথা বলে না।
তিনি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা গেলেই শহীদদের স্বপ্ন পূরণের আশা বাস্তবায়ন হবে। তিনি সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এখনো সময় আছে, সামনে সংসদের আরেকটি অধিবেশন আছে। সংবিধান সংস্কার আদেশে আছে, ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদে এই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। আগামী সেপ্টেম্বরে সেই ১৮০ দিন শেষ হচ্ছে। যেহেতু ৩০ দিনে সংস্কার পরিষদের মিটিং ডাকেননি, ট্রেন মিস করেছেন—তাই সংশোধন নয়, সংস্কারের জুলাই সনদ দেখে সংসদে আইন সংশোধনের একটি প্রস্তাব দিলে সেটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট চেয়েছেন। এখন তা অস্বীকার করবেন—এটা কোন ধরনের দ্বিচারিতা? আবার এক মন্ত্রী বলছেন, ভোট হয় কি না—সেজন্য এটা বলেছি। ভোট হবে না কেন? লন্ডন বৈঠকেই তো একদিনে দুই ভোট ঠিক করে এসেছেন। আমরা তো আগে গণভোট ও স্থানীয় নির্বাচন চেয়েছিলাম, তারা সেটা হতে দেয়নি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটকে অস্বীকার করলে মন্ত্রিত্ব, সংসদ ও সরকার থাকে না। প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারের বিরুদ্ধে সংসদে দাঁড়িয়ে কিসের ভিত্তিতে কথা বলছেন? এর ব্যাখ্যা একমাত্র আদালত দিতে পারে। গণভোটের চারটি প্রশ্নে কোনো নোট অব ডিসেন্ট নেই।
তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের উদ্দেশ্য শুধু সরকার পরিবর্তন নয়। পরিবর্তনের পর সংস্কার ছাড়া যারাই ক্ষমতায় আসবে, তারা হাসিনার মতো আরেকটি ফ্যাসিবাদ হিসেবে জন্ম নেবে। সরকার সংস্কারের পরিবর্তে সংশোধনের কথা বলছে। আমরা সংস্কার চাই। রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তনের জন্য সংশোধন নয়, সংস্কার প্রয়োজন। যেটা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে একটি কাঠামো করে দেওয়া হয়েছে, এমপিরা দুটি দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদ সদস্য ও সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে তারা শপথ নেবেন। কিন্তু সংবিধানে নেই দাবি করে সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। ১১ দলের সদস্যরা দুটিরই শপথ নিয়েছেন।
তিনি বলেন, সংসদে এই পদ্ধতিতে সংবিধানের সংস্কার করা যাবে না, এটা আইনের লঙ্ঘন। প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারের লঙ্ঘন। বিএনপি সেই জটিলতা তৈরি করেছে। ফলে বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন কীভাবে বাস্তবায়ন হবে? জুলাই সনদ ও সংস্কারকে এড়িয়ে আসলে শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্বাস ভঙ্গ করা হচ্ছে। এত নির্জলা দেওয়া কথা যখন ভঙ্গ করেন, তখন মুনাফেকি হয় না? একটি ভোট মানবেন, আরেকটি মানবেন না—এটা দ্বিচারিতা নয়?
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, জুলাই বিপ্লবে একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন ছিল। সব দলীয়করণের ঊর্ধ্বে এমন রাষ্ট্র হবে, যাতে বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক নতুন বাংলাদেশ হবে। সেটা যদি প্রতিষ্ঠিত হতো, তাহলে কি সংসদে জুলাই বিপ্লবের বিরুদ্ধে এত কথা বলতে পারতেন?
তিনি বলেন, চিকিৎসকরা শুধু জুলাইয়ের সময় বঞ্চিত হননি, বর্তমান সরকারের সময়ও নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তারা আবারও ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটতে শুরু করেছেন।
তিনি বলেন, দেশের চিকিৎসক, বিশেষ করে এনডিএফের ছায়াতলে থেকে যারা জুলাইযোদ্ধাদের সেবা দিয়েছেন, তাদের যথাযথ সম্মান হয়তো রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা দেবে না, কিন্তু মহান আল্লাহর কাছে নিশ্চয়ই প্রতিদান পাবেন। ইতিহাসে আপনাদের নাম লেখা থাকবে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, রাসুলের (সা.) বিভিন্ন যুদ্ধের সময় সাহাবিরা এমনকি মহিলারাও চিকিৎসাসহ নানাভাবে সহায়তায় এগিয়ে আসেন। ছাত্ররা চোখ, হাত-পা না হারালে এই নতুন বাংলাদেশের মুখ দেখা অসম্ভব ছিল।
তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর আশা করেছিলাম—সরকার জুলাইযোদ্ধাদের ছবি সুন্দরভাবে বাঁধিয়ে রাখবে। অথচ সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে কৌশলে বারুদের চেয়ে শক্তিশালী স্লোগানগুলো মুছে ফেলা হচ্ছে। জুলাইয়ের ঐতিহাসিক ডকুমেন্টগুলো শিক্ষার্থীদের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ড. মাসুদ পদত্যাগকারী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রসঙ্গে বলেন, আমরা যখন সংসদে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ওয়াকআউট করেছি, তখন সরকারি দল টেবিল চাপড়িয়ে তাকে স্বাগত জানিয়েছে। এতদিন তাকে রেখে দিয়ে নিশ্চয় কিছু সুবিধা নিয়েছে। আজকে ফ্যাসিস্টের দোসরকে সরালেন। শুধু সরালেই হবে না, তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে।
মির্জা ফখরুলকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ফ্যাসিস্টের মতো এখন জুলাই আহতদের চিকিৎসায় ভূমিকা রাখা যেসব চিকিৎসককে বদলি করা হচ্ছে, এরপরও ফ্যাসিস্ট হওয়ার আলামত না বুঝলে তা আপনাদের বোঝার দৈন্যতার শামিল।
তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকার ইসলাম আতঙ্কে ভুগত আর বর্তমান সরকার সংস্কার আতঙ্কে ভুগছে। ছাত্ররা সংস্কারের জন্য আন্দোলন করেছে, সংশোধনের জন্য নয়। তাই সংস্কার না করে সংশোধনের কথা বলা জাতির সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।
ডা. মোসলেহউদ্দিন ফরিদ এমপি বলেন, জুলাই আহত রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আমরা প্রায় ১০০ কোটি টাকা সরকারের সেফ করেছি। আহতদের অনেকে এখন মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। আমরা লন্ডন থেকে টিম এনে মানসিক চিকিৎসার কাজ করছি। সবাই মিলেই আমরা এগিয়ে যাব।
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় চিকিৎসকরা অনেক ঝুঁকি ও বাধা-বিঘ্ন উপেক্ষা করে আহতদের চিকিৎসা দিয়েছেন। সমন্বয়কদের সেফ করেছেন। এক্ষেত্রে এনডিএফ সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে। অথচ বর্তমানে আবার ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসন ও ত্যাগী চিকিৎসকদের বদলি করে জুলুম করা হচ্ছে।
চিকিৎসা কার্যক্রমের স্মৃতিচারণ করে অধ্যাপক ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, সেদিন আহত-গুলিবিদ্ধ জুলাইযোদ্ধাদের চিকিৎসা নিতে দিচ্ছিল না ফ্যাসিবাদী সরকার। এই জুলাইকে ভোলা যাবে না।
এনডিএফ সহ-সভাপতি ডা. মো. আতিয়ার রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে কী-নোট উপস্থাপন করেন ঢাকা মেডিকেলের সহকারী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সুজন শরীফ। আরও বক্তব্য রাখেন হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপি, অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক ডা. শহীদুল ইসলাম, ডিইউজে সভাপতি ও মানবকণ্ঠ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, ডাকসু সদস্য হাসিব আব্দুল্লাহ প্রমুখ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


