যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আটকে থাকা সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর ইঙ্গিত মিলছে। এমন পরিস্থিতিতে কাতারের একটি মধ্যস্থতাকারী দল জরুরি ভিত্তিতে তেহরানে পৌঁছেছে।
মূল লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করা, যা পরবর্তীতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ৩০ দিনের আলোচনার পথ সুগম করবে। এর মাধ্যমে ইরানের কাছে থাকা উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তরের যে দাবি যুক্তরাষ্ট্র জানিয়ে আসছিল, সেই আলোচনা আপাতত স্থগিত থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে দক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত কাতার এতদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই সংকটে সরাসরি মধ্যস্থতা করেনি। শুরুতে ওমান এবং সম্প্রতি পাকিস্তান এ দায়িত্ব পালন করে আসছিল। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরেরও তেহরানে যাওয়ার কথা রয়েছে, তবে ইরান কোনো বড় অগ্রগতির সম্ভাবনাকে আপাতত মৃদু করে দেখাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ‘সামান্য অগ্রগতি’ হলেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর শুল্ক বা টোল আরোপের কোনো ক্ষমতা ইরানকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না।
তিনি স্পষ্ট করেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পাকিস্তানই প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে থাকছে।
এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন করে সামরিক হামলার কথা বিবেচনা করছে, যদিও অ্যাক্সিওস এবং সিবিএস জানিয়েছে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
ট্রাম্প ‘সরকার পরিচালনাসংক্রান্ত পরিস্থিতি এবং দেশের প্রতি ভালোবাসার’ কারণে এ সপ্তাহে তার ছেলের বিয়েতে অংশ নিতে যাবেন না এমন বক্তব্য দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন গণমাধ্যমে এই সামরিক হামলার খবর সামনে এলো।
ইরান ইতোমধ্যে ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ (পিজিএসএ) গঠন করেছে, যা জাহাজের ওপর টোল আরোপ করবে এবং নির্দিষ্ট সমুদ্রপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের নির্দেশনা দেবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র জোর দিয়ে বলেছে, টোল আরোপের কোনো সুযোগ নেই।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সতর্ক করে বলেছেন, ইরান হয়তো আলোচনার টেবিলে অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের ‘নিজেদের কার্ড বা সক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেখার প্রবণতা রয়েছে।’
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী মহসেন নকভি শুক্রবার সকালে দুই দিনের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, পাকিস্তান যেকোনো চুক্তির জামিনদার হিসেবে চীনকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করতে পারে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের শনিবার বেইজিং যাওয়ার কথা রয়েছে।
ইরান জোর দিয়ে বলেছে, তারা তাদের পরমাণু কর্মসূচির সমস্ত আলোচনা স্থগিত করতে চায় এবং তার পরিবর্তে স্থায়ীভাবে শত্রুতা অবসানের দিকে মনোনিবেশ করতে চায়।
তারা আশা করছে, এর মধ্যে ধাপে ধাপে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদ অবমুক্ত করা, মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে শক্তি প্রয়োগ না করার প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনাই এই বিরোধের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। পাকিস্তান জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় যৌথ নিয়ন্ত্রণের একটি পরিকল্পনা উত্থাপন করেছে।
এদিকে বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই পাঁচ উপসাগরীয় দেশ বিশ্ব জাহাজ চলাচল তদারকি সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অথরিটি’র কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছে।
চিঠিতে তারা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ইরানের পিজিএসএ-এর সাথে কোনো যোগাযোগ না করার আহ্বান জানিয়েছে। এই তালিকায় ওমান অন্তর্ভুক্ত নেই। তবে প্রস্তাব অনুযায়ী ওমান এই প্রণালির দক্ষিণ অংশের দায়িত্বে থাকলেও তেহরানের এই প্রস্তাব নিয়ে তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
চিঠিতে ওই পাঁচ দেশ সতর্ক করে বলেছে, ‘ইরানের এই কথিত রুটটিকে তার আসল রূপেই দেখা উচিত, এটি মূলত তাদের আঞ্চলিক সমুদ্রসীমার ভেতরের পথ ব্যবহারে জাহাজগুলোকে বাধ্য করে প্রণালির ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করার একটি প্রচেষ্টা, যা টোল ফি আরোপের মাধ্যমে আর্থিক লাভের জন্য অপব্যবহার করা হতে পারে। ইরানের প্রস্তাবিত রুট এবং পিজিএসএ-কে বিকল্প হিসেবে মেনে নেওয়া বা স্বীকৃতি দেওয়া একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করবে।’
সুইডেনে ন্যাটোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকে রুবিও বলেন, ‘ইরান একটি টোল ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে। তারা ওমানকেও আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় এই টোল ব্যবস্থায় যোগ দিতে রাজি করানোর চেষ্টা করছে। বিশ্বের কোনো দেশেরই এটি মেনে নেওয়া উচিত নয়।’
প্রণালিটি উন্মুক্ত রাখতে ইউরোপ আরো বেশি ভূমিকা না রাখায় তিনি আবারো হতাশা প্রকাশ করেন।
এদিকে বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমিয়ে রাখার প্রয়োজনীয়তা থেকেই ওয়াশিংটন আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে নানামুখী বক্তব্য দিচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘এই পর্যায়ে আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো লেবাননসহ সমস্ত ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা পরমাণু সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে যে দাবি করা হচ্ছে, তা কেবলই অনুমাননির্ভর এবং এর কোনো নির্ভরযোগ্যতা নেই।’
গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প ইরানের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, বাঘাই মূলত সেই জল্পনা-কল্পনার দিকে ইঙ্গিত করছিলেন। ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমরা এটি পেয়ে যাব। আমাদের এটির প্রয়োজন নেই, আমরা এটি চাইও না। পাওয়ার পর সম্ভবত আমরা এটি ধ্বংস করে দেব, কিন্তু তাদের এটি আমরা নিজেদের কাছে রাখতে দেব না।’
রাশিয়া এই ইউরেনিয়ামের মজুদ গ্রহণ করার প্রস্তাব দিলেও ইরান জানিয়েছে, তারা দেশের ভেতরেই এই মজুদের সমৃদ্ধকরণ মাত্রা কমিয়ে ফেলবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


