বনরক্ষীদের টহল, স্মার্ট প্যাট্রোলিং ও আধুনিক প্রযুক্তির নজরদারিতে সুন্দরবনজুড়ে আশার আলো। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। কেবল গাছপালা আর নদী-খালের সমষ্টি নয়, এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা এক অনন্য প্রাকৃতিক দুর্গ। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, কুমির, বানরসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণী এবং নানা প্রজাতির মাছ, পাখি ও জলজ প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয় এই বন। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে উপকূলের মানুষের জন্য সুন্দরবন যেন প্রকৃতির নিজ হাতে গড়া এক বিশাল প্রাচীর।
তবে দীর্ঘদিন ধরেই সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল চোরা শিকার, অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী নিধন, বিষ দিয়ে মাছ ধরা এবং বনজ সম্পদ ধ্বংসকারী নানা চক্র। একসময় বনের গহিনে ঢুকে হরিণ শিকার করে লোকালয়ে চামড়াসহ হরিণ কিংবা হরিণের মাংস বিক্রির অভিযোগ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাল্টাচ্ছে সেই চিত্র। বনরক্ষীদের নিবিড় নজরদারি, নিয়মিত টহল এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সুন্দরবন সুরক্ষায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
সুন্দরবন বিভাগের পরিসংখ্যান ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর হরিণ শিকার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সুন্দরবন সংলগ্ন লোকালয়েও আগের মতো প্রকাশ্যে হরিণের মাংস বিক্রির খবর পাওয়া যাচ্ছে না। চোরা শিকারিদের তৎপরতাও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
চলতি বছর সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ তিন মাস—জুন, জুলাই ও আগস্টে—হরিণ শিকার প্রতিরোধে বিশেষ সাফল্য পেয়েছে বন বিভাগ। এই সময়ে কোনো হরিণের মাংস, চামড়া কিংবা মৃত হরিণ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেনি। একই সময়ে হরিণ শিকারিদের পেতে রাখা হাজার হাজার ফাঁদ জব্দ করা হয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ওই সময়ে জব্দ করা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৮১ ফুট নাইলন ফাঁদ, ১১০টি ছিটকা ফাঁদ, ৮৬ ফুট হাটা ফাঁদ ও ৬৯টি ভোঁয়া ফাঁদ। পাশাপাশি অবৈধভাবে ব্যবহৃত দুটি নৌকা ও তিনটি ট্রলারও আটক করা হয়েছে।
মাত্র এক বছর আগেও পরিস্থিতি ছিল অনেকটাই ভিন্ন। গত বছরের একই সময়ে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে ২০টি মামলায় ১২ জন শিকারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তখন উদ্ধার করা হয় ১৫৬ দশমিক ৫ কেজি হরিণের মাংস, পাঁচটি মাথা, আটটি পা, দুটি চামড়া ও দুটি মৃত হরিণ। সেই সময় শিকারিদের ব্যবহৃত ফাঁদের সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি।
ফলে চলতি বছরের চিত্রকে সুন্দরবন সুরক্ষায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান ও নিবিড় নজরদারির সুফল ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।
শুধু হরিণ শিকার নয়, সুন্দরবনের জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে ওঠা বিষ দিয়ে মাছ ধরার প্রবণতাও কমেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
বিষ দিয়ে মাছ ধরলে শুধু কাঙ্ক্ষিত মাছই নয়, পানির বিভিন্ন স্তরে থাকা অসংখ্য ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী ও অন্যান্য প্রজাতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে নদী-খাল ও পুরো সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খলে। ফলে বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধে বন বিভাগের কঠোর নজরদারি সুন্দরবনের জলজ পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সুন্দরবন রক্ষায় এখন শুধু প্রচলিত টহলের ওপর নির্ভর করছে না বন বিভাগ। দুর্গম বনাঞ্চলে ফুট প্যাট্রোলিং, স্মার্ট প্যাট্রোলিং ও বোট প্যাট্রোলিংয়ের পাশাপাশি আধুনিক ড্রোন উড়িয়ে নজরদারি চালানো হচ্ছে। দিন-রাত পরিচালিত হচ্ছে বিভিন্ন অভিযান।
বিশাল সুন্দরবনের প্রতিটি খাল,নদী ও গহিন বনাঞ্চলে একই সময়ে মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা কঠিন। সেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার বনরক্ষীদের নজরদারির পরিধিও বাড়িয়ে দিয়েছে। দুর্গম এলাকায় সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্ত করা থেকে শুরু করে শিকারিদের ফাঁদ কিংবা অবৈধ কর্মকাণ্ডের সন্ধান—সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বনজ সম্পদ ধ্বংসকারী চক্র, বিশেষ করে চোরা শিকারি ও বিষ দিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা প্রায় বন্ধের পথে।
সুন্দরবনকে আরও নিরাপদ করতে বনরক্ষীদের শূন্য পদ দ্রুত পূরণ, দ্রুতগতির নৌযান বৃদ্ধি, আরও বেশি ড্রোন ব্যবহারের পাশাপাশি জেলে ও বনজীবীদের নৌযানকে জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারণ সুন্দরবন যত বড়, এর সুরক্ষার চ্যালেঞ্জও তত বিস্তৃত। নদী-খাল, চর, গহিন বন ও দুর্গম এলাকায় ছড়িয়ে থাকা এই বিশাল বনকে রক্ষা করতে প্রয়োজন মানুষের সচেতনতা, প্রশাসনিক তৎপরতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার।
এ ব্যাপারে মোংলা-রামপালের গণমানুষের নেতা,জাতীয় সংসদ সদস্য, বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনকে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, উপকূলীয় নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অমূল্য সম্পদ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, সুন্দরবনের সুরক্ষা শুধু একটি বন রক্ষার বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের পরিবেশের ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা সরাসরি জড়িত।
প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, সুন্দরবন রক্ষায় বন বিভাগের চলমান অভিযান ও নজরদারিকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। চোরা শিকার, বন্যপ্রাণী নিধন, বিষ দিয়ে মাছ ধরা এবং বনজ সম্পদ ধ্বংসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বননির্ভর মানুষের জীবিকা ও সচেতনতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি মনে করেন, সুন্দরবনের প্রতিটি গাছ, নদী-খাল, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অমূল্য আমানত। তাই বনরক্ষীদের জনবল ও সক্ষমতা বাড়ানো, নিয়মিত টহল ও নজরদারি জোরদার করা, আধুনিক প্রযুক্তি ও ড্রোন ব্যবহারের পরিধি বাড়ানো এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে সুন্দরবনকে আরও নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে। সুন্দরবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে একই সঙ্গে দেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় হবে।
বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় বন বিভাগ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন ও প্রযুক্তিনির্ভর। পূর্ব সুন্দরবনের দুর্গম বনাঞ্চলে বনরক্ষীরা নিয়মিত ফুট প্যাট্রোলিং, স্মার্ট প্যাট্রোলিং ও বোট প্যাট্রোলিংসহ দিন-রাত বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করছেন। পাশাপাশি আধুনিক ড্রোন উড়িয়ে নিবিড় নজরদারি করা হচ্ছেে ।
সুন্দরবনের নিরাপত্তা মানেই শুধু বাঘ-হরিণ কিংবা গাছপালা রক্ষা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উপকূলের মানুষের অস্তিত্ব। সুন্দরবন সুস্থ থাকলে নদী-খালের জীববৈচিত্র্য টিকে থাকবে, মাছের প্রজননক্ষেত্র সুরক্ষিত থাকবে, বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাস নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে উপকূলবাসীর সুরক্ষাবর্ম হিসেবেও সুন্দরবন তার ভূমিকা পালন করে যাবে।
একসময় যে বনে চোরা শিকারির পাতা ফাঁদ ছিল আতঙ্কের প্রতীক, সেখানে এখন বনরক্ষীদের টহল ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি তৈরি করছে নতুন আশার বার্তা। হরিণ শিকার কমছে, বিষ দিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আসছে, আর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে বনের প্রাণ-প্রকৃতি।
তবে এই অর্জন ধরে রাখতে হলে নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করতে হবে। কারণ সুন্দরবন কেবল বাংলাদেশের সম্পদ নয়—এটি পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। সুন্দরবনের প্রতিটি গাছ, প্রতিটি নদী-খাল, প্রতিটি হরিণের পদচিহ্ন এবং প্রতিটি বন্যপ্রাণীর নিরাপদ বিচরণ যেন আগামী প্রজন্মের জন্যও অটুট থাকে—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
সুন্দরবন বাঁচুক, বাঁচুক তার জীববৈচিত্র্য; সবুজের এই মহাকাব্য যুগের পর যুগ উপকূল ও মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে থাকুক—এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

-e4a18a.jpg)