সাপের কামড়ে করণীয়

ডা. নুসরাত শোয়াইব

সাপের কামড়ে করণীয়

বাংলাদেশে সাপের কামড় একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল, কৃষিজমি ও জলাভূমি-সংলগ্ন এলাকায় এর ঝুঁকি বেশি। সাপের কামড়ের পর আতঙ্ক, ওঝা-কবিরাজের কাছে যাওয়া, ক্ষত কেটে দেওয়া, বিষ চুষে বের করার চেষ্টা কিংবা শক্ত করে দড়ি বাঁধার মতো ভুল পদ্ধতির কারণে রোগীর অবস্থা আরো জটিল হতে পারে। সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—সব সাপ বিষধর নয় । সব বিষধর সাপের কামড়ে একই ধরনের উপসর্গ হয় না। তাই সাপের ধরন অনুমান করে ঘরে চিকিৎসা না করে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। যেখানে জরুরি চিকিৎসা ও প্রয়োজনে অ্যান্টি-স্নেক ভেনম দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সাপ কামড়ালে প্রথম কাজ কী

সাপ কামড়ানোর পর রোগী ও স্বজনদের প্রথম কাজ হলো আতঙ্কিত না হওয়া এবং দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার ব্যবস্থা করা। আতঙ্ক ও অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া বিষ শরীরে ছড়িয়ে পড়ার গতি বাড়াতে পারে। রোগীকে যতটা সম্ভব শান্ত ও স্থির রাখতে হবে। সম্ভব হলে স্প্লিন্ট বা উপযুক্ত সহায়তা দিয়ে স্থির রাখতে হবে। রোগীকে হাঁটিয়ে হাসপাতালে নেওয়া উচিত নয়, সম্ভব হলে বহন করে বা স্ট্রেচারে নেওয়া ভালো। কামড়ের স্থান ফুলে যেতে পারে, তাই আক্রান্ত অঙ্গের আংটি, চুড়ি, পায়ের নূপুর বা অন্য আঁটসাঁট জিনিস দ্রুত খুলে ফেলতে হবে।

যা কোনোভাবেই করা যাবে না

সাপের কামড়ের পর কিছু প্রচলিত পদ্ধতি অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে।

* দড়ি বা টর্নিকেট দিয়ে শক্ত করে বাঁধা যাবে না। এতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, এমনকি অঙ্গের গুরুতর ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। বিশেষভাবে শক্তি ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছে।

* ক্ষতস্থান ব্লেড বা ছুরি দিয়ে কাটা যাবে না। এতে অতিরিক্ত রক্তপাত, সংক্রমণ ও টিস্যু ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে।

* ক্ষত চেপে বিষ বের করার চেষ্টা করা যাবে না।

* মুখ দিয়ে বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করা যাবে না।

* কালো পাথর, ভেষজ ওষুধ, রাসায়নিক পদার্থ, আগুন বা গরম বস্তু দিয়ে চিকিৎসা করা যাবে না।

* ওঝা, কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করে হাসপাতালে যেতে দেরি করা যাবে না।

* ক্ষত কাটা, বিষ চোষা, ‘ব্ল্যাক স্টোন’ এবং অন্যান্য অপ্রমাণিত পদ্ধতি এড়িয়ে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

ব্যান্ডেজ বা চাপ প্রয়োগে সতর্কতা

সাপের কামড়ে ব্যান্ডেজ ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে অনেক সময় বিভ্রান্তি দেখা যায়। সব ধরনের সাপের কামড়ে শক্ত করে দেওয়া নিরাপদ বা উপযোগী নয়। বিশেষ করে যেসব সাপের বিষ স্থানীয়ভাবে মারাত্মক টিস্যু ক্ষতি ও ফুলে যাওয়া সৃষ্টি করে, সেখানে ভুলভাবে চাপ প্রয়োগ করলে ক্ষতি হতে পারে।

হাসপাতালে পৌঁছানোর পর

সাপের কামড়ের রোগী হাসপাতালে পৌঁছালে প্রথমেই রোগীর জীবন-সংকট আছে কি না, তা মূল্যায়ন করা হয়। চিকিৎসকরা সাধারণত—

* শ্বাসনালি খোলা আছে কি না পরীক্ষা করুন।

* শ্বাস-প্রশ্বাস ও অক্সিজেনের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করুন।

* রক্তচাপ, নাড়ির গতি ও অন্যান্য পরীক্ষা করুন।

* রোগীর স্নায়ুবিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করুন।

* কামড়ের স্থান ও শরীরের অন্যান্য অংশে ফোলা, রক্তপাত বা টিস্যু ক্ষতি আছে কি না দেখুন।

* প্রয়োজনে শিরায় ক্যানুলা স্থাপন করুন।

* রক্ত ও প্রস্রাবের বিভিন্ন পরীক্ষা করুন।

নিউরোটক্সিক বিষের ক্ষেত্রে রোগীর চোখের পাতা পড়ে যাওয়া, কথা বলা বা গিলতে অসুবিধা এবং শ্বাসের পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। কারণ গুরুতর নিউরোটক্সিক বিষক্রিয়ায় শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং তখন দ্রুত ও প্রয়োজনে জীবন রক্ষা করতে পারে।

কোন ধরনের বিষক্রিয়া হতে পারে

সাপের বিষের প্রভাব সাপের প্রজাতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় চিকিৎসাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাপের মধ্যে কোবরা, ক্রেইট বা কালাচ এবং বিভিন্ন ভাইপার প্রজাতি উল্লেখযোগ্য।

নিউরোটক্সিক বিষ

কোবরা ও ক্রেইটের মতো কিছু সাপের বিষ প্রধানত স্নায়ুতন্ত্র ও শ্বাস-প্রশ্বাসের পেশিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। লক্ষণগুলোর মধ্যে থাকতে পারে—

* চোখের পাতা পড়ে যাওয়া বা ঝুলে যাওয়া।

* দ্বিদৃষ্টি।

* কথা বলতে বা গিলতে অসুবিধা।

* মুখ ও ঘাড়ের পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া।

* ক্রমশ শ্বাস নিতে অসুবিধা।

* গুরুতর ক্ষেত্রে শ্বাসযন্ত্রের পক্ষাঘাত।

এ ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। প্রয়োজনে ভেন্টিলেটরসহ শ্বাস-প্রশ্বাসের সহায়তা দিতে হতে পারে।

কখন অ্যান্টিভেনম প্রয়োজন

অ্যান্টিভেনম সাপের কামড়ের চিকিৎসার প্রধান ও জীবনরক্ষাকারী নির্দিষ্ট চিকিৎসা। তবে শুধু সাপ কামড়েছে বলেই প্রত্যেক রোগীকে অ্যান্টিভেনম দিতে হবে—এমন নয়।

বিষক্রিয়ার ক্লিনিক্যাল প্রমাণ থাকলে, যেমন—

* নিউরোটক্সিক লক্ষণ।

* শ্বাস-প্রশ্বাসের দুর্বলতা।

* রক্ত জমাট বাঁধার গুরুতর সমস্যা।

* উল্লেখযোগ্য বা অগ্রসরমান স্থানীয় ফোলা ও টিস্যু ক্ষতি।

* গুরুতর রক্তপাত।

* শক বা রক্তচাপের মারাত্মক পতন।

* বিষক্রিয়াজনিত কিডনি ক্ষতির প্রমাণ।

চিকিৎসক অ্যান্টিভেনম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অ্যান্টিভেনমের প্রকার, পরিমাণ, মিশ্রণ এবং আবার দেওয়ার সময় নির্দিষ্ট করে সবার জন্য একইভাবে বলা যায় না। এগুলো সাপের সম্ভাব্য প্রজাতি, বিষক্রিয়ার ধরন, রোগীর ক্লিনিক্যাল অবস্থা এবং ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনমের প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা ও স্থানীয় জাতীয় চিকিৎসা-প্রটোকল অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হয়।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিস্টেন্ট মেডিকেল কলেজ, ঢাকা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন