ওমানে জ্বালানির নতুন কাঠামো, অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তি

ওমানে জ্বালানির নতুন কাঠামো, অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তি

সীমিত জ্বালানি সম্পদকে কেবল তেল-গ্যাস রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বন্দর, শিল্প অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সঙ্গে যুক্ত করে নতুন অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তি গড়ে তুলছে ওমান। বিশেষ করে দুকম বন্দরকে কেন্দ্র করে দেশটি হরমুজ প্রণালির বিকল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

ড. কামরান ইয়েগানেগির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বিপুল আর্থিক সম্পদ ও কাতারের মতো বিশাল গ্যাস রপ্তানি সক্ষমতা ওমানের নেই। ফলে মাসকাটের কৌশল হচ্ছে দেশের তেল-গ্যাস, সমুদ্রবন্দর এবং বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকে একত্র করে একটি স্বতন্ত্র জ্বালানি অর্থনীতি তৈরি করা। তবে একই সঙ্গে রপ্তানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, পানি ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন বড় চ্যালেঞ্জ।

বিজ্ঞাপন

দুকম এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু। দুকম রিফাইনারির দৈনিক পরিশোধন সক্ষমতা ২ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল। এটি ওমানের ওকিউ এবং কুয়েত পেট্রোলিয়াম ইন্টারন্যাশনালের সমান অংশীদারত্বের প্রকল্প। কুয়েতের জন্য এর বড় সুবিধা হলো হরমুজ প্রণালির বাইরে পরিশোধন ও পরিশোধিত পণ্য রপ্তানির সক্ষমতা তৈরি হওয়া। অন্যদিকে ওমান কুয়েতের মূলধন ও শিল্প-অভিজ্ঞতাকে দুকমের উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে পারছে।

তবে দুকমকে হরমুজের সম্পূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না। কুয়েত থেকে দুকমে অপরিশোধিত তেল পাঠাতে এখনও হরমুজ অতিক্রম করতে হয়। তবে দুকমে পরিশোধনের পর পণ্য আর হরমুজ দিয়ে রপ্তানি করতে হয় না। রাস মারকাজে তেল সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং পাইপলাইনের সঙ্গে রিফাইনারির সংযোগ এই নমনীয়তা আরও বাড়িয়েছে। আঞ্চলিক সংকটের সময় অবশ্য বীমা ব্যয় ও জাহাজ চলাচলের সিদ্ধান্তের কারণে অবকাঠামো অক্ষত থাকলেও বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

গ্যাস খাতেও ওমানকে একটি কঠিন ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প এবং তেল উৎপাদনে গ্যাসের অভ্যন্তরীণ চাহিদা রয়েছে। একই সঙ্গে ওমান এলএনজির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস রপ্তানি করে দীর্ঘমেয়াদি আয় নিশ্চিত করছে। ফলে প্রতিটি নতুন গ্যাস রপ্তানি চুক্তির অর্থ হলো ভবিষ্যতে দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ, শিল্প ও তেল উৎপাদনে ব্যবহারের জন্য কতটা গ্যাস অবশিষ্ট থাকবে—সেই সিদ্ধান্তও নেওয়া।

এখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইব্রি-২ সৌর প্রকল্পের সক্ষমতা ৫০০ মেগাওয়াট এবং ধোফার-১ বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের সক্ষমতা ৫০ মেগাওয়াট। মানাহ-১ ও মানাহ-২ মিলিয়ে আরও ১ হাজার মেগাওয়াট সৌর সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত কিছু গ্যাস অন্য শিল্প ও রপ্তানি খাতে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে গ্রিড সম্প্রসারণ ও পরিবর্তনশীল বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

তেলের ক্ষেত্রেও সৌরশক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। মিরাআহ প্রকল্পে সৌরশক্তি থেকে উৎপাদিত বাষ্প ব্যবহার করে তেল উত্তোলনের প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হয়। এর ফলে ওই কাজে গ্যাসের ব্যবহার কমানো সম্ভব হচ্ছে। অর্থাৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প নয়, বিদ্যমান তেলশিল্পের দক্ষতা বাড়ানোর উপায় হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

ওমানের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সবুজ হাইড্রোজেন। ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল ওমান, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির অংশীদারত্বে দুকম থেকে আমস্টারডাম হয়ে জার্মান শিল্পাঞ্চলে তরল হাইড্রোজেন সরবরাহের করিডর গড়ে তোলার চুক্তি হয়। ওমানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এটি বাণিজ্যিকভাবে তরল হাইড্রোজেন রপ্তানির একটি নতুন আন্তর্জাতিক রুট তৈরির উদ্যোগ।

তবে হাইড্রোজেন রপ্তানির ক্ষেত্রেও শুধু উৎপাদন করলেই হবে না। বিদ্যুৎ, পানি, তরলীকরণ, পরিবহন ও সংরক্ষণ—সব মিলিয়ে উৎপাদিত হাইড্রোজেন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পৌঁছাতে হবে। তাই ওমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু কাঁচা বা প্রাথমিক জ্বালানি রপ্তানি করবে, নাকি হাইড্রোজেন ব্যবহার করে কম-কার্বন ইস্পাতসহ উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্য উৎপাদনের সক্ষমতাও দেশে তৈরি করবে।

দুকমে এই বৃহত্তর শিল্পায়নের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। ২০২৬ সালের জুনে ওমান প্রায় ২.৯ বিলিয়ন রিয়াল বা প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন প্রকল্পের জন্য ১০টি বিনিয়োগ চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে। এর মধ্যে এসিএমইর সবুজ হাইড্রোজেন ও সবুজ অ্যামোনিয়া প্রকল্পে ১.৬ বিলিয়ন রিয়াল বিনিয়োগ রয়েছে।

ওমানের ভৌগোলিক অবস্থানও এ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। দেশটির দুকম, সালালাহ ও সোহার বন্দর হরমুজ প্রণালির বাইরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিকল্প পথ তৈরিতে সহায়তা করছে। ওমানের পরিবহন মন্ত্রণালয়ও বন্দরগুলোকে দেশের অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ ও পূর্ব-পশ্চিম বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করছে।

এই অবস্থান সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ। ওমান একই সঙ্গে ইরান, উপসাগরীয় আরব দেশ এবং ইউরোপীয় ও এশীয় অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। তবে কূটনৈতিক ভারসাম্য একাই বিনিয়োগ নিশ্চিত করে না। বিনিয়োগকারীদের কাছে অবকাঠামোর মান, ব্যয়, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি গুরুত্বপূর্ণ।

সুতরাং ওমানের জ্বালানি শক্তির প্রকৃত ভিত্তি শুধু তার তেল ও গ্যাসের মজুত নয়। বরং তেল-গ্যাস, দুকম-সালালাহ-সোহার বন্দর, সৌর ও বায়ুশক্তি, হাইড্রোজেন, শিল্প অবকাঠামো এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বকে একই অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করাই দেশটির মূল কৌশল। এর সফলতা নির্ভর করবে বিদেশে কত জ্বালানি রপ্তানি করা গেল তার পাশাপাশি দেশে কতটা শিল্প, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা গেল তার ওপর।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন